ওরা কথা শোনে না?

আপডেট : ২৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ০৪:৫৫ এএম

সন্তানের প্রসঙ্গ উঠলে আগে মুখে হাসি ফুটে উঠতো। একটা অজানা সুখে উদ্বেল হয়ে উঠতেন। কিন্তু এখন সন্তানের কথা উঠলে মুখ ম্লান হয়ে যায়। অস্বস্তি জেগে ওঠে। অন্যমনস্ক বাবা-মা প্রসঙ্গ এড়িয়ে যান অথবা আড্ডার মেজাজটাই হারিয়ে ফেলেন। অনেক পরিবারই সন্তানের অবাধ্য কৈশোর মা-বাবার দুর্দশার কারণ হয়ে ওঠে। বিভিন্ন কারণেই সন্তান কথা শুনতে চায় না। এসব সামলাতে কী করতে পারেন জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এডুকেশনাল অ্যান্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগের চেয়ারপারসন অধ্যাপক ড. মেহ্জাবিন হক

‘থাপ্পড় মেরে দাঁত ফেলে দেবো। পইপই করে বলার পরেও স্কুলে গোলমাল বাঁধিয়েছ? ক্লাস টিচার নালিশের ফর্দ তুলে দিয়েছেন আমার হাতে’ মায়ের মুখে এসব বকুনি অবন্তীর (ছদ্মনাম) কাছে ডালভাত। তাকে নিয়ে হাজারটা নালিশ। ক্লাসে অমনোযোগী, ঠিকমতো হোমওয়ার্ক করে না, একে-ওকে মারে, অকারণে গোলমাল বাঁধায়। শুধু স্কুলেই নয়, ঘরে-বাইরে সব জায়গায় অবন্তীর দস্যিপনা। একটু এদিক-সেদিক হলেই খিটখিটে মেজাজ দেখায়। এ নিয়ে মা-বাবা ভীষণ সমস্যায়। দিন দিন এ সমস্যা যেন আরো বাড়ছে।

এদিকে, কথায় কথায় বড়দের সঙ্গে তর্ক করা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে নিরবের (ছদ্মনাম)। সামান্য কিছুতেই বিরক্ত হয়ে ওঠে, রাগ দেখায় সবার সঙ্গে। মা-বাবা যা বলে, করে তার উল্টো। কোনো নিয়মকানুন মানতে চায় না। দিনকে দিন একরোখা হয়ে যাচ্ছে। এমন আচারণে নিরবকে নিয়ে নাজেহাল মা-বাবা।

কেন এমন হয়?

সন্তান শাসনের বাইরে তখনই চলে যায়, যখন সব বিষয়ে মা-বাবা ‘না’ বলে। ঠিকমতো সময় না দিলে, সন্তানের মতামতকে গুরুত্ব না দিলেও এ ধরনের সমস্যা হয়। পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে কিংবা অন্যের সঙ্গে তুলনা করলেও সন্তান একরোখা ও বদমেজাজি হয়। প্রায়ই দেখা যায়, অল্পতেই ক্ষিপ্ত হয়ে মা-বাবা সন্তানদের তিরস্কার করেন। সবার সামনে ভুলটা বারবার মনে করিয়ে দেন। এতে চাপা অভিমান জন্ম নেয় সন্তানের মনে। সন্তানের ওপর সবচেয়ে প্রভাব পড়ে জোর করে কিছু চাপিয়ে দিলে। বন্ধুদের সঙ্গে মিশতে না দেওয়াও আরেক ব্যাধি। এতে সন্তানের মনে ক্ষোভ জন্মে। থাকে কড়া নোটিস, ‘ওর সঙ্গে বন্ধুত্ব একদম না’। অন্যদিকে অনেক মা-বাবাও সন্তানকে যথেষ্ট সময় দিতে পারে না। এতে সন্তান একলা হয়ে যায়, সমস্যা বাড়ে আরো।

যা করণীয়

শাসন মানেই কঠোর হওয়া বোঝায় না। সন্তানদের লালন পালন, ভালোবাসা, আবদার মেটানো মা-বাবার শর্তহীন দায়িত্ব। ছেলেমেয়ে ফর্সা না কালো, লম্বা না খাটো, পরীক্ষায় সবসময় প্রথম হয় নাকি টেনেটুনে পাস করেÑ এসব নিয়ে তুলনা করা যাবে না। তাদের সঙ্গে বন্ধুর মতো মিশতে হবে। সহপাঠীদের সম্পর্কে জানতে হবে এবং সহপাঠীদের সঙ্গে মিশতে দিতে হবে। সন্তানের সহপাঠীদের সঙ্গেও রাখতে হবে ভালো সম্পর্ক। তাদের নিয়ে মন্তব্য করার সময় সতর্ক থাকতে হবে।  সহপাঠীদের দিয়ে প্রভাবিত হলে সন্তানকে যুক্তি দিয়ে বোঝাতে হবে। সন্তানের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে শুনতে হবে। খারাপ শব্দ প্রয়োগ করে কথা বলা যাবে না। হুটহাট কোনো বিষয় চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। সন্তানের বিষয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তার সঙ্গে কথা বলতে হবে। এর প্রয়োজনীয়তা তাকে  বোঝাতে হবে। আদব-কায়দা, সুন্দর ব্যবহার, সুষ্ঠু চিন্তাধারা সন্তানকে শেখাতে হবে। ভালো কিছু করলে প্রশংসা করতে হবে। সৃজনশীল কাজ করার বিষয়ে উৎসাহ দিতে হবে। বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকা-ের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে হবে। জন্মদিন বা বিশেষ দিনে সন্তানের পছন্দমতো জিনিস উপহার দিতে হবে। সন্তানদের সঙ্গে খেলাধুলা করতে হবে। ঘন ঘন স্কুল পরিবর্তন করা যাবে না। পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট না করলে খবর আছে, এমন হুমকি-ধমকি দেওয়া যাবে না।  পড়ালেখার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বোঝাতে হবে। তাদের শখের কাজগুলো করতে সাহায্য করতে হবে। তবেই তারা বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেবে।

এছাড়াও সন্তানের সঙ্গে অর্থপূর্ণ ও আনন্দময় সময় কাটাতে হবে। অবসর পেলে বেড়াতে যাওয়া, রেস্টুরেন্টে খেতে নিয়ে যাওয়া, সাধ্যের মধ্যে আবদার মেটানো, বন্ধুদের সঙ্গে স্কুল পিকনিকে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া, জন্মদিন পালন করা সম্পর্ককে একধাপ এগিয়ে রাখে। এর ফলে বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক আরো দৃঢ় হবে।

                                                                                                                     গ্রন্থনা : রায়হান রহমান

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত