বৃহস্পতিবার, ২৫ জুলাই ২০২৪, ১০ শ্রাবণ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

সত্তার দ্বন্দ্ব ‘নদ্দিউ নতিম’

আপডেট : ০৪ জানুয়ারি ২০১৯, ১২:৫৯ এএম

হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয় উপন্যাস ‘কে কথা কয়’ অবলম্বনে মঞ্চ নাটক ‘নদ্দিউ নতিম’ পরিচালনা করেছেন আসাদুল ইসলাম। ম্যাড থেটারের অন্য দুই সদস্য সোনিয়া হাসান ও আর্য মেঘদূতের সঙ্গে এ নাটকে অভিনয়েও আছেন তিনি। আর ঢাকার মঞ্চের টুকটাক খোঁজ-খবর রাখা দর্শক বা পাঠক মাত্রই জানেন, এই তিনজন একই পরিবারের সদস্য। পিতা-মাতা-কন্যা। ফলত হুমায়ূন আহমেদ, ম্যাড থেটার সব মিলিয়ে দারুণ আগ্রহ জাগানিয়া।

গল্প বেকার কবি মতিন উদ্দিনকে নিয়ে। কবিতা লিখে পাত্তা পায় না ঢাকার সাহিত্য সমাজে। তখন নিজের কবিতা উজবেক কবি নদ্দিউ নতিমের অনুবাদ বলে চালিয়ে দেন। মতিন উদ্দিনের উল্টো করলে হয় নদ্দিউ নতিম। কবিতার পাশাপাশি নদ্দিউ নতিমের ছোট গল্প, এমনকি জীবনীও লিখে ফেলেন মতিন।

একসময় ঢাকার সাহিত্যাঙ্গনে খুবই পরিচিত নাম হয়ে ওঠে নদ্দিউ নতিম, তাকে চিনতে না পারাটাই প্রকাশকদের জন্য সম্মানহানির ব্যাপার যেন। আন্তর্জাতিক নামি প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রকাশ হয় নদ্দিউ নতিমের জীবনীর ইংরেজি অনুবাদ। এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে মতিন হয়তো ঢাকার সাহিত্য সমাজকে বিদ্রুপ করেন। আবার এভাবেও ভাবা যেতে পারে ‘জনপ্রিয় সাহিত্যিক’ পরিচয়ের কারণে অনেকটা অপাঙ্ক্তেয়ই ছিলেন হুমায়ূন। সেই গল্পই কি রসিয়ে রসিয়ে করেছেন তিনি।

উপন্যাস অনুসারে মনে হতে পারে- মতিন উদ্দিন ও কমল আসলে একই মুদ্রার দুই পিঠ। যারা পরস্পরের পৃষ্ঠদেশ ছুঁতে পারে না কিন্তু নিজেদের আলাদাও ভাবতে পারে না। যা মূলত মানুষের মধ্যে বিপরীত সত্তার দ্বন্দ্বের চিরায়ত রূপের একটা প্রকাশ। অনুমান করতে পারি- উপন্যাসের মূল সুর এটা। যেখানে নদ্দিউ নতিম শুধু বিদ্রুপ বা ঠাট্টা-মশকরার বিষয় না। বরং নিজের ভেতর দ্বন্দ্বে ভুগতে থাকা মানুষের চিত্র, এমনকি এই সমাজ-সংসারের। আমরা যা হতে চাই এবং যা হয়ে থাকিÑ এই চিত্র তুলে আনা হয়েছে। কিন্তু হুমায়ূন খুব সম্ভাবনাময় জায়গা থেকে নয়, এক ধরনের পলায়নপর মীমাংসা ঘটান নাটকের শেষ দৃশ্যে। খুব বিষাদ জাগে, রয়ে যায় প্রশ্ন। হায়! এ দ্বন্দ্ব কি কোথাও গিয়ে মিলবে না। অথচ এ জগতের সদর্পে বৈপরীত্য মিলেমিশে থাকে।

মতিন উদ্দিন ও তার অল্টার ইগো নদ্দিউ নতিম চরিত্রে অভিনয় করেছেন আসাদুল ইসলাম। আর্য মেঘদূত ও সোনিয়া হাসান যথাক্রমে কমল ও কমলের মায়ের চরিত্রে অভিনয় করলেও মতিনের সংলাপের মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে তার বান্ধবী নিশু, নিশুর বাবা, আর্যর বাবা, আহমেদ ফারুকসহ কিছু চরিত্র। অন্য চরিত্রগুলোকে বয়ানের মধ্য দিয়ে তুলে আনা কতটা দরকারি এমন প্রশ্ন আসতে পারে কিন্তু এই তিন চরিত্রের বিশেষ করে মতিন উদ্দিনের আবহ তৈরিতে দরকার মনে হতেও পারে। উপন্যাসের পাঠানুগ হতে গিয়ে এমনটা ঘটেছে সম্ভবত। সে ক্ষেত্রে প্রশ্ন জাগতে পারে পাঠানুগ কিংবা ভিন্ন বয়ানের মধ্য দিয়ে মূল কীভাবে উঠে আসে বা কাছাকাছি যায়।

‘নদ্দিউ নতিম’ গল্পের দিক থেকে ঢাকার নাটকে খানিকটা ব্যতিক্রম। তার শ্রেণি সচেতনতা, গল্প বা সংলাপের ঢং মিলেও। সেদিক অবশ্যই আকর্ষণীয়। করুণ রসের মাধ্যমে সমাপ্তি একটা বিষাদের রেশ রেখে যায়। যা হুমায়ূনীয় সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য। ভাবনা বিষয় হলো উপন্যাসটি যে দ্বন্দ্ব নিয়ে লেখা তা কতটা ফুটে এসেছে। মনে হয়, নির্যাসগতভাবে উপন্যাসের মূল ভাবনা থেকে খানিকটা সরে এসেছে ‘নদ্দিউ নতিম’।

মূল চরিত্র মতিন উদ্দিনে আসাদুল ইসলাম দ্বন্দ্বগুলো ফুটিয়ে তোলার ব্যাপক চেষ্টা করেছেন। একাধিক চরিত্রে অভিনয়, কণ্ঠস্বর ও শরীরী ভঙ্গি পরিবর্তনের মাধ্যমে বহুস্বর হয়ে উঠেছেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এ অদলবদল চমকে দেয়।  আর পুরো নাটকটি দাঁড়িয়ে আছে এ চরিত্রের ওপর ভর করে। তবে মূল চরিত্র মতিনের ক্ষেত্রে ওনাকে অনেকটা উচ্চকিত মনে হয়। আসাদুলের মতো অভিজ্ঞ অভিনেতা-নির্দেশকের মাঝে আরও পরিশীলিত অভিনয় আশা করা যায়। অন্য দুজনের মধ্যে সোনিয়া হাসানের চরিত্রটি যথাযথ। আর চমকে দিয়েছে ছোট্ট আর্য মেঘদূতের। তাকে বেশ লেগেছে। গণিতের প্রতি ভালোবাসা, সরলতা, সত্যনিষ্ঠতা, জেদ, রাগ সব মিলিয়ে খুব কাছে টানে। নাটকের মঞ্চসজ্জায় তেমন কোনো আয়োজন নেই। একদম না হলেই নয় ধরনের আয়োজন। যথাযথই মনে হয়েছে। অবশ্য অভিনয় ও আকর্ষণীয় সংলাপে মনোযোগ দিলে ওই দিকে তাকানোর ফুসরত মেলে না ‘নদ্দিউ নতিম’ দর্শকের। তবে আবহসংগীতের ক্ষেত্রে একই অ্যাপ্রোচ ভালো লাগেনি। আরও বিশদ পরিকল্পনা করা যেত। আলোর ব্যবহারও মাঝে মাঝে সংগতিহীন মনে হয়েছে। 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত