নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে ফুঁসছে শ্রমিকরা

আপডেট : ০৭ জানুয়ারি ২০১৯, ০২:৩৬ এএম

পোশাক শ্রমিকদের জন্য গত বছর ঘোষিত নতুন মজুরি কাঠামো নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে। ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন দাবিতে গতকাল রবিবার রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে বিক্ষোভ করেছে শ্রমিকরা। আজ সোমবারও বিক্ষোভে নামার ঘোষণা দিয়েছে তারা। শ্রমিক ও তাদের প্রতিনিধিদের অভিযোগ, পাঁচ বছর পর নতুন কাঠামো হলেও জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বাড়ানো হয়নি বেতন। এ ছাড়া বর্তমান কাঠামো অনুযায়ীও বেতন দেওয়া হচ্ছে না তাদের।

শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় গত বছরের ২৯ নভেম্বর নতুন বেতন কাঠামোর গেজেট প্রকাশ করে। এতে পদ অনুযায়ী বেতন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০১৩ সালে ঘোষিত মজুরি কাঠামোর তুলনায় নতুন কাঠামোর গ্রেড-৩, গ্রেড-৪, গ্রেড-৫ ও গ্রেড-৬-এ মূল বেতন কমানো হয়েছে। তবে বাড়ি ভাড়া, যাতায়াত, চিকিৎসা, খাদ্যভাতা মিলিয়ে মোট বেতন বেড়েছে।

পোশাক শ্রমিকদের মধ্যে সব মেশিনের সিনিয়র অপারেটর, সিনিয়র কাটার, সিনিয়র কোয়ালিটি ইন্সপেক্টরের মতো কর্মীরা তিন নম্বর গ্রেডে বেতন পান। ২০১৩ সালে এ গ্রেডে মূল বেতন ছিল ছয় হাজার টাকা। ২০১৮ সালের মজুরি কাঠামোতে এটা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ হাজার ১৬০ টাকা। তবে আগে মূল বেতনের ৪০ শতাংশের স্থলে বাড়ি ভাড়া ৫০ শতাংশ নির্ধারণ করে ২ হাজার ৫৮০ টাকা করা হয়েছে।

অপারেটর (সব ধরনের মেশিনের জন্য), কাটার, নিডলম্যান, সিজারম্যান, কোয়ালিটি ইন্সপেক্টর, মার্কার, ড্রইংম্যানের মতো কর্মীদের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে গ্রেড-৪। এই গ্রেডে আগে মূল বেতন ছিল ৫ হাজার ৫৭৭ টাকা। কিন্তু নতুন কাঠামোতে ৪ হাজার ৯৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে আগের বেতনে বাড়ি ভাড়া ৪০ শতাংশের স্থলে ৫০ শতাংশ করা হয়েছে।

গ্রেড-৫ নির্ধারণ করা হয়েছে জুনিয়র অপারেটর (সব ধরনের মেশিন), জুনিয়র কাটারম্যান, জুনিয়র নিডলম্যান, জুনিয়র সিজারম্যান, জুনিয়র কোয়ালিটি ইন্সপেক্টরের মতো কর্মীদের জন্য। এ গ্রেডে আগে মূল বেতন ছিল ৪ হাজার ৭৬৭ টাকা। নতুন কাঠামোতে মূল বেতন করা হয়েছে ৪ হাজার ৬৭০ টাকা।

গ্রেড-৬ সাধারণ অপারেটর, নিডলম্যান, কাটারম্যান, কোয়ালিটি ইন্সপেক্টরের মতো কর্মীদের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ গ্রেডে মূল বেতন ৪ হাজার ৪০০ থেকে কমিয়ে ৪ হাজার ৩৭০ টাকা করা হয়েছে। তবে গ্রেডভুক্তদের বাড়ি ভাড়া ৪০ শতাংশের স্থলে ৫০ শতাংশ করা হয়েছে।

নতুন কাঠামো নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে রাজধানীর উত্তরার শান্ত গার্মেন্টসের সিনিয়র মেশিন অপারেটর আকলিমা বলেন, ‘অপারেটরদের বেতন সাড়ে ১২ হাজার টাকা করা হবে বলে আমরা আগে শুনেছি। অথচ সরকার নতুন মজুরি কাঠামোতে করেছে ১০ হাজার ৮৫০ টাকা। আর মালিক আমাদের দিচ্ছে ৯ হাজার ২৪৩ টাকা। আমরা নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী বেতন চাই এবং একই সঙ্গে মজুরি বাড়ানোর দাবি জানাই।’

উত্তরার ভার্সেটাইল গার্মেন্টসের শ্রমিক শাহিনুর জানান, তারা পেটের দায়ে সড়কে নেমেছেন। সরকার নতুন মজুরি কাঠামো ঘোষণা করেছে। কিন্তু তাদের বেতন আশানুরূপ বাড়েনি। মালিকরা তাদের ইচ্ছেমতো বেতন দিচ্ছেন।

জাগো বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি বাহারানে সুলতান বাহার বলেন, ‘নতুন মজুরি কাঠামো গার্মেন্টস শ্রমিকদের জন্য শুভঙ্করের ফাঁকি। দীর্ঘ পাঁচ বছর পর মজুরি কাঠামো ঘোষিত হয়েছে। এই পাঁচ বছরে জীবনযাত্রার ব্যয় দ্বিগুণ হয়েছে। অথচ শ্রমিকদের মূল বেতন ২০১৩ সালের চেয়েও অনেক কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি যা হওয়ার দরকার ছিল, সেটা করা হয়নি। তাদের ইনক্রিমেন্ট বাদ দেওয়া হয়েছে। সুপারভাইজরসহ কয়েকটি পদের কোনো গ্রেডই রাখা হয়নি। মূল বেতন কমে যাওয়ায় তারা ঈদ বা উৎসব বোনাস এবং ওভারটাইম কম পাবে। ফলে গার্মেন্ট শ্রমিকরা এই মজুরি কাঠামো প্রত্যাখ্যান করেছে।’

নতুন মজুরি কাঠামোকে শুভঙ্করের ফাঁকি উল্লেখ করে গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরামের সভাপতি মোশরেফা মিশু বলেন, ‘নতুন কাঠামো ঘোষিত হওয়ার পরপরই শ্রমিকরা ক্ষুব্ধ হয়ে আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু আমরা নির্বাচনের আগে তাদের বুঝিয়েছি, তারা ধৈর্য ধরেছে। এখন অপারেটরসহ অনেকের বেতন কমেছে। মজুরি কাঠামোতে মালিকদের অনেক প্রভাব ছিল।’

ভার্সেটাইল অ্যাপারেল প্রাইভেট লিমিটেডের চেয়ারম্যান একে ফজলুল হক বলেন, ‘সরকার যে নতুন মজুরি কাঠামো গঠন করেছে, আমরা সে অনুযায়ী শ্রমিকদের বেতন-ভাতা দেব। আমাদের গার্মেন্টসের মজুরি কাঠামোতে যদি কোনো ভুলত্রুটি থাকে, তবে আপনারা আলোচনা করেন। সরকারি মজুরি কাঠামোর বাইরে আমরা কিছু করব না।’

নতুন কাঠামো নিয়ে বিক্ষোভের বিষয়ে শিল্প পুলিশের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘মজুরি কাঠামো না মেনে শ্রমিকরা যে বিক্ষোভ করছে, সেটা ক্রমেই ছড়িয়ে পড়ছে। বিষয়টি পুলিশ সদর দপ্তরসহ ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।’

শিল্প পুলিশের মহাপরিচালক ও অতিরিক্ত আইজিপি আবদুস সালাম বলেন, ‘সার্বিক পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণেই আছে। মজুরি কাঠামো সরকার ও বিজিএমইএর বিষয়। আমরা বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার কোনো আশঙ্কা করি না।’

নতুন কাঠামো নিয়ে মজুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান সৈয়দ আমিনুল ইসলামের দপ্তরে গেলে জানানো হয়, তিনি ছুটিতে আছেন। পরে দপ্তরের প্রশাসনিক কর্মকর্তা হারুন অর রশীদ বলেন, শ্রমিকরা মজুরি কাঠামো প্রত্যাখ্যান করেনি; বরং নতুন কাঠামো বাস্তবায়নের জন্য আন্দোলন করছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত