পাহাড়ের মাথায় ওঠার সময় মনে হয় সিঁড়ি বেয়ে আকাশে উঠছি। নামার সময় মনে হয় সিঁড়ি দিয়ে আকাশ থেকে মাটিতে নামছি। রাস্তার পাশে চুকুর ফলের বাগান, আছে জলপাই গাছের সারি। কেয়াজুপাড়া হয়ে লামা ছাড়িয়ে নতুন পাড়া। চাম্পাঝিরি থেকে কারবারি নতুন দল নিয়ে এখানে বসতি গড়েছেন। প্রকৃতপক্ষে এ এলাকায় ম্রোদের বাস। তারা এক এলাকায় বেশিদিন থাকেন না। চাম্পাঝিরি দুর্গম পাহাড়ি এলাকা। পাহাড়ের মাথায় বাড়িগুলো দেখতে আকাশবাড়ি মনে হয়। প্রতিটি ঘরেই আছে শূকর। গরুগুলোর জন্য আছে বাহির বাড়িতে আলাদা বাসস্থান। প্রতি বাড়ির আশপাশে আছে প্রচুর ফুল ও ফলগাছ।
.jpg)
পাড়ার প্রবেশমুখে গেলেই বলে দেয় কত সুন্দর সাজানো বসতি চাম্পাঝিরি। পাড়ার মহাজন হলো কারবারি। কারবারির বাড়ির পাশ দিয়ে পাহাড়ের নিচে নেমে গেলেই ঝরনা। ম্রোরা ঝরনাকে বলেন ছররা। এ ছররাই তাদের জীবন। শুকনো মৌসুমে পানির চলাচল কম হওয়ার কারণে ঝরনার মাঝখানে গর্ত করে পানি জমানো হয়। সেই পানি মগে করে কলসিতে ভরা হয়। পাহাড়ের দেয়াল ভেদ করে মোটা সুড়ঙ্গের মতো সৃষ্টি হয়েছে। এ সময় সেখানে পানি গিয়ে ঠেকেছে তলানিতে। ঝরনার আশপাশের পাহাড়ের গায়ে গভীর খাদ থেকে অনুধাবন করা যায়, বর্ষার সময় ঝরনায় পানির প্রবাহ প্রবল থাকে।
ঝরনাকে কেন্দ্র করে বসতি গড়ে ওঠার কারণে কোনো একটা ঝিরি ধরে হাঁটলে অন্য একটা পাড়ায় পৌঁছে যাওয়া যায়।
ম্রোদের আরেকটা নাম আছে মুরং। প্রিয় খাবার সবজি। তারা ভাতের সঙ্গে সবজি খান বেশি। সকালে ঘুম থেকে উঠে শুরু হয় তাদের আনন্দযাত্রা। প্রতিবেলাতেই খাদ্যতালিকায় থাকে আররাক বা নিজেদের বানানো মদ। চাল দিয়ে বানানো মদ থেকে উচ্ছিষ্ট চালগুলো খেতে দেওয়া হয় শূকরকে। গাছের লতাপাতা তাদের রান্নার মসলা। খাদ্যতালিকায় স্থান পাওয়া বনমোরগ, বন-আলু, কুমড়া, আদা, রসুন তারাই সংগ্রহ করেন। আবার কিছু কিছু নিজেরা চাষ করেন। পাহাড়ে যত বসতি আছে, তার মধ্যে ম্রোরাই গরু পালন করে। ম্রোদের প্রধান ধর্মীয় অনুষ্ঠানে গরু মারা হয়। ম্রোদের গরু মারা নিয়ে কাহিনী প্রচলিত আছে। বিধাতা সব ধর্মের ধর্মগ্রন্থ পাঠিয়ে দিয়ে দেখলেন মুরংদের ধর্মগ্রন্থটা দেওয়া হয়নি। সবাই চলেও গেছে। বিধাতা গরুকে বললেন, মুরংদের ধর্মগ্রন্থটা পৌঁছে দিতে। গরু কলাপাতায় লেখা ধর্মগ্রন্থ নিয়ে ছুটলেন মুরংপাড়ায়। পথিমধ্যে পাহাড়ে তার ঘুম পেল ভীষণ, সে ঘুমিয়ে পড়ল। ঘুম থেকে উঠে তার ভীষণ খিদে পেল, হাতে থাকা কলাপাতা গপাগপ খেয়ে ফেলল সে। পরে যখন মনে হলো আরে এ তো ধর্মগ্রন্থ ছিল, তখন তো আর কিছুই করার নেই। মুরংদের কাছে গিয়ে বলল ঘটনা। মুরংরা তীর, বল্লম নিয়ে বদ করল গরুকে। সেই থেকে প্রতিবছর মুরংরা সাতপাইক্লং বা গো-হত্যা পূজা পালন করে থাকেন। তারা মনে করেন এভাবে একদিন তাদের ধর্মগ্রন্থ হাতে পাবেন। চাম্পাঝিরি পাড়াটি কিন্তু চাম্পাঝিরি বা চম্পা ঝরনার নামে। ঝিরি চাকমা ভাষা, ম্রোরা ঝরনাকে ছররা বলে। এই এলাকা মারমা রাজার রাজ্যের আওতাধীন বলে গ্রামের নাম মারমা ভাষায় বলা হয়। বলা হয়ে থাকে, চম্পা ফুলের নামানুসারে এই গ্রামের নাম। ঝরনার পাশে চম্পা ফুলগাছ ছিল। স্থানীয়রা চম্পাকে চাম্পা বলেন। তাই এই ঝরনার নাম চাম্পা ঝরনা বা চাম্পাঝিরি রাখা হয়েছে। বছরের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারির দিকে ঝরনাগুলো শুকনো থাকে। পাহাড়ের গাছগুলোও অনেকটা রুক্ষ থাকে। পাহাড়ি ঝরনা আর
.jpg)
প্রকৃতি অবলোকন করতে হলে যেতে হবে ফাল্গুনে। কেয়াজুপাড়া পৌঁছানোটাও কম ঝক্কির নয়। যেতে হবে লোহাগাড়া, সেখান থেকে সিএনজিতে কেয়াজুপাড়া বাজার। কেয়াজুপাড়া থেকে চাম্পাঝিরি পৌঁছানোর মাধ্যম হেঁটে, মোটরসাইকেলে বা জিপে করে। বেশি মানুষ হলে জিপ আর দুই কিংবা একজন হলে মোটরসাইকেলে যাওয়াই ভালো।
খরচাপাতি
ঢাকা থেকে যেতে কক্সবাজারের বাসে লোহাগাড়ার আমিরাবাদ নামতে হবে, লাগবে জনপ্রতি ৬২০ টাকা। আমিরাবাদ থেকে কেয়াজু বাজার সিএনজিতে জনপ্রতি ৭০ টাকা। কেয়াজু বাজার থেকে মোটরসাইকেলে চাম্পাঝিরি পাড়া দুজন ৫০০ টাকা। দলবেঁধে গেলে জিপে করে যাওয়া-আসার ভাড়া নেবে ৮ হাজার টাকা।
যেখানে থাকবেন
চাম্পাঝিরিতে থাকার কোনো ব্যবস্থা নেই। ঘুরে লামায় এসে কোয়ান্টামে অথবা কেয়াজু বাজারে থাকতে পারেন। সেখানে আছে গ্রিন হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট। মালিক ইমাম হোসাইন মোবাইল-০১৮৩৭৪৫৪৪২৮। যাওয়ার আগে থাকা এবং খাওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করে যাওয়াই ভালো।
