রোগীরা কাঁদছেন। স্বজন-বন্ধ-শুভার্থীরা কাঁদছেন। কত পেশার-শ্রেণির মানুষ। সবার চোখে জল। তার কাছে কতভাবে ঋণী সবাই। কত ধরনের সম্পর্ক তার সঙ্গে মানুষের। ফোন বাজলেই ভেসে আসে অভয় কণ্ঠ। কতজনের শক্ত অবলম্বন তিনি।
কত মানুষের সাহস, শক্তির আধার। রোগীদের কাছে তিনি সাক্ষাৎ দেবতা। একবার তার কাছে পৌঁছাতে পারলে অসহায় মানুষ নতুন করে প্রাণ পেত বেঁচে থাকার। তুখোড় আড্ডাবাজ। প্রতিবাদী। সবার জন্য চিকিৎসা নিশ্চিতে প্রাণান্ত লড়াই ছিল তার শেষদিন পর্যন্ত।
সেই মমতাময় চিকিৎসক অধ্যাপক রাকিবুল ইসলাম লিটু কী নির্মোহ ভঙ্গিতে চলে গেলেন শুক্রবার। দুপুরে রাজধানীর ল্যাবএইড কার্ডিয়াক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি (ইন্না লিল্লাহ...রাজিউন)।
সেখান থেকে প্রথমে তার মরদেহ উত্তরার লুবানা হাসপাতালে ও পরে উত্তরার বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। বাদ মাগরিব প্রথমে তার শেষ কর্মস্থল উত্তরার আধুনিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ও পরে উত্তরা ১৩ নম্বর সেক্টরের খেলার মাঠে অনুষ্ঠিত হয়। সে রাতেই উত্তরা ১২ নম্বর কবরস্থানে দাফন করা হয় তার মরদেহ।
অসচ্ছল রোগীদের কাছে তিনি ছিলেন প্রাণের স্বজন। লোকে তাকে বলত ‘গরিবের ডাক্তার’। চেম্বারে রোগী ঢুকলেই যেভাবে সম্বোধন করে পাশে বসাতেন, সে ডাকে অর্ধেকটা ভালো হয়ে যেতেন রোগীরা। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পাশাপাশি গল্পে গল্পে শুনতেন আর্থিক সংগতি, চিকিৎসা ব্যয় সংকুলানে সামর্থ্যরে কথা। প্রেসক্রিপশন লিখতেন। ড্রয়ার থেকে বের করে ওষুধ দিতেন।
বিদায় কালে হাতে কিছু টাকা গুঁজে দিয়ে বলতেন, ‘মা, এই টাকা দিয়ে বাকি ওষুধটা কিনে নিয়েন। ভালো কিছু খাবার খেয়েন।’
ডা. লিটু ছিলেন জনপ্রিয় দক্ষ হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ। কার্ডিয়াক সার্জারিতে নিপুণ হাত ছিল তার। দেশে কার্ডিয়াক সার্জারিতে সবচেয়ে কম বয়সী ‘এমডি’ ডিগ্রিধারী ছিলেন তিনি। সে জন্য স্বর্ণপদক দিয়েও সম্মানিত করা হয়েছে তাকে। জীবদ্দশায় তার বিরুদ্ধে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ আনতে পারেননি কেউ। বরং রোগী-চিকিৎসক সম্পর্ককে তিনি নতুন মাত্রা দিয়েছিলেন। রোগীদের কেবল রোগী হিসেবেই দেখতেন না; নিমেষেই রোগীদের নিকটজন হয়ে উঠতেন তিনি। এমনও হয়েছে, চেম্বারে তার ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে কত রোগী কত দিন অঝোর কেঁদেছে। মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে আশীর্বাদ দিয়েছে তাকে।
ডা. লিটু স্ত্রী, ৭ থেকে ১২ বছর বয়সী তিন শিশু, আত্মীয়-স্বজনসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। সন্তানদের তিনি ডাকতেন রাজা-বাদশা-সম্রাট বলে।
বলতেন, ‘ওরা হবে আমার মতো। যেখানে অন্যায় দেখবে, সেখানেই লড়বে। ভয় পাবে না।’ শুক্রবার যখন বাবার মরদেহের সামনে মুখভার করে দাঁড়িয়ে ছিলেন তার রাজা-বাদশারা; সে দৃশ্যে চোখে অশ্রু ঝরেছে সবার।
ল্যাবএইড হাসপাতালের কার্ডিওলজিস্ট ডা. মাহবুবর রহমান বলেন, বুধবার রাতে ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক হয় ডা. লিটুর। তখন থেকেই তার অবস্থা খুব গুরুতর ছিল। শুক্রবার তার স্বাস্থ্যের অবস্থা আরও অবনতির দিকে যাচ্ছিল। একপর্যায়ে তাকে লাইফ সাপোর্টে নিয়ে বাঁচিয়ে রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও দুপুরে ডা. লিটু শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।
তার কর্মস্থল ছিল শিকদার মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ল্যাবএইড হাসপাতাল, বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।
রোগী দেখতেন ব্রাইটন হাসপাতাল ও মেট্রো হাসপাতালেও। কোনোদিনই কোথাও দীর্ঘদিন চাকরি করা হয়নি। যখন যে হাসপাতালে ছিলেন, সে হাসপাতালেই রোগীদের পক্ষ নিতেন তিনি। যে কোনো অন্যায়, চিকিৎসায় অবহেলার প্রতিবাদ করতেন। নিজে না পারলে গণমাধ্যমের দ্বারস্থ হতেন।
নিজে উদ্যোগী হয়ে চিকিৎসকদের পদবি নিয়ে দুর্নীতি ও অনিয়ম বের করতেন। অনেক চিকিৎসককে ভুয়া পদবি পরিহার করতে বাধ্য করেছেন তিনি।
মধ্যরাত অবধি রোগী দেখতেন প্রাণশক্তির এই মানুষটি। প্রতিদিন যত রোগী আসত অধিকাংশের থেকেই ফি নিতেন না। দরিদ্র হৃদরোগীর জটিল অস্ত্রোপচারে কখনোই পারিশ্রমিক নিতেন না। এমনকি চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফেরার টাকা দিতেন। বেশি রাত হলে হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স দিতেন বিনা অর্থে। দরিদ্র রোগীদের জন্য নিজ উদ্যোগে গঠন করেছিলেন পেশেন্টস ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন।
মৃত্যুর তিন দিন আগেও ফেসবুকে লিখেছিলেন, ‘গরিব রোগীদের চিকিৎসা ও সব মানুষের চিকিৎসা সেবা অধিকার নিশ্চিত করতে আমাদের সংগ্রাম চলছেই, চলবে’।
শুক্রবার সকাল ১০টায় ফাউন্ডেশন দরিদ্র রোগীদের জন্য ফ্রি চিকিৎসা ও বিনামূল্যে ওষুধ বিতরণের আয়োজন করেছিলেন তিনি। যাওয়া হয়নি তার। তার বদলে চিরবিদায় নিতে হলো তাকে সেদিনই।
এই শহরে শাহবাগে, টিএসসিতে, যেখানে যত আড্ডা হয়, সে সবের মধ্যমণি ছিলেন ডা. লিটু। বিশেষ করে গণমাধ্যমকর্মীদের আস্থার মানুষ ছিলেন। সম্পাদক থেকে জুনিয়র রিপোর্টার সবার প্রিয় ছিলেন। সবার বিপদে আপদে সাড়া দিতেন। ফোন করলেই বলতেন, চলে আসেন। বাকি দায়িত্ব আমার।
তার মৃত্যুর খবরে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম শোকে ছেয়ে যায়। আবেগঘন স্মৃতিচারণ করেন সবাই। দুপুরে তার মরদেহ লুবানা হাসপাতালে এসে পৌঁছালে সর্বস্তরের চিকিৎসক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কান্নায় ভেঙে পড়েন।
এ সময় তাদের ‘স্যার স্যার’ ডাকে বেদনাবিধুর হয়ে ওঠে চারপাশ। পরে সেখান থেকে উত্তরার বাসভবনে মরদেহ নেওয়া হলে নানা শ্রেণি ও পেশার মানুষ আসে সেখানে। এদের সবার সঙ্গেই কোনো না কোনো সম্পর্কে বাঁধা তিনি।
