মুদ্রানীতিতে অর্থনীতিবিদদের প্রত্যাশা

অনিয়ম রোধ করে বিনিয়োগমুখী ঋণ বাড়াতে হবে

আপডেট : ২৭ জানুয়ারি ২০১৯, ১২:০৬ এএম

সরকারের প্রথম মুদ্রানীতিতে আর্থিক খাতের অনিয়ম রোধ করতে নজরদারি বাড়িয়ে উৎপাদনশীল খাতে ঋণ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলেছেন, দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়নের খাতিরে উৎপাদনশীল খাতে ঋণের প্রবাহ বাড়ানোর বিকল্প নেই। ঋণের উপযুক্ত ব্যবহার নিশ্চিত করতে নজরদারি বাড়ানোর ব্যবস্থাও থাকতে হবে একই সঙ্গে। চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের এই মুদ্রানীতির মধ্য দিয়ে মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রা বিনিময় হারও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আগামী ৩০ জানুয়ারি নতুন বছরের দ্বিতীয়ার্ধের ও বর্তমান সরকারের প্রথম মুদ্রানীতি ঘোষণা করবে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, মুদ্রানীতিতে উৎপাদনশীল খাতে ঋণের প্রবাহ বাড়ানোর প্রক্রিয়া আরও জোরদার করতে হবে। বেসরকারি খাতে ঋণ বাড়ছে। কিন্তু মানসম্মত বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের আরও জোর দিতে হবে।

তিনি বলেন, ঋণে অনিয়মের কারণে প্রকৃত বিনিয়োগকারীদের হাতে অর্থ যাচ্ছে না। এজন্য খেলাপি ঋণ বাড়ছে। প্রকৃত বিনিয়োগকারীর হাতে ঋণ গেলে তাদের বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়বে। নজরদারি বাড়ানোর মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংককে তা নিশ্চিত করতে হবে।

সালেহ উদ্দিন আহমেদ আরও বলেন, বর্তমানে ব্যাংকে আমানত কম। তারল্য সংকটসহ নানা কারণে ব্যাংকাররা এখন ৯ শতাংশ সুদে ঋণ দিতে চাচ্ছেন না। তাই চ্যালেঞ্জ নিয়ে বেসরকারি খাতের ঋণ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে সরকার যেন ব্যাংক খাত থেকে বেশি ঋণ না নেয়, সেদিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ সরকার বেশি খরচ করলে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে।

নতুন মুদ্রানীতিতে প্রত্যাশা সম্পর্কে জানতে চাইলে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকারের প্রথম মুদ্রানীতি হওয়ায় এর আলাদা গুরুত্ব থাকবে। মুদ্রানীতিতে সবচেয়ে গুরুত্ব দিতে হবে মানসম্মত ঋণ নিশ্চিত করা ও ঋণের গুণগতমান নিশ্চিত করা। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরদারি, খবরদারি শক্তিশালী করতে হবে। নতুন ঋণ যাতে উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহৃত হয়, সেদিকে মনোযোগ দিতে হবে।

তিনি বলেন, সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের ঘোষণা দিয়েছে। তাই এতদিন খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করা, পুনর্গঠন করার ক্ষেত্রে যে বিভিন্ন ধরনের তদবির ও চাপ ছিল, তা উপেক্ষা করে খেলাপি ঋণ আদায়ে তৎপর হতে হবে। কসমেটিক্স লাগিয়ে বা সার্জারি করে নয়, প্রকৃত অর্থেই খেলাপি ঋণ অর্থনীতির স্বার্থে কমানোর উদ্যোগ থাকতে হবে।

মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, মূল্যস্ফীতি এখনো নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আছে। ভবিষ্যতেও তা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতে হবে। মুদ্রা বিনিময় হার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ডলারের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা রুখতে গত বছরও  দুই বিলিয়ন ডলার ছেড়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এবারও এক বিলিয়ন ডলার ছাড়া হতে পারে। তবে ডলারের সরবরাহ বাড়িয়ে যেন আবার অবমূল্যায়ন না ঘটে সেটিও খেয়াল রাখতে হবে। ডলারের বিপরীতে টাকার দাম ৮৫ এর মধ্যে সীমিত রাখার লক্ষ্য নিতে পারে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, দেশের গড় প্রবৃদ্ধি বাড়ছে। কিন্তু সে হারে কর্মসংস্থান বাড়ছে না। বরং সম্প্রতি বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ কিছুটা কমে এসেছে। এজন্য ব্যাংকিং খাতের বাংলাদেশ ব্যাংককে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে।

তিনি বলেন, ঋণ যেন সঠিক বিনিয়োগকারীর কাছে যায় তা নিশ্চিত করতে হবে। খেলাপি ঋণ কমানো ও আর্থিক খাতের শৃঙ্খলার জন্য এটা খুবই জরুরি। বর্তমানে খেলাপি ঋণ ব্যাংকিং খাতে অন্যতম সমস্যা।  

সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. সৈয়দ গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, নতুন সরকারের প্রথম মুদ্রানীতি হওয়ায় এর প্রতি অনেকের আগ্রহ রয়েছে। ফলে বিনিয়োগমুখী মুদ্রানীতির মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রেখে কর্মসংস্থান বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে।

তিনি বলেন, নতুন মুদ্রানীতিতে ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকা উচিত। এজন্য সুস্পষ্ট ঘোষণা থাকা উচিত। বাংলাদেশ ব্যাংক যেন তার ক্ষমতার প্রকৃত প্রয়োগ করতে পারে, বিভিন্ন বিষয়ে সংস্কার ও মনিটরিং জোরদার করতে পারে। প্রতি ছয় মাস অন্তর এগুলো পর্যালোচনা করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, আগামী ৩০ জানুয়ারি নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করবেন গভর্নর ড. ফজলে কবির। নতুন মুদ্রানীতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক বেসরকারি খাতে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে যা যা করণীয় তা করবে। এক্ষেত্রে সব ধরনের নীতি সহায়তা দেওয়া হবে। আশা করছি ঋণপ্রবাহও বাড়বে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন মুদ্রানীতি ‘সম্প্রসারণমূলক’ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তারা বলছেন, সরকার আগামী দিনে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনে জোর দিচ্ছে। এটি করতে হলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এজন্য উৎপাদনমুখী বিনিয়োগে ঋণ প্রবৃদ্ধি কিছুটা বাড়ানো হতে পারে।

বেসরকারি খাতে ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ ঋণের প্রবৃদ্ধি রেখে গত জুলাই মাসে চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধের মুদ্রানীতি ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। বরং নির্বাচনে যাতে কালো টাকার প্রবাহ না বাড়ে সে জন্য বাজারে নগদ অর্থের লাগাম টানার চেষ্টা ছিল তাতে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত