সোমবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৪, ২ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

পারকী সৈকতে ২০ মাস আটকা জাহাজ এমভি ক্রিস্টাল

আপডেট : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০৫:০৪ এএম

বন্দরনগরী চট্টগ্রামের অন্যতম পর্যটন স্পট ‘পারকী সৈকতে’ ২০ মাস ধরে আটকে আছে ‘এমভি ক্রিস্টাল গোল্ড’ নামে প্রায় ছয় হাজার মেট্রিক টন ওজনের একটি বিশালাকৃতির জাহাজ। ফোর স্টার এন্টারপ্রাইজ নামে একটি প্রতিষ্ঠান প্রায় চার মাস আগে নিলামে জাহাজটি কিনে নিলেও আইনি জটিলতায় এখন পর্যন্ত সেটি সরাতে পারেনি। এ জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরকে দুষছে ফোর স্টার এন্টারপ্রাইজ। আর পরিবেশ অধিদপ্তর বলছে, এটা ফোর স্টার এন্টারপ্রাইজের ব্যর্থতা। এ পরিস্থিতিতে দীর্ঘসময় জাহাজটি আটকে থাকায় সেখানকার বেড়িবাঁধে ভাঙনসহ পর্যটন এলাকাটির পরিবেশ ও প্রতিবেশ ব্যবস্থা ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

পারকী সৈকতে গিয়ে দেখা যায়, সৈকত লাগোয়া চরের ওপর আটকে আছে বিশালাকার জাহাজটি। এর দুই পাশের কাঠামোর প্রায় ৫০০ মিটার এলাকায় জমেছে কাদা ও বালিয়াড়ি। দীর্ঘদিন পড়ে থাকার কারণে জাহাজটির একপাশে চরের ওপর বালু জমে বিশাল পাহাড়ের আকৃতি নিয়েছে, অন্যপাশে হয়েছে পুকুরের মতো। এ ছাড়া চরের মাঝখানে তৈরি হয়েছে বড় একটি খাল। এতে করে সেখানকার উপকূলীয় বেড়িবাঁধে ভাঙনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

২০১৭ সালের ৩০ মে ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’র আঘাতে নোঙর ছিঁড়ে বহির্নোঙর থেকে চট্টগ্রাম বন্দর চ্যানেলের কাছাকাছি আনোয়ারার পারকীর চরে উঠে যায় ক্রিস্টাল গ্রুপের মালিকানাধীন জাহাজ ‘এমভি ক্রিস্টাল গোল্ড’। পরে জাহাজটি সাগরে ভাসানোর জন্য কয়েক দফা চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয় মালিকপক্ষ। জাহাজটির নাবিকদের বেতন-ভাতা ও ব্যাংকের পাওনা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশনের অ্যাডমিরালটি কোর্টে মামলা হয়। ২০১৮ সালের ২৫ জুলাই ওই মামলার রায়ে জাহাজটি নিলামে বিক্রির আদেশ দেওয়া হয়। পরে অ্যাডমিরালটি কোর্টের আহ্বান করা আন্তর্জাতিক দরপত্রে অংশ নিয়ে ১১ কোটি টাকায় জাহাজটি নিলামে কিনে নেয় চট্টগ্রামের ফোর স্টার এন্টারপ্রাইজ নামে একটি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু নিলামে ক্রয়ের চার মাস পরেও কাটার অনুমতি না পাওয়ায় জাহাজটি সেখান থেকে সরাতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। 

পারকী সৈকত এলাকার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল কাইয়ুম শাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জাহাজটি দীর্ঘদিন পড়ে থাকায় সৈকত এলাকায় বালিয়াড়ির ওপর কাদা জমছে। এটি পর্যটকদের জন্য একধরনের অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পারকী বিচের পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে আধুনিক প্রক্রিয়ায় জাহাজটি কেটে সরিয়ে নেওয়া কিংবা অন্যত্র টেনে নেওয়া প্রয়োজন।’

জাহাজটি কবে নাগাদ সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে তা জানতে চাইলে ফোর স্টার এন্টারপ্রাইজের ব্যবস্থাপক নছরুল্লাহ খান রাশেদ বলেন, ‘নিলামে কেনার পর যেখানে যে অবস্থায় আছে সে অবস্থায় তা কাটার জন্য আমাদের অনুমতি দেয় আদালত। সংশ্লিষ্ট চার থানার পুলিশের উপস্থিতিতে হাইকোর্টের রেজিস্টার জেনারেল অব মার্শাল জাহাজটি আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছে। বন্দর ও কাস্টমস থেকেও অনাপত্তিপত্র দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাদ সেধেছে পরিবেশ অধিদপ্তর।’

জাহাজটি কাটার বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর অসহযোগিতা করছে অভিযোগ করে নছরুল্লাহ খান আরও বলেন, ‘গত বছরের ৮ নভেম্বর ও ৯ ডিসেম্বর দুই দফায় পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে আবেদন জানানো হলেও তাদের কোনো সহযোগিতা মিলছে না। উল্টো জাহাজ কাটা শুরুর অভিযোগ এনে আমাদের বড় অঙ্কের জরিমানা করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। এ জরিমানার বিরূদ্ধে আমরা পরিবেশ মন্ত্রণালয়ে আপিল করেছি।’

তবে ফোর স্টার এন্টারপ্রাইজের করা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক মোয়াজ্জেম হোসেন। তিনি বলেন, ‘জাহাজ কাটার জন্য যেসব দাপ্তরিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয় তা না করেই ফোর স্টার এন্টারপ্রাইজ জাহাজটি কাটা শুরু করেছিল। তাই পরিবেশ আইনে তাদের জরিমানা করা হয়েছে। এখন যদি জাহাজটি ইয়ার্ডে নিয়ে কাটা কোনোভাবেই সম্ভব না হয়, তাহলে তারা আদালতের নির্দেশনা চাইতে পারে। অথবা জাহাজ কাটার বিষয়ে আলাদা কোনো প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পেশ করতে পারে।’

চট্টগ্রাম বন্দরের হারবার মাস্টার ক্যাপ্টেন ফরিদুল আলম জানান, এমভি ক্রিস্টাল গোল্ড কাটার বিষয়ে একটি আবেদনের প্রেক্ষিতে গত ১৩ নভেম্বর বন্দর কর্র্তৃপক্ষ থেকে অনাপত্তিপত্র দেওয়া হয়। 

বাংলাদেশ শিপব্রেকিং অ্যাসোসিয়েশনের উপদেষ্টা ক্যাপ্টেন এম এনাম চৌধুরী বলেছেন, এই মুহূর্তে জাহাজটি সরাতে গেলে কর্ণফুলী মোহনায় বড় আকারে ড্রেজিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু তাতে বন্দর চ্যানেল বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এ অবস্থায় ওপর থেকে জাহাজটি কেটে কেটে বার্জে করে তা অন্যত্র সরিয়ে নিতে হবে।

তিনি আরও জানান, এর আগে ২০১৩ সালে পতেঙ্গা এলাকায় এমভি ওশ্যান পার্ল নামে একটি জাহাজ আটকা পড়েছিল। তখন উচ্চ আদালতের নির্দেশে সেখানেই জাহাজটি কাটা হয়েছিল।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত