রবিবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৪, ১ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

‘এবিটি’র গ্রেপ্তার দুই ভাইয়ের বাড়ি বগুড়ায়

আলেম বানাতে মাদ্রাসায় পড়তে দিয়েছিল পরিবার

আপডেট : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০৩:৫৭ এএম

রাজধানীর উত্তরায় গত বৃহস্পতিবার রাতে গ্রেপ্তার হওয়া নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) চার সদস্যের মধ্যে দুই সহোদরের বাড়ি বগুড়ার ধুনট উপজেলার চরখুকশিয়া গ্রামে। তারা ওই এলাকার রেজাউল করিম টিপুর ছেলে রবিউল ইসলাম ওরফে নূরুল ইসলাম (২৪) ও শাহরিয়ার নাফিস ওরফে আম্মার হোসেন (২০)।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রবিউল ও আম্মার বরাবরই এলাকার বাইরে থাকত। মাঝে মাঝে এলাকায় এলেও গ্রামের মানুষের সঙ্গে মেলামেশা ছিল কম। আর তাদের পরিবারেও ধর্মীয় অনুশাসন এতটাই মানা হয় যে, বাইরের কোনো মানুষ সহজে বাড়ির ভেতরে যেতে পারে না। তাদের গ্রেপ্তারের সচিত্র প্রতিবেদন গত শুক্রবার বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশের পর এলাকায় দেখা দেয় মিশ্র প্রতিক্রিয়া। দুজনের বাবা টিপুও বিশ্বাস করতে পারছেন না তার দুই ছেলেই জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

রেজাউল করিম টিপু তার চার সন্তানের মধ্যে বড় দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন, আর দুই ছেলেই লেখাপড়া করেছে মাদ্রাসায়। রবিউল তাদের গ্রামের পাশের মহিশুরা মাদ্রাসা থেকে ২০১০ সালে দাখিল পাসের পর ভর্তি হয় বগুড়া পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে। ২০১৫ সালে সেখান থেকে ডিপ্লোমা পাস করে সে। আর আম্মার ২০১৬ সালে মহিশুরা দাখিল মাদ্রাসা থেকে জেডিসি পাস করে পর্যায়ক্রমে সিরাজগঞ্জের আলমপুর কওমি মাদ্রাসা, নরসিংদীর মাধবদীর দরগাবাড়ি কওমি মাদ্রাসা ও ঢাকার যাত্রাবাড়ীর আবু বক্কর কওমি মাদ্রাসায় লেখাপড়া করে পাঁচ পারা কোরআন হেফজ করে।

গ্রামের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রেজাউল করিম টিপু প্রায় ২৫ বছর ধরে নরসিংদীর মাধবদী এলাকায় একটি সোয়েটার তৈরির (পাওয়ারলুম) কারখানায় কাজ করেন। এলাকায় কিছু জমিও আছে তার। কারখানায় কাজের ফাঁকে এলাকায় এসে সেসব জমিতে চাষাবাদ করেন তিনি। টিপু নিজে তাবলিগ জামাতের সঙ্গে যুক্ত অনেক দিন ধরে। এ কারণে তার বাড়িতে ধর্মীয় অনুশাসনের কড়াকড়ি রয়েছে।

চরখুকশিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুল কুদ্দুস জানান, ছাত্রাবস্থায় টিপুর বড় ছেলে রবিউল তাবলিগ জামাতের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল। ডিপ্লোমা পাসের পর বাবার কাছে চলে যায়। সেখানে সে একই কারখানায় কাজ করত বলে শুনেছেন তারা। আর ছোট ছেলে আম্মার পাঁচ পারা কোরআনের হাফেজ হওয়ার পর পড়া ছেড়ে কুমিল্লার দাউদকান্দিতে একটি কয়েল তৈরির কারখানায় কাজ করত।

ওই গ্রামের বাসিন্দা আবদুল করিম জানান, মাঝে মাঝে দুই ভাই বাড়িতে আসত। সর্বশেষ গত ২৫ জানুয়ারিও তাদের এলাকায় দেখা গেছে। কিছু সময় তাদের বন্ধু পরিচয় দিয়ে অজ্ঞাত যুবকদেরও এলাকায় আসতে দেখা যায়। তবে বাইরে থাকার কারণে তাদের সঙ্গে আসা লোকজনের বিষয়ে কেউ কোনো প্রশ্ন করেনি। তিনি বলেন, গ্রামে তারা লোকজনকে নামাজ পড়তে উদ্বুদ্ধ করত। তবে নামাজ না পড়া কারও বাড়িতে বা দোকানে কিছু খেত না। তাবলিগের লোকজন এমনটি করে ভেবেই গ্রামের লোকজন তা নিয়ে কোনো কিছু মনে করেনি। কিন্তু শুক্রবার ওই দুই ভাইয়ের গ্রেপ্তার হওয়ার খবর দেখে অনেকে হতবাক হন।

বাড়িতে গিয়ে ডাকাডাকি করার পর ভেতর থেকে ওই দুই ভাইয়ের মা পরিচয় দিয়ে নূর জাহান বেগম বলেন, ‘বাড়িতে কোনো পুরুষ মানুষ নেই, তাই ভেতরে ঢোকা যাবে না।’ তিনি জানান, রবিউলের বাবা জমিতে গেছেন।

গ্রামের পাশেই পাওয়া যায় টিপুকে। তিনি বলেন, ‘আলেম বানাব বলে দুই ছেলেকে মাদ্রাসা লাইনে পড়ালাম। আর এখন শুনি তারা নাকি জঙ্গি হয়ে গেছে। কী করে যে তারা জঙ্গি হলো, তা এখনো বুঝে আসছে না।’ তবে মোবাইল আর ইন্টারনেটের কারণেই তারা এমন চরমপন্থিদের সান্নিধ্যে এসেছে বলে ধারণা টিপুর। তিনি তার দুই ছেলেকে যারা জঙ্গি হতে উদ্বুদ্ধ করেছে, তাদের চিহ্নিত ও বিচার দাবি করেন। 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত