রবিবার, ২১ এপ্রিল ২০২৪, ৮ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

বিদেশে নারীকর্মী পাঠানো বন্ধই কি সমাধান

আপডেট : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০৯:৪২ পিএম

বাংলাদেশ থেকে বিদেশে নারীকর্মী, বিশেষ করে গৃহস্থালি কাজের জন্য পাঠানো নিয়ে ইদানীং একটা জোর বিতর্ক চলছে। একপক্ষ বলছে, বিদেশে গৃহকর্মীর কাজ করতে গিয়ে আমাদের নারীরা যে ধরনের নিপীড়ন-নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, তাতে যে শুধু ওই নারীদের মানবাধিকার ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে তা নয়, দেশেরও মর্যাদা নষ্ট হচ্ছে। ‘ভিকটিম’দের উদ্ধৃতি দিয়ে তারা এমনও অভিযোগ করছেন, কোনো কোনো নারী সেখানে দিনের পর দিন যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। আর সরকার যেহেতু এর কোনো সমাধান দিতে পারছে না, সেক্ষেত্রে এ ধরনের কাজে বিদেশে নারীদের পাঠানো বন্ধ করে দেওয়াটাই শ্রেয়। অন্যদিকে, যারা এ ব্যবসায় নিয়োজিত আছেন, তাদের বক্তব্য হলো যতটা বলা হচ্ছে সমস্যা ততটা নয়। কিছু নির্যাতনের ঘটনা যে ঘটছে না তা নয়, তবে সংশ্লিষ্ট দেশের আইনেই এর প্রতিকার আছে। অতএব, মাথাব্যথার জন্য মাথা কেটে ফেলা কোনো সমাধান নয়।

বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং তার অধীন জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) যারা বিদেশে বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের বিষয়টা দেখভালের দায়িত্বে নিয়োজিত, তাদের বক্তব্যও এখন পর্যন্ত ওই জনশক্তি রপ্তানিকারকদের মতোই। তাদের বক্তব্য হলো, বেশ কিছু অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তারা এরই মধ্যে কয়েক দফা সরেজমিনে তদন্ত চালিয়ে দেখেছে, এগুলোর সত্যতা নেই বললেই চলে।

উভয় পক্ষের এই বিপরীতধর্মী বক্তব্যে যে কারও পক্ষেই বিষয়টা সম্পর্কে স্পষ্ট একটা ধারণা পাওয়া অসম্ভব; বিশেষ করে যেখানে যে দেশে এসব ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ উঠছে, সে দেশের সমাজ-সংস্কৃতি, আইন-কানুন ইত্যাদি সম্পর্কে আমরা তেমন কিছু জানি না। আবার যারা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ তুলছেন, তাদের পক্ষ থেকেও এ নিয়ে তেমন কোনো ফলোআপ দেখা যায় না। যেমন : এ পর্যন্ত একটা ঘটনাও পাওয়া যাবে না, যেখানে ভিকটিম ওই দেশে বা স্বদেশে ওই বঞ্চনা বা নির্যাতনের জন্য আইনি প্রতিকার চেয়েছেন অথবা আইনের দ্বারস্থ হয়ে প্রতিকারের জন্য লেগে থেকেছেন।

আমাদের ছেলেরাও বিদেশে চাকরি করতে গিয়ে অনেক প্রতারণা বা নিপীড়ন-নির্যাতনের শিকার হয়। এ রকম অনেক ঘটনার কথা আমার জানা আছে, যেখানে কাজের ভিসা নিয়ে একজন বিদেশে গিয়ে চুক্তিমতো চাকরি না পেয়ে সেখানকার বাংলাদেশি দূতাবাসে সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়েছেন; এরপর তদন্ত শেষে প্রমাণ পেয়ে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় ওই রিক্রুটিং এজেন্সির কাছ থেকে পুরো ক্ষতিপূরণ আদায় করেছেন অথবা তার লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিল করে দিয়েছেন। নারীরা যদি এমন প্রতিকার চান, তাতে সরকার নিস্পৃহ থাকবে অথবা পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করবেÑ এমনটা বিশ্বাস করা কঠিন।

কেউ কেউ বলতে পারেন, যারা নারী কর্মী পাঠানোর সঙ্গে যুক্ত, তারা খুব প্রভাবশালী, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে অসহায় নারীদের পক্ষে টিকে থাকা কঠিন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমাদের দেশে যাদের প্রভাবশালী জনশক্তি রপ্তানিকারক বলে মানুষ জানে, তাদের কেউই বিদেশে নারী কর্মী পাঠানোর কাজ করেন না। সম্প্রতি ফিমেইল ওয়ার্কার্স রিক্রুটিং এজেন্সিজ অব বাংলাদেশ (সংক্ষেপে বলা হচ্ছে ফোরাব) নামে নারীকর্মী প্রেরণকারী এজেন্সিগুলো একটা সমিতি গঠন করেছে। সেখানে ৫৫০-এরও বেশি এজেন্সির নাম আছে, যাদের কেউই আলাদাভাবে সরকারের কোনো পলিসিকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে বলে মনে হয় না।

বিষয়টাকে আরও ধোঁয়াটে করে দিচ্ছে যে বিষয়গুলো সেগুলো হলো, প্রায় প্রতিটি ঘটনায় দেখা যাচ্ছে, ‘নির্যাতিত’ নারীরা শাহজালাল বিমানবন্দরে নেমে এ অভিযোগগুলো করছেন। কিন্তু এখানে তারা পৌঁছালেন কীভাবে, কোন এজেন্সি তাদের বিদেশে পাঠাল, তাদের অভিযোগের ব্যাপারে সেই এজেন্সির বক্তব্য কী ইত্যাদি সম্পর্কে কোনো তথ্যই পাওয়া যায় না। এ বিষয়গুলো স্পষ্ট থাকা এ জন্য গুরুত্বপূর্ণ যে, একজন কর্মী, সে নারী বা পুরুষ যেই হোক, বিদেশে চাকরির উদ্দেশ্যে বৈধপথে যেতে হলে তাকে প্রথমেই এ কাজের জন্য সরকারি অনুমোদনপ্রাপ্ত স্থানীয় একটা রিক্রুটিং এজেন্সির কাছে যেতে হয়। সে এজেন্সি সংশ্লিষ্ট কর্মী যে দেশে যেতে চান সে দেশের একটা রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে ভিসা সংগ্রহ করতে হয়। এরপর, একদিকে সে-ই ভিসা এ দেশে সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাস কর্র্তৃক সত্যায়িত হতে হয়, আরেকদিকে ওই কর্মীকে বিএমইটির কাছ থেকে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা দিয়ে ছাড়পত্র নিতে হয়। এ ছাড়পত্র ছাড়া বিদেশগামী কোনো কর্মীর বিমানে উঠতে পারাই অসম্ভব। অর্থাৎ একজন কর্মী যখন বিদেশে যান, তখন পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে দুই দেশের সরকার ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকে।

আবার একজন নারী কর্মী বিদেশে যান দুই দেশের সরকারের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তির ভিত্তিতে, যেখানে ওই নারীর কর্মকালীন সুযোগ-সুবিধার কথা যেমন লেখা আছে, তেমনি যেকোনো পক্ষ চুক্তি লঙ্ঘন করলে তার প্রতিকার কী হবে তাও লেখা আছে। যেমন : একজন বাংলাদেশি নারীকর্মীকে সাধারণত দুই বছরের জন্য রিক্রুট করা হয়। এ সময়ের মধ্যে তিনি যদি নিজের কারণে দেশে ফেরত আসতে চান, তাহলে তাকে ফিরতি বিমানভাড়া তো বটেই, মোটা অঙ্কের জরিমানাও গুনতে হয়। এখন ওই নারীকে যদি পালিয়ে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ভিকটিম এমন কথাই বলেন, আসতে হয় তাহলে তিনি সংশ্লিষ্ট দেশের ইমিগ্রেশন পার হলেন কীভাবে? বিমান ভাড়াই বা তিনি পেলেন কোথা থেকে?

ধারণা করা হয়, অভিবাসন ক্ষেত্রে যেসব এনজিও কাজ করছে, তারা ওই নারীদের দেশে ফিরতে ‘সব ধরনের সহায়তা’ করে থাকে। এ ধারণাটাকে একেবারে অমূলক বলা যায় না এ কারণে, বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ভিকটিম বা তার আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে বিভিন্ন এনজিও প্রতিনিধিদেরও দেখা যায়। মানবাধিকার বা অভিবাসন সম্পর্কিত এনজিও সম্পর্কে যাদের ধারণা আছে, তারা জানেন যে, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে যত কেস হাজির করা যাবে, তত তাদের পৃষ্ঠপোষক আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর দানে তাদের তহবিল মোটা হবে। এ কারণে বহু এনজিও প্রতিনিধিকে ইদানীং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে, বিশেষ করে সৌদি আরবে যেখানে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি নারী কর্মী কাজ করেন, ঘুর ঘুর করতে দেখা যায়।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে যে নারী কর্মী ফেরত আসার সংখ্যা একবারে লাফিয়ে বেড়ে গেল, তার সঙ্গে আরেকটি বিষয়ও জড়িত বলে অনেকের ধারণা। এ বিষয়টি বলার আগে প্রাসঙ্গিক কিছু তথ্য জেনে নেওয়া ভালো। বাংলাদেশের পাঁচ লাখের বেশি নারী গৃহকর্মী মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে কাজ করেন। তবে সৌদি আরবেই কাজ করেন তিন লাখের মতো। বহু বছর ধরেই এ দেশ থেকে নারী কর্মীরা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কাজ করতে যাচ্ছেন। তবে বড় আকারে যাওয়া শুরু করেন সৌদি আরবের সঙ্গে ২০১৫ সালে এ বিষয়ে একটা সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর থেকে। কিন্তু ২০১৮ সালের আগে কখনোই বড় আকারে নারীকর্মী ফেরত আসার ঘটনা ঘটেনি। গণমাধ্যমের হিসাব মতে, এ বছর ৪০০-এর বেশি নারীকর্মী দেশে ফেরত এসেছেন। মোট যে পরিমাণ বাংলাদেশি নারীকর্মী সৌদি আরব বা মধ্যপ্রাচ্যের অন্য কিছু দেশে কাজ করছেন, তার তুলনায় ৪০০ নারীকর্মী ফেরত আসাটা খুব বড় ব্যাপার নয়। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, এক বছরেই কেন এত নারীকর্মী ফেরত এলো? তাদের ওপর নির্যাতন তো হঠাৎ করেই বাড়েনি। সৌদিরা যদি ‘বর্বর’ হয়েই থাকে, তারা তা আগেও ছিল।

জানা গেছে, নারীরা বিদেশে যাওয়ার কারণে দেশের সবচেয়ে বড় এনজিওটি, ক্ষুদ্রঋণ ব্যবসায়ে দীর্ঘদিন ধরে যার বেশ দাপট চলছে, একটু বেকায়দায় পড়ে গেছে। বিদেশে যে নারীরা গৃহকর্মী হিসেবে যাচ্ছেন, তাদের প্রায় সবাই দরিদ্র অথবা স্বল্প আয়ের মানুষ, ক্ষুদ্রঋণের চাহিদা সাধারণত যাদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। তারা ক্রমবর্ধমান হারে বিদেশে গিয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার কারণে ক্ষুদ্রঋণের বাজার এখন একটু পড়তির দিকে। তাই ওই এনজিওটি নারীদের বিদেশে যাওয়ার প্রবল বিরোধিতা করছে। আগেই বলা হয়েছে, বিদেশে, আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে সৌদি আরবে, বাংলাদেশি গৃহকর্মীর ওপর নির্যাতনের অভিযোগ এর আগেও এসেছে এবং এগুলো ছোট এনজিওগুলোই তুলে ধরত। কিন্তু এ বড় এনজিওটি এ ব্যাপারে সক্রিয় হওয়ার পর থেকে নির্যাতনের অভিযোগ আসা লাফ দিয়ে বেড়ে গেছে।

শুধু তাই নয়, এর আগে কখনোই বিদেশে নারীকর্মী পাঠানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার দাবি ওঠেনি। কিন্তু ওই এনজিওটি এ দাবির কথা এখন জোরেশোরে বলছে। তারা এমনকি এমনও বলছে, যে নারীরা এখন বিদেশে গৃহকর্মী হিসেবে নিয়োজিত আছেন, তাদেরও দেশে ফিরিয়ে আনা হোক। তাদের বক্তব্য হলো, তিন-চার লাখ নারী ফিরে এলে তাদের পোশাকশিল্প খাতে পুনর্বাসন করা যাবে।

কিন্তু পোশাকশিল্পের মালিকরা শত শত কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন কি চ্যারিটি না ব্যবসা করার জন্য? তা ছাড়া দেশে আরও যে কয়েক কোটি একই ধরনের দুস্থ ও অশিক্ষিত নারী আছেন, বিদেশে গিয়ে যারা অন্য অনেকের মতো মধ্যবিত্তের কাতারে উঠে আসতে পারেন, তাদেরও কি পোশাকশিল্পে বা অন্য কোথাও ‘পুনর্বাসন’ করা যাবে?

মনে রাখতে হবে, এখন যে চার-পাঁচ লাখ প্রান্তিক নারী বিদেশে চাকরি করছেন তাদের আয় দিয়ে তারা প্রত্যেকে অন্তত চার-পাঁচ সদস্যের পরিবারের ভরণপোষণ করছেন, সন্তানদের লেখাপড়া করাচ্ছেন, দেশে থাকতে যা তারা চিন্তাও করতে পারতেন না। এ কারণেই যে বছর যে দেশটি থেকে ৪০০ নারী ফেরত এসেছেন, সেই একই বছর একই দেশে আরও ৭৩ হাজার বাংলাদেশি নারী গৃহকর্মী চাকরি নিয়ে গেছেন। আরেকটা কথা মনে রাখতে হবে, অভাবের তাড়নায় প্রতারকের খপ্পরে পড়ে কয়েক বছর আগেও এসব নারী ভারত বা অন্য কোনো দেশের যৌনপল্লীতে পাচার হয়ে যেত।

আসলে যেটা জরুরি তা হলো, নির্যাতনের যেসব অভিযোগ এরই মধ্যে এসেছে সেগুলো দ্রুত সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে সুরাহা করা। একই সঙ্গে যে হোমসিকনেসের কারণে বা অজানা-অচেনা কালচার বা জীবনধারার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পেরে, নানা কারণে এসব নারী দেশে চলে আসছেন, সরকার ও জনশক্তি রপ্তানিকারকদের উচিত সেসব দূর করার ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। বিদেশগামী নারীদের উপযুক্ত, প্রয়োজনে দীর্ঘমেয়াদি, প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। বর্তমানে হংকং ও মেকাওয়ে একই পেশায় নারীকর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে এমন ব্যবস্থা মেনে চলা হচ্ছে। আর এ ক্ষেত্রে সবারই সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসা উচিত। কারণ বিদেশে এ নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা মানে শুধু দেশের বেকারত্বের চাপ কমানো নয়, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করাও।

সাইফুর রহমান তপন

লেখক

সাংবাদিক ও কলামনিস্ট

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত