নটরডেম কলেজের শিক্ষার্থী ইয়োগেন হেনছি গোন সালভেজ২৩) খুনের ঘটনায় জড়িত সন্দেহভাজন বোরকা পরিহিত এক তরুণীকে খুঁজছে পুলিশ। সবিতা(২০) নামের ওই সন্দেহভাজন তরুণীকে ধরতে রাজধানী ঢাকা ও ঢাকার বাইরে অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ।
এ বিষয়ে পুলিশের সবুজবাগ থানার তদন্ত কর্মকর্তা এস আই কামরুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, সালভেজ খুনের ঘটনার প্রাথমিক তদন্তে একজন নারীর সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। সন্দেহ করছি সবিতা নামের ওই নারী একাই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে পালিয়েছে। তাকে ধরতে তার গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরসহ রাজধানীর বিভিন্ন কর্মস্থলে পরিচালনা করা হচ্ছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা বলেন, সবুজবাগের ৯ নম্বর লেনের ৭৭/এ নম্বর ভবনের নিচতলায় লাগানো সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত ১১ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার বিকেল ৩টা ২০ মিনিটে সালভেজের সঙ্গে বোরকা পরিহিত এক তরুণী রুমে প্রবেশ করেন। এর দুই ঘণ্টা পর বোরকা পরিহিত ওই তরুণী একাই বাসা থেকে বেরিয়ে যান।
তদন্ত কর্মকর্তা এস আই কামরুজ্জামান বলেন, খবর পেয়ে রাত ২ টার দিকে হাত-পা বাধা অবস্থায় সালভেজের রক্তাক্ত লাশ উদ্ধারের সময় রুম থেকে প্রাণ কোম্পানির ফ্রুটো জুসের একটি বোতল, একটি ওড়না, কেরোসিনে ভেজানো গার্মেন্টসের কিছু ঝুট কাপড় ও নারীদের ব্যবহৃত এক জোড়া স্যান্ডেল আলামত হিসেবে জব্দ করা হয়েছে।
সবুজবাগ থানার ওসি আবদুল কুদ্দুস ফকির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ঘটনাস্থল থেকে গুরুত্বপূর্ণ আলামত জব্দ করা হয়েছে। এগুলোর পরীক্ষা নিরীক্ষা চলছে। প্রাথমিক তদন্তে বোরকা পরিহিত একজন তরুণীর সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। তার পরিচয় শনাক্ত করে তাকে গ্রেপ্তারের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন জায়গায় অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া বিভিন্ন আলামত বিশ্লেষণ করে, নিহতের স্বজন, বাড়ির মালিক ও সন্দেহভাজন তরুণীর ঘনিষ্ঠজনদের জিজ্ঞাসাবাদ করে জানা গেছে, তরুণীর নাম সবিতা। তার বাড়ি চাঁদপুর জেলায়। চাকরি করতেন মতিঝিল শাখা কন্টিনেন্টাল কুরিয়ার সার্ভিসের কল সেন্টারে। সেখানে সালভেজ আসা যাওয়া করতেন। সেই সুবাদে সালভেজের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। সেই সূত্র ধরে তাদের মধ্যে ভাব-বিনিময় ও প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এরই একপর্যায়ে গত ১ ফেব্রুয়ারি তারা স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে সবুজবাগের ওই ভবনের নিচতলার দুটি রুম ভাড়া নেন। ভাড়া নেওয়ার সময় মেয়েটি স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে গাজিপুর জেলা উল্লেখ করেছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট আরও একাধিক কর্মকর্তা বলেন, তদন্তে জানা গেছে, ইসলাম ধর্মাবলম্বী সবিতা বিবাহিত ছিলেন। আগের স্বামীকে ছেড়ে খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বী সালভেজের সাথে প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয়। এর পাশাপাশি আরও এক যুবকের সঙ্গে মেয়েটির সম্পর্ক চলছিল। একইভাবে সালভেজেরও একাধিক গার্লফ্রেন্ডের তথ্য পেয়েছিল মেয়েটি। মূলত এসব বিষয় নিয়েই তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। আর এই দ্বন্দ্বের জের ধরেই সালভেজকে হত্যা করা হয়েছে।
সালভেজের ভগ্নিপতি রোমেন পিনারু দেশ রূপান্তরকে বলেন, এসব বিষয়ে পুলিশও আমাদের কাছে জানতে চেয়েছে। কিন্তু আমরা কিছুই জানি না। আমরা কোন মামলাও করি নাই।
সালভেজের গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রাম জেলার কোতোয়ালি থানার পাথরঘাটা এলাকায়। তার পিতার নাম ম্যাকলিন গোন সালভেজ। পুরান ঢাকার নারিন্দা এলাকায় খালাতো বোনের বাসায় থেকে পড়াশোনা করতেন তিনি। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট।
সবুজবাগ জোনের সহকারী কমিশনার রাশেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ফ্রুটো জুসের মধ্যে চেতনানাশক কোন কিছু মিশিয়ে সালভেজকে খাইয়ে প্রথমে অচেতন করা হয়। তারপর তার নিজের ব্যবহৃত ওড়না দিয়ে তার হাত ও পা বেঁধে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়েছে। এ ছাড়া লাশের চারপাশে কেরোসিনের গন্ধ পাওয়া গেছে। রুমের বিভিন্ন জায়গায় কেরোসিন ঢেলে রাখা হয়েছিল। ঘটনাস্থল থেকে দুই বোতল কেরোসিনও জব্দ করা হয়েছে। কেরোসিনে ভেজানো গার্মেন্টসের কিছু ঝুট কাপড়ও জব্দ করা হয়েছে।
সহকারী কমিশনার রাশেদ আরও বলেন, উদ্ধার হওয়া বিভিন্ন আলামত বিশ্লেষণ করে বোঝা যাচ্ছে, হত্যার পর রুমে আগুন ধরানোর পরিকল্পনা ছিল ঘাতকের। কিন্তু কোন কারণে আগুন ধরে নি বা ধরানো হয়নি। আসামি গ্রেপ্তার হওয়ার পর প্রকৃত কারণ উদ্ধার করা সম্ভব হবে।
গত মঙ্গলবার দিবাগত রাতে রাজধানীর সবুজবাগ কদমতলার ৯ নম্বর লেনের ৭৭/এ নম্বর বাসার নিচতলা থেকে হাত পা বাধা অবস্থায় সালভেজের রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। সালভেজ নটরডেম কলেজের মানবিক শাখার দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।
