কয়েক দিন আগে ‘দৈনিক প্রথম আলো’তে দেশের কর্মসংস্থানের ওপর একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। তাতে পরিসংখ্যান ব্যুরোর বরাত দিয়ে বলা হয়, ২০১৭ সালে ৬ কোটি ৩৫ লাখ কর্মক্ষম (১৫ থেকে ৬৫ বছর বয়সী) মানুষ ছিলেন। এর মধ্যে ৬ কোটি ৮ লাখ নরনারীর কাজ ছিল; বাকি ২৭ লাখ ছিলেন কর্মহীন অর্থাৎ বেকার। বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ২৫ শতাংশ। সপ্তাহে অন্তত ৪০ ঘণ্টা কাজের সুযোগ না থাকা ছদ্ম বেকারদের সংখ্যা ৬৬ লাখ। সব মিলিয়ে মোট বেকার সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ৯৩ লাখ। বর্তমানে প্রতি বছর ২০ থেকে ২২ লাখ মানুষ নতুন করে শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। ২০০২ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে গড়ে প্রতি বছর ৯ লাখ ৬৬ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। ২০১৮ সালে বিদেশে কাজ করতে গেছে প্রায় ১০ লাখ মানুষ।
ওপরের তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে, দেশের অভ্যন্তরে ও বাইরে কর্মসংস্থানের এই ধারা অব্যাহত থাকলে শ্রমবাজারে নতুন প্রবেশকারীদেরই পুরোপুরি সামাল দেওয়া সম্ভব হবে না। সেখানে গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতো প্রায় এক কোটি বেকার-ছদ্ম-বেকার নরনারীর জন্য অতিরিক্ত কাজের ব্যবস্থা এক মস্ত বড় চ্যালেঞ্জ।
বিগত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে আগামী পাঁচ বছরে দেড় কোটি কর্মসৃজনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। ওই সময় কমবেশি ১ কোটি ১০ লাখ শ্রমজীবী লোক বাজারে প্রবেশ করবে। আওয়ামী লীগ তাদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আগামী পাঁচ বছরে কর্মসংস্থান করতে পারলে ছদ্ম বেকারদের না হোক, অন্তত বর্তমানে কর্মহীন অলস বেকারসহ নতুন প্রবেশকারীদের জন্য আয়ের উৎসের জোগান দিতে পারবে। পাঁচ বছরে দেড় কোটি কর্মসৃজনের অর্থ হলো বছরে গড়পড়তা ৩০ লাখ লোকের কর্মসংস্থান। এটা চলমান পরিসংখ্যানের ওপর বছরে অন্তত ১০ লাখ অতিরিক্ত। এটি অবশ্যই একটা বড় চ্যালেঞ্জিং কাজ।
কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয় বিনিয়োগের মাধ্যমে। বিনিয়োগের পরিবেশ ভালো করতে পারলে এ দেশে বর্তমানে যেকোনো ভালো প্রকল্পে অর্থায়ন কোনো সমস্যা নয়। এ কথা দেশি-বিদেশি উভয় প্রকার তহবিলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। বিগত অর্থবছরে এ দেশ থেকে ৫ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার পুঁজি পাচার হওয়ার তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। বিনিয়োগ ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশের অভাবেই যে তা ঘটেছে, সেটা সহজে ব্যবসা করার সূচকের দিকে তাকালেই কারও বুঝতে বাকি থাকে না। এর বিপরীতে বিগত বছরে দেশে মাত্র ১ দশমিক ৭০৬ বিলিয়ন ডলারের সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) এসেছে। সহজে ব্যবসা করার সূচকের মান দুই অঙ্কের ঘরে নিয়ে আসতে পারলে এফডিআইয়ের পরিমাণ দ্বিগুণ হয়ে যাবে বলে অনেকেই দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন। তা ছাড়া পুঁজি পাচারও কমে যাবে। উদীয়মান এ অর্থনীতিতে বিনিয়োগে অনেক ভাসমান পুঁজির যে বিশেষ আগ্রহ রয়েছে, তা বাংলাদেশ সম্পর্কে বিভিন্ন বৈশ্বিক ব্যাংক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উপর্যুপরি প্রাক্কলন প্রকাশ থেকে বোঝা যায়।
১৯৬৫ সালে সিঙ্গাপুরকে যখন মালয়েশিয়া থেকে বের করে দেওয়া হয়, তখন সেখানে বেকারত্বের সমস্যা ছিল প্রকট; হার ছিল ১৪ শতাংশ। সিঙ্গাপুরে অবস্থিত ব্রিটিশ নৌঘাঁটি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত
থাকায় পরবর্তী পাঁচ বছরের মধ্যে আরও ৩০ হাজার কর্মের অবসান ছিল নিশ্চিত। এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ ও তার মন্ত্রিসভার অনেক সদস্য স্কুল-কলেজের আশপাশ দিয়ে আসা-যাওয়ার সময় হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীর সমাবেশ দেখে বিচলিত হয়ে পড়তেন। কীভাবে তাদের জন্য কর্ম জোগাড় করা যাবে, তা ছিল এক বড় দুশ্চিন্তার কারণ। কৃষিজ ও খনিজসম্পদ-শূন্য সিঙ্গাপুরে এসব যুবক-যুবতী শ্রমবাজারে প্রবেশ করলে অবস্থা কী দাঁড়াবে, তা চিন্তা করে তারা অনেক নির্ঘুম রাত কাটিয়ে দিতেন। দেশে এফডিআই আনার প্রয়োজনে তিনি নিজে ও তার সহকর্মীরা আমেরিকা-ইউরোপের বহুজাতিক কোম্পানির কর্ণধারদের দ্বারে দ্বারে ধরনা দিতে থাকেন। অর্থনৈতিক উন্নয়ন বোর্ড (ইডিবি) গঠন করে তাতে আক্ষরিক অর্থে ঙহব ঝঃড়ঢ় ঝবৎারপব চালু করেন। এ প্রতিষ্ঠানে ইউরোপ-আমেরিকা থেকে পাস করা সেরা ও চৌকস স্নাতকদের নিয়োগের ব্যবস্থা করেন। বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের নির্বাহীরা যাতে প্রথম দর্শনেই আকৃষ্ট হন, তার জন্য বিমানবন্দর থেকে তাদের হোটেল, মন্ত্রণালয়, মন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আসা-যাওয়ার রাস্তার দুই ধার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও ফুল-লতাগুল্ম দ্বারা সুশোভিত করে তোলেন। আরও নানা কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সিঙ্গাপুরে তিনি বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ ও আস্থার ক্ষেত্র তৈরিতে সমর্থ হন। ফলে ১৯৯৭ সাল নাগাদ শুধু মার্কিন কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগের পরিমাণই দাঁড়ায় ১৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
তার আগে অবশ্য বেকার সমস্যার আশু সমাধানে তিনি প্রথমে পর্যটনশিল্পের উন্নয়নে মনোযোগী হয়েছিলেন। শ্রমনির্ভর এ শিল্পে পাচক, আয়া, ওয়েটার, ধোপা, নাপিত, গাইড, ড্রাইভার, হস্তশিল্পী প্রভৃতি স্বল্পশিক্ষিত অথচ প্রশিক্ষিত লোকবলের প্রয়োজন হয়। এ ধারণায় অনুপ্রাণিত হয়ে ১৯৬৯ সালে তিনি ঝরহমধঢ়ড়ৎব ঞড়ঁৎরংঃ উবাবষড়ঢ়সবহঃ ইড়ধৎফ গঠন করেন। এ প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্ব দেন সিনেমা জগতের বিশিষ্ট তারকা জঁসহব ঝযধ-িকে। বিনোদন-শিল্পের সঙ্গে যুক্ত থাকার সুবাদে পর্যটকদের কীভাবে আকৃষ্ট করা যায়, সে কৌশল তার ভালো জানা ছিল। এ উদ্যোগ প্রাথমিক পর্যায়ের অনেক চাকরি ও আয়ের জোগান দিতে সমর্থ হয়।
শুধু অবকাঠামোগত কিছু পার্থক্য ছাড়া অন্য সব বিবেচনায় সিঙ্গাপুরের চেয়ে বাংলাদেশের অবস্থান বেশ ভালো ও সুবিধাজনক। এখানে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম সেরা উর্বর কৃষিভূমি, যেখানে সহজেই কৃষি উৎপাদন বাড়ানো ও বৈচিত্র্যময় করা যায়। এখানে রয়েছে অনেক জলজ ও খনিজসম্পদের সমাহার, যেগুলো সহজেই মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কাজে লাগানো যায়। এখানকার জনগোষ্ঠী প্রায় অভিন্ন নৃ-তাত্ত্বিক বিশিষ্ট ও ভাষার উত্তরাধিকারী, যারা খুবই শিক্ষণপ্রিয়, সৃজনশীল ও কঠোর পরিশ্রমী। এখানকার জনগোষ্ঠীর আকার ও মধ্যবিত্তের সংখ্যা অনেক বড়। ফলে এটা নানা ধরনের পণ্যের এক বড় বাজার। এ দেশ উৎপাদন ও ভোগের এক আদর্শ স্থান।
সস্তাশ্রমের কল্যাণে বাংলাদেশ আজ বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি-পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। কিন্তু এ খাত আর বাড়তি শ্রমিক ধারণ করতে পারছে না; অর্থনীতির সুস্থতার জন্য তা সমর্থনও করা যায় না। যদিও দেশে এ সেক্টরে উচ্চপর্যায়ের কর্মীর বেশ ঘাটতি রয়েছে। বিদেশ থেকে লোকবল এনে সে ঘাটতি পূরণ করা হচ্ছে এবং তাদের বেতন-ভাতা বাবদ বছরে পাঁচ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। যা হোক, তৈরি পোশাকশিল্পের বাইরে স্বল্প ও মধ্য মেয়াদে ব্যাপকভাবে কর্মসংস্থানের জন্য পর্যটন এবং বিদেশে কর্মী পাঠানো হতে পারে কার্যকর ও টেকসই বিকল্প। আমাদের সমুদ্রসৈকত, দ্বীপাঞ্চল, উপকূল অঞ্চল, হাওর-বাঁওড়, নদীনালা, চরাঞ্চল, বনভূমি, পাহারাঞ্চল, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, হস্তশিল্প প্রভৃতি হতে পারে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের বিচরণক্ষেত্র ও দর্শনীয় বিষয়। কিন্তু এর জন্য সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে প্রচুর বিনিয়োগ দরকার হবে। তবে সেটা পর্যায়ক্রমে করলেও চলবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের আকর্ষণীয় স্পটগুলোর সঙ্গে সহজ ও ঝামেলামুক্ত যোগাযোগ এবং থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা গেলে পর্যটনশিল্পের ভুঁইফোড় প্রবৃদ্ধি অবশ্যম্ভাবী। তবে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা এর প্রধান পূর্বশর্ত।
পর্যটনশিল্পের কর্মী ও অপারেটরদের বিশেষভাবে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নিতে হবে। সাধারণ মানুষকেও এর প্রভাব সম্পর্কে অবহিত করার ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে মোটের ওপর দেশে পর্যটনবান্ধব পরিবেশ গড়ে ওঠে। আমাদের দেশের কিছু কিছু মানুষ এখনো অন্যদের, বিশেষ করে অপরিচিত পর্যটকদের ঠকিয়ে অর্থোপার্জন করা খারাপ কিছু মনে করে না; অনেকে আবার এ-জাতীয় প্রতারণামূলক কাজ থেকে অর্থের সঙ্গে আনন্দও লাভ করে থাকে। এই মনোভাব এ শিল্পের উন্নয়নের একটি বড় বাধা। থাইল্যান্ডে কোনো ফুট ম্যাসাজের দোকানে গেলে কাজ শুরু করার আগে সেবাদানকারিণী গ্রাহককে দেবতা বিবেচনায় প্রণাম করে থাকে; ঠকানো তো দূরের কথা। একবার ঠকলে ভুক্তভোগী যে দ্বিতীয়বার আর সেখানে যাবে না, তা নিশ্চিত করে বলা যায়। ন্যাড়া তো বেলতলায় একবারই যায়। শুধু তা-ই না, এই প্রতারণার কথা নানা রং মাখিয়ে সে আরও দশজনের কাছে চালান করে। ফলাফল হতে থাকে ক্রমবর্ধিঞ্চু হারে নেতিবাচক। আমরা আর্থিক ক্ষেত্রে অনেক উন্নতি করলেও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রের এ দুষ্টচক্র থেকে এখনো বের হতে পারিনি।
পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক আচার-অনুষ্ঠান আয়োজনের ব্যবস্থা যেমন করা প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন আন্তঃমহাদেশীয় বিনোদনব্যবস্থারও। প্রয়োজনে তা শুধু বিদেশি পর্যটকদের মধ্যে সীমিত করে রাখা যায়। ১৯৬৯ সালে মালয়েশিয়ার প্রথম প্রধানমন্ত্রী টিংকু আবদুর রহমান স্বল্পতম সময়ে অবকাশযাপন কেন্দ্র গেনটিং হাইল্যান্ড উন্নয়নে সফল হওয়ার পর দেশের পর্যটনশিল্পের উন্নয়নের কথা মাথায় রেখে এর নির্মাতা লিম গো টোংকে সেখানে ক্যাসিনো পরিচালনার অনুমতি দেন। ভূপৃষ্ঠ থেকে ১৮০০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত এ বিনোদনকেন্দ্রটি এখনো এই মুসলিম দেশটির অন্যতম প্রধান রাজস্ব সরবরাহের উৎস।
ইংরেজি ও আরবি ভাষা আমরা জন্মলাভের পর থেকেই শিখতে শুরু করি; কিন্তু দু-চার কলম লিখতে পারলেও, এসব ভাষায় কথা বলতে পারি না। বিদেশে চাকরি পাওয়া এবং দেশের অভ্যন্তরে পর্যটনশিল্পে নিয়োজিত হওয়ার ক্ষেত্রে এ দুটি ভাষারই বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য ও প্রশাসনিক কাজকর্মেও এদের গুরুত্ব সমধিক। মালদ্বীপ একটি শতভাগ মুসলমান অধ্যুষিত দ্বীপ দেশ। ওই দেশে বৈদেশিক মুদ্রার ৬০ ভাগেরও বেশি আসে পর্যটনশিল্প থেকে। নবম-দশম শ্রেণি পাস করা নারীরা পরিপাটি হিজাব পরে সুমিষ্ট কণ্ঠে খলখল করে ইংরেজি বলে যেভাবে হোটেল চালায়, তার বিপরীতে আমাদের ইংরেজি বলার করুণদশা জনৈক শিক্ষিত বাঙালির বিলেত ভ্রমণকালে ছাতা হারানোর গল্পের মধ্যে ফুটে ওঠে। বাঙালি ভদ্রলোক ছাতা রেখে হোটেলের ফ্রন্ট ডেস্কের কর্মীর সঙ্গে প্রয়োজনীয় আলাপ সারছেন। এমন সময় চোর তার ছাতা হরণ করে দেয় চম্পট। চোরের ছাতা নিতে দেখার পরও কেন তিনি চোরকে নিষেধ করেননিÑ পুলিশের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, নিষেধ করার বাক্যটি ইংরেজিতে অনুবাদ করতে যে সময় লেগেছিল, তার মধ্যেই চোর উধাও হয়ে যায়। তাই তো চোরকে আর বারণ করা যায়নি। তৈরি পোশাকশিল্পের উচ্চপর্যায়ের কর্মী বা ইংরেজিতে কথা বলায় পটু সার্ভিস সেক্টরের কর্মী গড়ার জন্য মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি।
তবে এ মুহূর্তে যেসব বেকার তীর্থের কাকের মতো চাকরি প্রত্যাশা করছেন, তাদের জন্য জরুরি ও স্বল্পমেয়াদি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এই স্বল্পমেয়াদি ব্যবস্থার একটি হতে পারে বর্ধিত হারে বিদেশে দক্ষ ও আধা দক্ষ কর্মী পাঠানোর ব্যবস্থা গ্রহণ। বর্তমানে প্রায় এক কোটি বাঙালি পেশাগত কারণে বিদেশে অবস্থান করছে। বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশি দূতাবাস ও মিশনগুলোর কর্মতৎপরতা বাড়িয়ে এ সংখ্যা সহজেই দ্বিগুণ করা যায়।
কিছুদিন ধরে দেশের কূটনীতিকে অর্থনৈতিক কূটনীতিতে রূপান্তরের কথা শোনা যাচ্ছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছু হচ্ছে বলে মনে হয় না। এখনো মিশনগুলো গতানুগতিক ধারায় নেতানেত্রী ও সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণের প্রটোকল ও সরকারি ফেচিলিটেটর বৈ আর কিছু নয়। এ ধারার পরিবর্তন করে সংশ্লিষ্ট দেশের সম্ভাবনা ও সুবিধা বিবেচনায় নিয়ে প্রতিটি মিশনের জন্য সময়াবদ্ধ সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেওয়া দরকার এবং সেগুলোর অর্জনের মাত্রার ওপর পরবর্তী পদোন্নতি ও নিয়োগের বিষয় বিবেচনা করার ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একটি টাস্কফোর্সের মাধ্যমে অনুধ্যান করে কোন কোন দেশে, কতজন শ্রমিক ও কর্মী পাঠানো যাবে, কোন কোন দেশে কী পরিমাণ পণ্য রপ্তানি করা যাবে, কোন কোন দেশে কী প্রযুক্তি পাঠানোর সুযোগ আছে, ভবিষ্যতে কী ধরনের পণ্য ও কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন লোকবলের কী রকম চাহিদা হবে, তা যাচাই করে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা যায় এবং দেশে তার জন্য ব্যাকওয়ার্ড ও ফরওয়ার্ড লিংকেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়। নিরবচ্ছিন্ন পরিধারণ-সংবলিত এ ব্যবস্থায় বেকার সমস্যা সমাধান ও রপ্তানি বাড়ানোর ক্ষেত্রে ভালো ফল পাওয়া যেতে পারে।
ইউরোপ-আমেরিকা-অস্ট্রেলিয়ায় বাঙালিদের বিচরণ দীর্ঘদিনের। এর বাইরে বিশাল জগৎ এখনো আমাদের কাছে অনাবিষ্কৃত। আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা, এমনকি আমাদের কাছাকাছি দেশ কম্বোডিয়া, লাওস, মিয়ানমার প্রভৃতি দেশে কৃষি, কৃষিপ্রযুক্তি রপ্তানিসহ সংশ্লিষ্ট লোকবল পাঠানোর সুযোগ থাকা অস্বাভাবিক নয়। চীন এরই মধ্যে আফ্রিকার অনেক দেশে চাল উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজ হাতে নিয়েছে। উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে ওইসব দেশের সরকারও এ কাজে উৎসাহ দিচ্ছে। আমরাও কৃষি, তৈরি পোশাকসহ নানা শিল্প ও অবকাঠামো উন্নয়নে তাদের সহযোগী হিসেবে দাঁড়িয়ে যেতে পারি। সেই সঙ্গে পারি নিজেদের ভাগ্যের পরিবর্তন করতে। আমাদের সেনাবাহিনী ও শ্রমিক ভাইয়েরা এরই মধ্যে এরূপ কাজে যথেষ্ট সুনাম কুড়িয়েছেন।
এ কার্যক্রমকে সফল ও টেকসই করতে চাহিদা অনুযায়ী মানসম্পন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ুন, শিক্ষাদানের ব্যবস্থা গ্রহণ, প্রশিক্ষণ প্রদান, ভাষা শিক্ষাদানসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ এবং নিরবচ্ছিন্নভাবে পরিবীক্ষণের ব্যবস্থা নিয়ে তা নিয়মিতভাবে হালনাগাদ করতে হবে। এতে বেসরকারি কার্যক্রমকে উৎসাহিত করতে হবে। তবে তাদের কাজের মান কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর তৈরি পোশাকশিল্পের মানোন্নয়নে আমরা সফল হয়েছি। এ ক্ষেত্রেও সে সফলতা আনতে হবে। ন্যাড়া বেলতলায় গেলেও কোনো সমস্যা যাতে না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
