হারিয়ে যাচ্ছে টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী পোড়াবাড়ির চমচমের সেই প্রকৃত স্বাদ। মিষ্টিপ্রেমীরা বঞ্চিত হচ্ছেন চমচমের নিজস্ব গন্ধ থেকে। যে মিষ্টির গন্ধে মৌমাছিদেরও ভিড় ছিল পাঁচআনী বাজারের মিষ্টিপট্টিতে। এখন মিষ্টিপট্টিতে গেলে আগের মতো মৌমাছিদেরও দেখা মেলে না। তবে দাম কিন্তু থেমে নেই, দিন দিন বেড়েই চলছে চমচমের দাম। মিষ্টির জগতে অপ্রতিদ্বন্দ্বী ঐতিহ্যবাহী এই চমচম ব্রিটিশ আমল থেকে অবিভক্ত ভারতবর্ষসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে টাঙ্গাইলকে ব্যাপকভাবে পরিচিতি করেছে। পোড়াবাড়ির চমচম প্রথম কে তৈরি করেন এর সঠিক ইতিহাস পাওয়া যায় না। তবে অনেকের মতে, দশরথ গৌড় নামের এক ব্যক্তি সর্বপ্রথম পোড়াবাড়িতে এ চমচম তৈরি ও ব্যবসা শুরু করেন। অনেক দেশবরেণ্য ব্যক্তি পোড়াবাড়ির চমচমের ভক্ত ছিলেন। এর মধ্যে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী থেকে শুরু করে জমিদার ওয়াজেদ আলী খান পন্নী, নওয়াব আলী চৌধুরীসহ অনেক ব্যক্তিত্বের পদচারণে পোড়াবাড়ি ধন্য হয়। ১৯৬০ সালের পর ধলেশ্বরীর বুকে জেগে ওঠে অসংখ্য চর। বন্ধ হয়ে যায় পোড়াবাড়ির লঞ্চ ও স্টিমার ঘাট। ভাটা পড়ে এর বিক্রিতে।
বর্তমানে নানা সমস্যায় জর্জরিত ছোট একটি বাজারে মাত্র চার-পাঁচটি ভাঙাচোরা মিষ্টির দোকান ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তবে বাজারের আশপাশের পাঁচ-ছয়টি বাড়িতে এখনো চমচম তৈরি হয়। তারা ঢাকা, ময়মনসিংহ, যশোর, বগুড়াসহ বিভিন্ন জায়গায় এই চমচম সরবরাহ করছে। এ ছাড়া শহরের পাঁচআনী বাজারে কয়েকজন মিষ্টি ব্যবসায়ী ঢাকার শতাধিক দোকানসহ দেশের পাঁচ শতাধিক মিষ্টি ব্যবসায়ীকে এই মিষ্টি সরবরাহ করে থাকেন।
কিছু অসাধু মিষ্টি ব্যবসায়ী টাঙ্গাইলের পোড়াবাড়ির চমচমের নাম করে বড় সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রাজধানীসহ কয়েকটি জায়গায় মিষ্টির দোকান গড়ে তুলেছে। এর ফলে আসল চমচম কিনতে গিয়ে মানুষ প্রতারিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। আসল চমচম চেনা দায় হয়ে পড়েছে। পোড়াবাড়ির আসল চমচমের কারিগররা অর্থের অভাবে দুর্বিষহ জীবন-যাপন করছে।
চমচমের গৌরব হারিয়ে ফেলার কারণ জানতে চাইলে টাঙ্গাইলের প্রসিদ্ধ চমচমের দোকানের মধ্যে এলেঙ্গার বন্যা মিষ্টান্নভা-ারের মালিক সুব্রত ঘোষ গুপি বলেন, বিশেষ প্রক্রিয়ায় নদীর বিশুদ্ধ পানির অভাব, খাঁটি দুধ ও দেশি আখের চিনি না পাওয়ায় চমচমের সেই আগের গন্ধ ও স্বাদ নেই। প্রকৃত কারিগর ও ব্যবসায়ীরা আর্থিক লাভ থেকে বঞ্চিত হয়ে এ পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন। টাঙ্গাইলের পোড়াবাড়ির এ গৌরবময় ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারিভাবে কারিগরদের পৃষ্ঠপোষকতা করার পাশাপাশি ভেজাল চমচম ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
