মঙ্গলবার, ২৫ জুন ২০২৪, ১০ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

নিরাপত্তা পরিষদে বাংলাদেশ

আর কোনো রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়া হবে না

আপডেট : ০১ মার্চ ২০১৯, ১০:১৬ পিএম

আর কোনো রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়া হবে না বলে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

নিরাপত্তা পরিষদে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রসচিব মো. শহীদুল হক রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে তিনটি প্রস্তাব দেন বলে শুক্রবার জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশন থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়। বৃহস্পতিবার নিরাপত্তা পরিষদের অধিবেশনে পররাষ্ট্রসচিব শহীদুল হক দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, বাংলাদেশের পক্ষে মিয়ানমারের আরও রোহিঙ্গা আশ্রয় দেওয়া সম্ভব নয়।

জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশন থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে মিয়ানমার পরিস্থিতির ওপর এক বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে মিয়ানমার-বিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত ক্রিস্টিন শ্রেনার বার্গেনার তার সাম্প্রতিক বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সফরের বিষয়ে ব্রিফ করেন। নিরাপত্তা পরিষদের ফেব্রুয়ারি মাসের সভাপতি ইকোটরিয়াল গিনি বিশেষ এ আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ সদস্যের বাইরে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার এ সভায় বক্তব্য রাখে।

শহীদুল হক নিরাপত্তা পরিষদের অধিবেশনে জানান, ইতিমধ্যে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের একজনও স্বেচ্ছায় রাখাইনে ফিরতে রাজি হচ্ছে না। কারণ রাখাইনে সেই পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়নি। তথ্যসূত্র: বিবিসি ও চ্যানেল নিউজ এশিয়া।

বৈঠকে শহীদুল হক বলেন, প্রতিবেশী দেশের রোহিঙ্গাদের প্রতি সহানুভূতি দেখিয়ে এখন বাংলাদেশকে তার মূল্য দিতে হচ্ছে। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় চাপ সৃষ্টি করলেও মিয়ানমারের টালবাহানায় সেটা সম্ভব হচ্ছে না। এক ধরনের চাপে মিয়ানমার প্রতি সপ্তাহে ১ হাজার ৫০০ জন করে এবং দুই বছরের মধ্যে সব রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে রাজি হলেও সেই অঙ্গীকার পালন করছে না।

শহীদুল হক বলেন, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া নিয়ে তৈরি হওয়া সংকট খারাপ থেকে আরও খারাপের দিকে গেছে। তিনি বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য নিরাপত্তা পরিষদের প্রতি আহ্বান জানান।

বৈঠকে নিরাপত্তা পরিষদে মিয়ানমারের পক্ষে উপস্থিত জাতিসংঘে নিযুক্ত দেশটির রাষ্ট্রদূত হায়ু দো সোয়ান রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে সব পক্ষকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘বড় ধরনের বাস্তবিক ও মানসিক বাধা’ রয়েছে তাদের ফিরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে। সময় নিয়ে ধৈর্য ধরে সাহসের সঙ্গে রাখাইনে আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।

সংকট সমাধানে সোয়ান তার সরকারের অঙ্গীকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি দাবি করেন, রাখাইন উপদেষ্টা বোর্ড সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে যেসব সুপারিশ করেছে, তার সবগুলোই বাস্তবায়িত হচ্ছে।

সোয়ান পরিষদকে জানান, তার সরকার এই লক্ষ্যে বাংলাদেশের সঙ্গে একটি যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে। দুই দেশের মধ্যে ইতিমধ্যে যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, উভয় পক্ষ যদি তা মেনে চলে, তাহলে প্রত্যাবাসন পরিকল্পনা সম্পাদন সম্ভব হবে।

মিয়ানমার রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি ক্রিস্টিন শ্রেনার বুরজেনে বলেন, লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ অসম্ভব উদারতা দেখিয়েছে। কিন্তু অনির্দিষ্টকালের জন্য রোহিঙ্গারা সে দেশে অবস্থান করবে, এটা হতে পারে না। একা বাংলাদেশের পক্ষে এই দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি বাংলাদেশকে প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তার আবেদন জানান।

নিরাপত্তা পরিষদের বিশেষ অধিবেশনে বুরজেনে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে তার সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতার বিবরণ দিতে গিয়ে বলেন, মিয়ানমারের রাখাইনে অব্যাহত সামরিক সংঘর্ষের কারণে রোহিঙ্গাদের পক্ষে সম্মানজনক ও স্বেচ্ছায় প্রত্যাবর্তনের মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারেনি। সহিংসতার জন্য যারা দায়ী, তাদের বিচারের ব্যবস্থা না করা গেলে প্রকৃত সমঝোতার পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে না।

তিনি বলেন, মিয়ানমারে একশ্রেণির মানুষের ক্ষেত্রে যে বৈষম্য রয়েছে, তা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দূর করতে উদ্যোগী হতে হবে। এ ক্ষেত্রে মিয়ানমারের নেত্রী অং সাং সু চির বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে।

বৈঠকে নিরাপত্তা পরিষদের অধিকাংশ বক্তাই অব্যাহত সহিংসতায় উদ্বেগ জানান। পাশাপাশি সমস্যার সমাধানে কোনো লক্ষণীয় অগ্রগতি না হওয়ায় হতাশা ব্যক্ত করেন। যুক্তরাজ্যের প্রতিনিধি এই পরিস্থিতির জন্য মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে দায়ী করেন। ফ্রান্সের প্রতিনিধি বলেন, এ পর্যন্ত মিয়ানমার সরকার যেসব উদ্যোগ নিয়েছে, তা নিতান্তই অপ্রতুল।

রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে বস্তুত কোনো অগ্রগতিই হয়নি বলে মন্তব্য করে জার্মান প্রতিনিধি বলেন, লাখ লাখ রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু বাংলাদেশে দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থায় আরও এক, দুই বা তিন বছর কাটাতে বাধ্য হতে পারে, এ কথা ভাবলেও ভীতির সঞ্চার হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি বলেন, রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য অনুকূল পরিস্থিতি সৃষ্টির দায়িত্ব মিয়ানমার সরকারের। সে লক্ষ্যে তিনি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোয় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও মিডিয়ার অবাধ যাতায়াতের সুযোগ দাবি করেন।

এদিকে পরিষদের সদস্যদের মধ্যে একমাত্র রাশিয়া ও চীন পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে বলে দাবি করে। এজন্য মিয়ানমার সরকারের প্রশংসাও করে দেশ দুটি।

রুশ রাষ্ট্রদূত বৈঠকে বলেন, এপ্রিল পর্যন্ত যুদ্ধবিরতির নিশ্চয়তার ব্যাপারে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। তিনি যুক্তি দেখান, উদ্বাস্তু সমস্যাটি একমাত্র বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান সম্ভব। রাশিয়ার সঙ্গে সুর মিলিয়ে চীনা রাষ্ট্রদূত বলেন, অবস্থার শুধু উন্নতি হয়েছে তা-ই নয়, প্রায় ৬০ হাজার রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু ফিরে যাওয়ার জন্য অপেক্ষায় রয়েছে।

নিরাপত্তা পরিষদের বিবেচনার জন্য শহীদুল হকের তিনটি প্রস্তাব হলো: ১. কফি আনান অ্যাডভাইজরি কমিশনের সুপারিশসমূহের পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন তদন্তের অগ্রগতি বিধানের সহায়ক হিসেবে নিরাপত্তা পরিষদে রেজুলেশনটি আবারও আলোচনার টেবিলে আনা, যাতে প্রত্যাবাসনের জন্য একটি আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করা যায়। ২. নিরাপত্তা পরিষদের পুনরায় কক্সবাজার ও রাখাইন স্টেটের রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন। ৩. মিয়ানমারের অভ্যন্তরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রস্তাবিত অসামরিক ‘সেফ জোন’ করা।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ২০১৬ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে দেশটির সামরিক অভিযানের মুখে ৭ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে এসেছে রোহিঙ্গারা। সব মিলিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা ১১ লাখ ছাড়িয়েছে।

   
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত