মঙ্গলবার, ২৫ জুন ২০২৪, ১১ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

চকবাজার ট্র্যাজেডি ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সক্রিয়তা

আপডেট : ০২ মার্চ ২০১৯, ১০:৫২ পিএম

দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত আমার গত রোববারের কলাম পড়ে পরিচিত একজন বলেছেন, ‘আপনি তো সরকারকে বাঁচিয়ে দিলেন।’ একটু হালকা চালে বললাম, ‘সবাই তো সরকারকে গালি দিচ্ছে, আমি না হয় একটু ভিন্ন পথ ধরলাম।’ কিন্তু কথাটা তার মনঃপূত হয়েছে বলে মনে হলো না। তাই একটু ভেঙে বলতে হলো। তাকে বললাম, নিমতলী বা চকবাজার ট্র্যাজেডির মতো ঘটনার জন্য সরকারকে কষে গাল দেওয়া যায় ঠিক; কিন্তু এতে গ্রহণযোগ্য বা স্থায়ী কোনো সমাধান পাওয়া যায় না। আমাদের গালির মুখে সরকার হয়তো হুটহাট করে, পিটিয়ে-টিটিয়ে সব কেমিক্যাল ব্যবসায়ীদের ওখান থেকে উচ্ছেদ করল, কিন্তু তার পরেই দেখা গেল, এ ব্যবসায়ের সঙ্গে আর যত সব সেক্টর যুক্ত সেগুলোও কেমিক্যালের সহজলভ্যতার অভাবে সংকটে পড়ে গেল। প্রযুক্তিভিত্তিক নাগরিক জীবন তো এক অর্থে কেমিক্যালের ওপরই নির্ভরশীল। কোথায় লাগে না কেমিক্যাল? বাসনকোসন, কাপড়চোপড়, ঘরবাড়ি পরিষ্কার করা, ফ্রিজে খাবার সংরক্ষণ, এসির হাওয়া খাওয়া থেকে শুরু করে পোকামাকড় দমন সবখানেই তো কেমিক্যাল অপরিহার্য।

আবার এ ব্যবসায়ীদের বাড়িভাড়া দিয়ে ওই সব এলাকায় যেসব বাসিন্দা বছরের পর বছরের জীবিকা নির্বাহ করছেন তারাও তো হঠাৎ করে বিপদে পড়ে যান হুট করে কেমিক্যাল ব্যবসায়ীদের উচ্ছেদ করলে। যেমন, গত কদিন ধরে চকবাজার এলাকায় কেমিক্যালের দোকান ও গুদাম উচ্ছেদেও যে অভিযান চলছে তা একেবারেই অপরিকল্পিত এবং হুট করে শুরু হয়েছে। এরই মধ্যেই অভিযোগ উঠেছে, কোনো প্রকার বাছবিচার ছাড়া কেমিক্যাল দেখলেই নাকি সেখানে অভিযানকারীরা হাজির হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট ভবনের গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানির সংযোগ কেটে দেওয়া হচ্ছে। এর জের হিসেবেই শনিবার স্থানীয় অধিবাসী ও ব্যবসায়ীদের বাধার মুখে অভিযান বন্ধ করে দিতে হয়েছে। বাধাদানকারীদের অভিযোগ, তাদের জন্য কোনো বিকল্প ব্যবস্থা না করেই এ অভিযান চালানো হচ্ছে। তাই একান্ত বাধ্য হয়েই তারা এর বিরোধিতা করছেন।

এসব বিষয় বিবেচনায় ছিল বলেই আমার চেষ্টা ছিল, পুরান ঢাকার কেমিক্যাল ব্যবসায়ের সমস্যাটা যেহেতু বহুমাত্রিক ও জটিল, তাকে একটু ভেতরে গিয়ে বোঝা এবং সমাধানটাও ভেতর থেকেই নিয়ে আসা। নিমতলীর সমস্যাটাও একই প্রকৃতির ছিল। ২০১০ সালের ৩ জুন চুড়িহাট্টার আগুনের মতোই এক আগুনে ১২৪ জন মারা যাওয়ার পর সেখানে ব্যাপক জনসচেতনতা গড়ে ওঠে। সরকারের প্রয়োজন হয়নি, সেখানকার বাসিন্দারাই বাড়িওয়ালাদেরকে বাধ্য করেছে কেমিক্যাল ব্যবসায়ীদের কাছে বাড়িভাড়া না দিতে। গত রবিবারের দেশ রূপান্তরেই খবর বেরিয়েছে, এখন ওই এলাকা কেমিক্যাল ব্যবসায়মুক্ত। পত্রিকাটিতে ‘জেগে ওঠা মানুষে থেমেছে কেমিক্যাল’ শিরোনামের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘সম্মিলিত সামাজিক প্রতিরোধের মুখে এখন আর সেখানে ঝুঁকিপূর্ণ কোনো রাসায়নিক বা প্রসাধনীর দোকান, গুদাম বা কারখানা নেই’।

কিন্তু আমার এ রেফারেন্সে ওই পাঠক বেশ বিস্ময় প্রকাশ করে বললেন, ‘তাই নাকি?’ তবে যেসব গণমাধ্যমে বলা ও লেখা হচ্ছে, নিমতলীর ঘটনার পর কিছুদিন হৈচৈ হলেও সমস্যা এখনো যে তিমিরে ছিল সে তিমিরেই আছে। অনেক বিশেষজ্ঞ পরিচয়ধারী ব্যক্তিকেও বিভিন্ন টিভি টক শোতে বেশ চড়া গলায় এমন কথা বলতে দেখা যাচ্ছে। আসলে, এই যে কোনো বিষয় সম্পর্কে পরিপূর্ণ খোঁজখবর না নিয়ে কথা বলা, অথবা পরিস্থিতি ভেদে একটা ক্ষুদ্র সমস্যাকে বড় করে দেখানো এবং একটা বড় সাফল্যকেও গোনায় না ধরা, তা আমাদের এখানে একটা সমস্যাই বটে। এ কারণেই চুড়িহাট্টার ঘটনার পর একদিকে সবাই সরকারকে দুষতে লাগল, এ অবস্থা সামাল দিতে গিয়ে সরকারি বিভিন্ন সংস্থা একে অপরকে দায়ী করা শুরু করল, এমনকি সাবেক শিল্প মন্ত্রীও তার উত্তরসূরিকে গোটা পরিস্থিতির জন্য দায়ী করে বক্তব্য দিলেন। আর সরকার কী করল? তড়িঘড়ি করে পুরান ঢাকাকে কেমিক্যাল ব্যবসামুক্ত করার ঘোষণা দিয়ে একধরনের জনরোষ সামাল দিতে গিয়ে আরেক ধরনের জনরোষের মুখে পড়ল। মজার ব্যাপার হলো, পূর্বসূরির সমালোচনার জবাব দিতে গিয়ে সদ্য সাবেক শিল্পমন্ত্রী বলেছেন, কেমিক্যাল ব্যবসায়ের সঙ্গে তার মন্ত্রণালয়ের দূরতমও কোনো সম্পর্ক নেই। কারণ এ ব্যবসার লাইসেন্স শিল্প মন্ত্রণালয় দেয় না, তা তদারকি করার দায়িত্ব তার নয়। তার মতে, এই ব্যবসায়টা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। অথচ চুড়িহাট্টার ঘটনার জন্য শিল্প মন্ত্রণালয়কেই সবাই দুষছেন, বণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কথা কেউ ঘুণাক্ষরেও মুখে আনছেন না।

যেমনটা আগে বলা হয়েছে, কেমিক্যাল ছাড়া আধুনিক জীবন, বিশেষ করে নগরজীবন অচল। আবার কেমিক্যালেরও আছে নানা প্রকারভেদ। কিছু কেমিক্যাল আছে একবারেই নিরীহ, কিছু কেমিক্যাল দাহ্য পদার্থের মতো। আবার কিছু কেমিক্যাল আছে যা বিস্ফোরক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ফলে সব কেমিক্যাল ব্যবসায় এক মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রণ করে না। কিন্তু এটা যতটুকু সমস্যা, এর চেয়েও বড় সমস্যা হলো ওই ব্যবসায় নিয়ন্ত্রণের জন্য যেসব সরকারি প্রতিষ্ঠান আছে সেগুলোর আক্ষরিক অর্থেই জীর্ণশীর্ণ অবস্থা। যেমন, বিস্ফোরক পরিদপ্তর। এটি জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের অধীন একটা সংস্থা যার কাজ হলো বিস্ফোরক হিসেবে ব্যবহৃত হয় এমন পণ্যের ব্যবসায়ের অনুমোদন দেওয়া এবং তা তদারকি করা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, চুড়িহাট্টায় এর কোনো দায় ছিল কি না তা আগুন লাগার পরও কেউ জানত না। সংস্থাটির অস্তিত্ব বা এর কাজ কী, সে সম্পর্কেই বছর কয়েক আগেও, বিশেষ করে দেশে জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দেওয়ার আগ পর্যন্ত কারও কোনো ধারণা ছিল না।

জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সংস্থাটির ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি এখনো প্রায় লোকচক্ষুর আড়ালেই রয়ে গেছে। এর জনবলও খুব দুর্বল। সংস্থাটির অবস্থা বোঝার জন্য গত মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত এর প্রধান পরিদর্শকের বক্তব্যটি সহায়ক হতে পারে। তিনি বলেছেন, পুরান ঢাকায় কেমিক্যালের প্রচুর অবৈধ দোকান ও গুদাম রয়েছে; এমনকি যেসব দ্রব্য আমদানি ও বিক্রি নিষিদ্ধ, সেসব দ্রব্যও বেচাকেনা হচ্ছে। কিন্তু মানুষের জীবনের জন্য হুমকিস্বরূপ এসব রাসায়নিক তদারকির মতো লোকবল আমাদের নেই। এই যখন অবস্থা, তখন চুড়িহাট্টার ওয়াহেদ ম্যানশনে প্রচুর বিস্ফোরকদ্রব্যের মজুদ ছিল বলে যে অভিযোগ উঠেছে এবং এ রকমই কিছু বিস্ফোরকের বিস্ফোরণ থেকে ওই ভয়াবহ আগুনের সূত্রপাত ঘটেছে বলে যে ধারণা করা হচ্ছে, তার সুরাহা করবে কে? কিংবা এমন দুর্যোগের পুনরাবৃত্তিই বা ঠেকাবে কে?

উক্ত বিস্ফোরক পরিদপ্তরের প্রধান পরিদর্শক বলেছেন, এমনসব দ্রব্যের ‘তদারকি কিংবা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান ব্রিটিশ আমল থেকেই জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের’। এ থেকেও বোঝা যায়, দেশের বিস্ফোরক দ্রব্যের অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণে সরকারি ব্যবস্থার দুর্বলতা কতটুকু। কারণ এ ধরনের দায়িত্ব বণ্টন মানে কারোরই সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব নেই; আবার এসব দ্রব্যের বৈধ ব্যবসায়ীদেরকে হয়রানি করার বেলায় দেখা যাবে সবাই এক পায়ে খাড়া। বিস্ফোরক পরিদপ্তরের দীন-হীন অবস্থার কারণও এখানেই নিহিত।

বিস্ফোরক পরিদপ্তরের এ দুরবস্থা অবশ্যই জননিরাপত্তা বিষয়ে সরকারের উদাসীনতা নির্দেশ করে। কিন্তু এর সমাধান খুব সহজ নয়। আমি বলতে চাচ্ছি, সরকারকে কিছুদিন গালাগাল করলেই এ অবস্থার পরিবর্তন হবে না। এর জন্য প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট আইন পরিবর্তন করে একটি মাত্র সংস্থাকে কেমিক্যাল ব্যবসায় তদারকির দায়িত্ব দেওয়া এবং এর পাশাপাশি ওই সংস্থার জবাবদিহি নিশ্চিত করা। সরকার যাতে এ কাজটা দ্রুত সম্পাদন করে, তার জন্য প্রয়োজন জনগণের তরফ থেকে সরকারের ওপর ধারাবাহিকভাবে চাপ তৈরি করা, ¯্রফে গালাগালের মাধ্যমে যেটা করা সম্ভব নয়।

এ প্রসঙ্গে কলকারখানা পরিদর্শনের বিষয়টা তোলা যেতে পারে। সরকারি বিধিবিধান মেনে কলকারখানা পরিচালিত হচ্ছে কি না, তা দেখার দায়িত্বÑ শ্রম অসন্তোষ নিয়ন্ত্রণে এর গুরুত্ব অনেকÑ শ্রম মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের। কিন্তু বহু বছর ধরে এর প্রতি সরকারের কোনো সুনজর ছিল না। শেষে গত কয়েক বছরে রানাপ্লাজা ধস ও তাজরীন অগ্নিকা-ের মতো বিপুল প্রাণঘাতী ঘটনা ঘটার পর, সম্প্রতি এ সংস্থাটিকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। তা-ও, একথা হলফ করে বলা যায়, তৈরি পোশাকের মার্কিন ও ইউরোপীয় ক্রেতাদের দিক থেকে প্রবল চাপ না থাকলে সরকারের এ বোধোদয় ঘটত না।

যা হোক, প্রথমে নিমতলী এবং পরে চুড়িহাট্টার আগুন আমাদের মনে করিয়ে দিয়ে গেল ভবন নির্মাণ, শিল্প পরিচালনা বা কেমিক্যাল ব্যবসায় যা-ই হোক, এগুলো নিয়ন্ত্রণের জন্য সংশ্লিষ্ট যেসব সরকারি সংস্থা আছে সেগুলোর প্রতি আর অবহেলা নয়। অবিলম্বে এসব সংস্থাকে সব দিক থেকেই শক্তিশালী ও কার্যকর করে গড়ে তোলা হোক। আর এ কাজটিতে সরকার তখনই মনোযোগী হবে, যখন জনগণ এসব বিষয়ে সচেতন ও সোচ্চার হয়ে উঠবে।

   
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত