শপথ নেওয়ার প্রথম দিনই গতকাল বৃহস্পতিবার সংসদ অধিবেশনে যোগ দিয়েছেন সুলতান মো. মনসুর আহমেদ।
অধিবেশনে যোগ দিয়েই বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ নিয়ে অনির্ধারিত এক আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি বলেন, ‘এই সংসদে ৯৯ শতাংশ হচ্ছে একজোটে। আর আমি অন্য জোট থেকে রাজনীতি করছি। কিন্তু জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধুর প্রশ্নে কোনো আপস নেই। বাংলাদেশ জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু এক নামে পরিচিত। এখানে অনেকে অনেক কথা বলবেন। অনেক কথা বলেছেন। আগামী দিনের ইতিহাস নির্ণয় করবে, আমরা সবাই কীভাবে যাব।’
গণফোরামের এই নেতা এবারের সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট থেকে নির্বাচিত হন। গতকাল বেলা ১১টার দিকে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর কাছে শপথ নেন তিনি। শপথের পর সুলতান মনসুর সাংবাদিকদের জানান, দলের সভাপতি কামাল হোসেনকে জানিয়ে শপথ নিয়েছেন। বলেন, ‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রতিনিধি হিসেবে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতার নলেজেই আমি এটা করেছি।’ এর কয়েক ঘণ্টা পর গণফোরাম থেকে বহিষ্কৃত হন তিনি। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় স্পিকার শিরীন শারমিনের সভাপতিত্বে শুরু হয় সংসদ অধিবেশন। তখনই তাকে দেখা যায় অধিবেশন কক্ষে। স্পিকারের আসনের বাঁ পাশে বিরোধী দলের আসনের দ্বিতীয় সারিতে সুলতান মনসুরকে স্থান দেওয়া হয়েছে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের সাংসদ হিসেবে সরকারি দলের আসনে ছিলেন তিনি।
অনির্ধারিত ওই আলোচনায় সুলতান মনসুর আরও বলেন, ‘আমার আজকে ওইখানে (সরকারি দল) থাকার কথা ছিল। ওই জোটের (সরকারি দলের জোট) পক্ষেই তো আমি রাজনীতি করতাম। আজ থেকে ১৮ বছর আগে এই সংসদে আসার সুযোগ হয়েছিল। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, গত ১৮ বছর একটি রাজনৈতিক কারাগারের মধ্যে ছিলাম। যদিও এমপি ছিলাম না বা এই সংসদে ছিলাম না।’ যে লক্ষ্যকে সামনে রেখে বঙ্গবন্ধু দেশকে স্বাধীন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও সেই পথে যাচ্ছেন মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘সংসদের নেত্রী জাতীয় ঐক্যের কথা বলেছেন। কাজেই সেই জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি করতে হবে। মানুষের আশা-আকাক্সক্ষা ও বিশ্বাসকে শ্রদ্ধা করে বঙ্গবন্ধুর মতো জাতীয় মনোভাব নিয়ে এগিয়ে গিয়ে জনগণের আশা-আকাক্সক্ষাকে বাস্তবায়ন করতে হবে।’
সুলতান মনসুর বলেন, ‘আজকে যাকে নিয়ে আলোচনা ১৯৬৭-৬৮ সালে স্কুলছাত্র থাকা অবস্থায় যার নামে স্লোগান দিয়ে রাজনৈতিক জীবন শুরু করেছিলাম, সেই বিশ্বাস থেকে ব্যক্তিগতভাবে বিচ্যুত হইনি। যদিও জোটগতভাবে বা রাজনৈতিকভাবে বা আমার আজকের অবস্থানে হয়তো আমাদের নেতারা ওই জোটে নেই; কিন্তু ৫২ বছর আগে যে বিশ্বাস নিয়ে রাজনীতি শুরু করেছিলাম, সেই বিশ্বাসের জায়গা থেকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অবস্থানে থেকে নির্বাচন করে এই সংসদে এসেছি।’ তিনি বলেন, ‘মহাজোটের বিরোধী বিএনপিসহ অন্যরা আমাকে ভোট দিয়েছে, এটা ঠিকই। কিন্তু জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর অনুসারী সর্বস্তরের জনগণ আমাকে ভোট দিয়ে এই সংসদে পাঠিয়েছেন। মহাজোটের বিরোধী অন্য জোটের একজন ব্যক্তি হয়ে স্বাধীনভাবে জনগণ ও বাংলার মানুষের কথা যেন বলতে পারি, সাদাকে সাদা, কালোকে কালো যেন বলতে পারি এবং জনগণের কথা বলে সারা জীবন রাজনীতি যেন করতে পারি, সেই সহযোগিতা পাব বলে আশা করি। সংসদনেত্রীও সেই দিকে বিবেচনা রাখবেন বলে আশা করি।’
গণফোরাম থেকে বহিষ্কার : গতকাল বিকেলে গণফোরামের জ্যেষ্ঠ নেতাদের বৈঠকে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে একাদশ সংসদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ায় সুলতান মনসুরকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত হয়। এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানিয়ে দলটির সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসীন মন্টু বলেন, বহিষ্কারের চিঠি শিগগিরই স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী বরাবর পাঠানো হবে। সেই সঙ্গে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এর আগে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের মতিঝিলের আইনি চেম্বারে তার সঙ্গে বৈঠক করেন ফ্রন্টের মুখপাত্র ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সেখানে উপস্থিত ছিলেন গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসীন মন্টু ও প্রেসিডিয়াম সদস্য এম মোকাব্বির খান।
কামাল হোসেনের চেম্বার থেকে বেরিয়ে মতিঝিলের আরামবাগে গণফোরামের দলীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে আসেন মন্টু। দল থেকে বহিষ্কার করায় সুলতান মনসুরের সংসদ সদস্য পদ থাকবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘দল বহিষ্কার করায় সংবিধান অনুযায়ী তার সংসদ সদস্য থাকতে পারে না।’ মোকাব্বির খান শপথ নেবেন কি নাÑ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘না।’
এর আগে গত বুধবার ড. কামাল হোসেন তার মতিঝিলের আইনি চেম্বারে বৈঠক করেন গণফোরামের প্রেসিডিয়াম সদস্যদের নিয়ে। বৈঠকে অংশ নেওয়া প্রেসিডিয়াম সদস্য মোকাব্বির খান দলের সিদ্ধান্ত মেনে শপথের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন। মোকাব্বির খানেরও সুলতান মনসুরের সঙ্গে গতকাল শপথ নেওয়ার কথা ছিল।
সুলতান মনসুরকে দেওয়া বহিষ্কারের চিঠিতে বলা হয়েছে, আমাদের দল গণফোরাম এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট মনে করে, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও ভোটের অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে পদদলিত করে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়ে আপনি নৈতিকতাবিরোধী, জনবিরোধী এবং সংসদীয় রীতিবিরোধী কাজ করেছেন। এতে বলা হয়, অতএব আপনার বিরুদ্ধে দলের নীতিবিরোধী, আদর্শবিরোধী, জনবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগে আপনার গণফোরামের প্রাথমিক সদস্যপদ বাতিল করা হলো এবং গণফোরাম থেকে বহিষ্কার করা হলো। একই সঙ্গে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হলো।
