একটি গণতান্ত্রিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গল্প ও আমাদের প্রত্যাশা

আপডেট : ১০ মার্চ ২০১৯, ০১:৩৪ এএম

২০১৭ সালে শিক্ষাবৃত্তির মাধ্যমে ভারতের অন্যতম সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জওয়াহেরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ ঘটে আমার। যেহেতু বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় ধরে ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছিল না, এ কারণে দেশের অন্যতম সেরা বিদ্যাপীঠ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত অবস্থায়ও গণতান্ত্রিক আবহ দেখার সুযোগ থেকে ছিলাম বঞ্চিত। অনেকাংশেই আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিভিন্ন নীতি-নির্ধারণী সিদ্ধান্তগুলো আসে প্রশাসনিক পর্যায় থেকে যেখানে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ অনেকাংশেই শূন্য বলা যেতে পারে। এরকম একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডি পেরিয়ে যখন সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে পড়লাম, যেখানে প্রায় সকল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের সমান অংশগ্রহণ থাকে তাই স্বভাবতই আমার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু ছিল ছাত্র সংসদ নির্বাচনের পুরো প্রক্রিয়াটি।

এই বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণত তিনটি কমিটির জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় একটি কেন্দ্রীয় কমিটি যেখানে সভাপতি, সহ-সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক এবং সহ-সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়, দ্বিতীয় কমিটি স্কুল বা অনুষদভিত্তিক কমিটি যেখানে একটি অনুষদে শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বিচার করে এক একটি অনুষদে কয়েকজন করে কাউন্সিলর নির্বাচন করা হয় এবং তৃতীয়টি হলভিত্তিক কমিটি, যেখানে হল সভাপতিসহ বেশ কয়েকজনকে বিভিন্ন পদে নির্বাচিত করা হয়।

সাধারণত একটি কমিটির মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেলে সে কমিটি ভেঙে দিয়ে প্রথমেই স্কুল বা অনুষদভিত্তিক সাধারণ শিক্ষার্থীদের একটি জেনারেল বডি মিটিংয়ের আয়োজন করা হয় যেখানে সদ্যবিলুপ্ত কাউন্সিলররা তাদের বিগত এক বছরের কার্যক্রমের তালিকা পেশ করেন। এটা অবশ্যই জবাবদিহিমূলক হয়, যেখানে যে কোনো সাধারণ শিক্ষার্থী তাদের যে কোনো বিষয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন। প্রায় সারা রাত ধরে এই মিটিং চলতে থাকে যেখানে প্রশ্ন, পাল্টা প্রশ্ন, বিতর্ক, যুক্তি উপস্থাপন চলতে থাকে। এমনকি কোনো কাউন্সিলর যদি দায়িত্বে অবহেলা করে থাকেন সে বিষয়েও প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। এই মিটিংয়ের শেষে বিদায়ী কমিটির প্রতি হ্যাঁ বা না ভোট দিয়ে তাদের প্রতি আস্থা বা অনাস্থা প্রকাশ করা হয়। যদি কোনো কমিটির প্রতি অনাস্থা প্রকাশিত হয় তবে অবশ্যই পরবর্তী নির্বাচনে তার প্রভাব পড়বে। এ কারণেই একটি কমিটির সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করার প্রতি। এই জেনারেল বডি মিটিংয়ের শেষে পরবর্তী নির্বাচনের জন্য সম্পূর্ণ নির্দলীয় একটি নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়, এ ক্ষেত্রে প্রাধান্য দেওয়া হয় সেই সব শিক্ষার্থীদের যাদের কোনো দলের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততা নেই।

পরবর্তী ভোটের আগে নির্বাচন কমিশন আয়োজন করেন নির্বাচনী বিতর্কের যেখানে সব প্রার্থী তাদের নিজেদের নির্বাচনী ইশতেহার নিয়ে সামনে আসেন। জওয়াহেরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের এই নির্বাচনী বিতর্ক ‘প্রেসিডেন্সিয়াল ডিবেট’ নামে পরিচিত। যেটিতে শুধুমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই নন, বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে থেকে অনেক সচেতন মানুষই আগ্রহভরে নেতাদের বক্তব্য শুনতে ছুটে আসেন। কারণ তারা মনে করেন যে, এই ছাত্রনেতারাই পরবর্তীকালে জাতীয় নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবেন নিজেদের, তাই জাতীয় রাজনীতির ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। এই নির্বাচনী বিতর্কেই উঠে আসে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে জাতীয় রাজনীতির সমকালীন বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা সমস্যা, বিগত কমিটির সফলতা, দুর্বলতা কিংবা ব্যর্থতা, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সমস্যা, সরকারের সমালোচনা সবকিছুই। (যে কেউ ইউটিউবে সার্চ করে বিতর্কগুলো দেখতে পারেন)। এই বিতর্ক শোনার পর যে কোনো নবীন শিক্ষার্থীও অনেকটা বুঝতে পারেন কাকে ভোট দিলে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীবান্ধব একটি পরিস্থিতি বহাল থাকবে। এই বিতর্কের কয়েকদিন পরই মূল নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় যেখানে প্রতিটি শিক্ষার্থী তাদের নিজ নিজ অ্যাকাডেমিক ভবনে ভোট প্রদান করতে যান। আর এই পুরো প্রক্রিয়াটি প্রার্থিতা চূড়ান্তকরণ থেকে ভোট গণনা এবং বিজয়ী ঘোষণা, সম্পন্ন হয় শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে গঠিত নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে।

এই গণতান্ত্রিক পরিবেশের সুফল কিন্তু শিক্ষার্থীরাই পাচ্ছেন। এখানে লাইব্রেরি ঠিক কটা পর্যন্ত খোলা থাকবে (বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি খোলা থাকে সকাল ৯টা থেকে রাত ৩টা পর্যন্ত), হলের ডাইনিংয়ে কী খাবার থাকবে, কোনো শিক্ষার্থীর বিশেষ যত্ন লাগবে কি না (অতিরিক্ত ক্লাস), পরীক্ষার সময় লাইব্রেরি ছাড়াও অতিরিক্ত পড়ার কক্ষ দিতে হবে কি না, গবেষণার জন্য কী পরিমাণ বাজেট লাগবে এই সব কিছু শিক্ষার্থীরা নির্ধারণ করেন। এমনকি ভাইভা পরীক্ষাতেও শিক্ষকদের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকেন যাতে করে কোনো শিক্ষার্থীই পক্ষপাতমূলক আচরণের শিকার না হন। এখানে নেই কোনো গেস্ট কালচার বা সিনিয়র-জুনিয়র কালচার, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে সবার সমান মর্যাদা এবং অধিকার। নেই কোনো একক আধিপত্য এখানে সবাই রাজা। নেই কোনো যৌন হয়রানি রাত ৩টার সময়ও একজন নারী শিক্ষার্থী নির্ভয়ে লাইব্রেরি থেকে একাই হলে ফিরতে পারেন। এরকম একটি পরিবেশ আমাদের দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার্থীদের কাছে এখন অনেকটাই স্বপ্ন!

দীর্ঘ ২৮ বছর পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এটি একটি আশার কথা। এর মধ্য দিয়ে হয়তো অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন একটি গণতান্ত্রিক বিশ্ববিদ্যালয়ের। তবে প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যায়, দীর্ঘ ব্যবধানের পর ছাত্র সংগঠনগুলো কি প্রস্তুত নির্বাচনের জন্য? বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে, আমরা কি নিশ্চিত করতে পারছি দলমত নির্বিশেষে সব শিক্ষার্থীর সহাবস্থান? কিংবা প্রশাসনের পক্ষপাতিত্বহীন আচরণ? সব দলের প্রার্থীরা কি সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বপ্ন দেখতে পারছেন? এই সব প্রশ্নের উত্তর পেতে আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে আসন্ন ডাকসু নির্বাচনের পুরো প্রক্রিয়াটির ওপর।

লেখক : স্নাতকোত্তর পর্বের শিক্ষার্থী, জওয়াহেরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়, নয়াদিল্লি

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত