অভাবের সংসারে নিজে পড়ালেখা করতে পারেননি দিনাজপুর সদর উপজেলার কাশিমপুর (মালিপুকুর) গ্রামের ট্রাকচালক ফারুক আহমেদ (৩১)। মাত্র অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করেই হাল ধরতে হয় সংসারের। তবে নিজে পড়ালেখা করতে না পারলেও অন্যদের পড়ালেখা থেকে বিচ্ছিন্ন হতে দেন না এই যুবক।
বিভিন্ন বিদ্যালয় ও পাড়া-মহল্লায় গিয়ে হতদরিদ্র ও ঝরে পড়া শিশু শিক্ষার্থীদের খুঁজে বের করেন ফারুক। তাদের লেখাপড়া যাতে বন্ধ না হয়ে যায় সে জন্য নিজের বেতনের ২৫ শতাংশ দিয়ে শিক্ষা উপকরণ কিনে ওই শিশুদের মাঝে বিতরণ করেন। পাশাপাশি তিনি ও তার স্ত্রী সাবেরা আক্তার মিলে নিজ বাড়ির আঙিনায় গড়ে তুলেছেন বয়স্ক শিক্ষাকেন্দ্র। সেখানে বিনা পারিশ্রমিকে বয়স্কদের শিক্ষাদানের কাজ করেন স্বামী-স্ত্রী দুজন মিলে। শিক্ষানুরাগী ফারুক তার এমন সব কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে পেয়েছেন ‘প্রাথমিক শিক্ষা পদক’। শিক্ষা ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল বুধবার রাজধানীর বঙ্গবন্ধু
আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে তার হাতে এ পদক তুলে দেন। ২০১৯ সালের জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা সপ্তাহে ‘সারা দেশে শ্রেষ্ঠ বিদ্যোৎসাহী সমাজকর্মী’ হিসেবে তিনি এ সম্মান অর্জন করেছেন।
দিনাজপুর সদর উপজেলার কাশিমপুর (মালিপুকুর) গ্রামে ১৯৮৮ সালের ১২ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন ফারুক। চেরাডাঙ্গী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০০২ সালে অষ্টম শ্রেণি পাস করেন তিনি। এরপর শহরের পুলহাট বিএডিসির বীজ প্রক্রিয়াজাত কেন্দ্রে বস্তা টানার শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেন। ২০০৭ সালে মাস্টাররোলে বিএডিসির ট্রাকের সহকারী হিসেবে নিয়োগ পান। পরে ২০১৭ সালে বিএডিসির রংপুর যুগ্ম পরিচালকের দপ্তরের ট্রাক সহকারী হিসেবে স্থায়ী নিয়োগ পান।
প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে পদক পাওয়ার অনুভূতি সম্পর্কে জানতে চাইলে দেশ রূপান্তরকে ফারুক বলেন, ‘পদক পাওয়ার বিষয়টি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর আমাকে চিঠি দিয়ে জানায়। আমি যে সম্মান পেয়েছি, তা হয়তো পড়ালেখা শেষ করলেও পেতাম না। আমি যা করেছি তা এই সমাজের জন্য, দেশের জন্য এবং আমাদের চারপাশের মানুষের জন্য করেছি। কোনো কিছু পাওয়ার আশায় করিনি।’
নিজে পড়ালেখা করতে না পারার কষ্টকর অনুভূতির কথা তুলে ধরে ফারুক আরও বলেন, ‘এই আফসোসের বিষয়টা আমার কাছে কতটা কষ্টের, সেটা তো কাউকে বোঝাতে পারব না। তাই আমি চাই, টাকার অভাবে কোনো গরিব মেধাবী ছাত্রছাত্রী যেন পড়ালেখা থেকে পিছিয়ে না পড়ে। সে জন্য যতটুকু পারি চেষ্টা করি। কিন্তু কখনো কল্পনা করতে পারিনি এমন সম্মান আমি পাব। এ সম্মান আমাকে আরও উৎসাহিত করবে।’
