র্যাবের হাতে আগ্নেয়াস্ত্রসহ গ্রেপ্তারের পর ১০ বছরের সাজা হয়। দণ্ডভোগ শেষ না হতেই উচ্চ আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পায়। বেরিয়েই চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ নিতে প্রধান প্রতিপক্ষকে গুলি করে হত্যার মামলার অভিযোগপত্রে প্রধান আসামি হিসেবে অভিযুক্ত হয়। এর পর থেকে তাকে আর খুঁজে পাচ্ছিল না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। অথচ এই সময়ে অর্থাৎ প্রায় ১০ বছর ধরে নিজ বাড়িতেই অবস্থান করছিল,
গোপনে চালিয়েছে চাঁদাবাজিও। অবশেষে গত ১২ মার্চ রাজধানীর কদমতলী এলাকা থেকে কামাল হোসেন ওরফে টিকটিকি কামাল (৩৬) নামে পরিচিত ওই যুবককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
গ্রেপ্তারের পর কবির হত্যা মামলার আসামি হিসেবে আদালতে হাজির করে তিন দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন পিবিআইয়ের তদন্তকারী কর্মকর্তা। রিমান্ড শেষে গতকাল রবিবার তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
এ বিষয়ে পিবিআইয়ের বিশেষ পুলিশ সুপার আবুল কালাম আজাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘২০০৪ সালের ২৭ ডিসেম্বর রাজধানীর সায়েদাবাদ এলাকা থেকে বিদেশি পিস্তল ও রিভলবারসহ টিকটিকি কামাল র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হয়। তার বিরুদ্ধে ডেমরা থানায় অস্ত্র আইনে মামলা হয়। মামলার বিচারকাজ শেষে ২০০৫ সালে আদালত তাকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেয়। ৪ বছর ৫ মাস জেল খাটার পর ২০০৯ সালের মে মাসে উচ্চ আদালত থেকে জামিনে মুক্ত হয় কামাল। এর এক মাসের মথায় ১৭ জুন রাতে প্রতিপক্ষ কবির হোসেনকে গুলি করে হত্যা করে পালিয়ে যায়।’
অস্ত্র আইনের মামলায় সাজা খাটার মাঝপথে কামাল কীভাবে জামিন পেলÑ এই প্রশ্নের উত্তরে পিবিআইয়ের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘এটা আদালতের বিষয়। তবে কোন বিবেচনায় আদালত তাকে জামিন দিয়েছে কিংবা সে আদালতে কোনো মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন করেছিল কি নাÑ বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।’
আসামি কামালের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘লিজার্ড কয়েল কারখানার মালিকের ছেলে কামাল। দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী হলেও কদমতলী এলাকায় সাধারণের ছদ্মবেশে বিচরণ করায় আন্ডারওয়ার্ল্ডে তাকে টিকটিকি কামাল নামে চেনে সংশ্লিষ্টরা। কদমতলীর স্থানীয়রা কেউ জানত না, এই কামালই অস্ত্র মামলার সাজাপ্রাপ্ত কয়েদি ও কবির হত্যা মামলার চার্জশিটভুক্ত প্রধান আসামি।’
তদন্তকারী অপর এক কর্মকর্তা জানান, র্যাবের অস্ত্র মামলায় কারাভোগের সময় এলাকার চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ চলে যায় কবিরের হাতে। এতে কামাল ক্ষিপ্ত হয়ে কারাগারে বসেই তাকে হত্যার পরিকল্পনা করে। এরপর আদালতের মাধ্যমে জামিনে বেরিয়ে কবিরকে হত্যার সুযোগ খুঁজতে থাকে। একপর্যায়ে কবিরকে কদমতলীর শ্যামবাবুর ট্রাকের গ্যারেজে কৌশলে ডেকে নিয়ে গুলি করে হত্যা করে কামাল। এই হত্যাকাণ্ডের সময় তার সহযোগী হিসেবে আরও তিনজন ছিল। এরা হলোÑ রাসেল ওরফে রাজাকার রাসেল, লিটন ও জসিম উদ্দিন ওরফে দোহান। কবিরকে হত্যার রাতে ঘটনাস্থল থেকে একটি কালো রঙের মোটরসাইকেল উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় নিহতের বড় ভাই মো. নজরুল ইসলাম বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে কদমতলী থানায় হত্যা মামলা করেন।
পিবিআই কর্মকর্তা আজাদ বলেন, কবির হত্যা মামলার প্রথম তদন্ত করে কদমতলী থানা পুলিশ। তারা তদন্তে কোনো কূলকিনারা খুঁজে না পাওয়ায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের কাছে তদন্তভার ন্যস্ত হয়। গোয়েন্দা পুলিশ দোহান নামে এক আসামিকে গ্রেপ্তারের পর হত্যার রহস্য উদ্ঘাটিত হয়। দোহান আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে টিকটিকি কামালসহ আরও দুজনের নাম প্রকাশ করে। গোয়েন্দা পুলিশ কামালকে এই মামলার প্রধান আসামি হিসেবে অভিযুক্ত ও পলাতক দেখিয়ে আদালতে চার্জশিট দাখিল করে। পরবর্তী সময়ে আদালতের নির্দেশে অধিকতর তদন্তের জন্য মামলাটি পিবিআইয়ের হাতে আসে। পিবিআই ঢাকা মেট্রোর (উত্তর) পুলিশ পরিদর্শক মো. কামাল হোসেন মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পান।
আজাদ আরও বলেন, চার্জশিট দাখিলের পর সংশ্লিষ্ট মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পলাতক আসামিদের বিষয়ে খোঁজখবর না নেওয়ায় টিকটিকি কামাল স্বাভাবিকভাবেই নিজ বাড়িতে অবস্থান করছিল। এমনকি গোপনে এলাকার চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণও করছিল। তিনি বলেন, কামালের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী পলাতক অপর দুই আসামি রাসেল ও লিটনকে গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হচ্ছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট পিবিআইয়ের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, আসামি কামালের বাড়ি শরীয়তপুর জেলার সখীপুর থানার গৌরঙ্গ গ্রামে। কদমতলী এলাকায় তার পাঁচতলা ভবন রয়েছে।
