ভালো বাবা হতে হলে

আপডেট : ২১ মার্চ ২০১৯, ০৪:০৪ এএম

মায়ের সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনার শেষ নেই। কিন্তু বাবা কি শুধুই ছেলেমেয়েদের কাছে দূরের মানুষ হয়ে থেকে যাবেন? ভালো বাবা হয়ে ওঠার নানা উপায় রয়েছে। মেনে চললেই সন্তানের কাছে বাবাকে বন্ধু হয়ে উঠতে আর সময় লাগবে না। সে বিষয়ে রবিউল কমলকে জানালেন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট সায়কা হক

 

 সন্তান আর আপনার মধ্যে দূরত্ব কমান। অনেক পরিবারেই বাবা বেশ দূরের মানুষ, যিনি প্রয়োজনে সন্তানের খরচ দেন। ভালো বাবা হয়ে ওঠার প্রথম ধাপই হলো ছেলেমেয়ের বন্ধু হয়ে ওঠা। তাতে যতই ব্যস্ত থাকুন না কেন, সন্তানকে নিয়মিত সময় দিন। পড়াশোনায় সাহায্য করা, বেড়াতে নিয়ে যাওয়া, ছুটির দিনে একসঙ্গে খেলা বা বাড়ির কাজ একসঙ্গে করতে করতেই আপনি নিজের অজান্তেই ওদের বেস্ট ফ্রেন্ড হয়ে উঠবেন। বাড়ি ফিরতে রাত হলেও ফোন করে ওদের খোঁজখবর নিন, ফেরার সময় ছোট্ট গিফট নিতে পারেন, শোয়ার আগে আদর করুন। এতে ওরা খুশি হবে আর আপনিও পিতৃত্ব উপভোগ করবেন।

 বাবা ও মায়ের সম্পর্কও সন্তানের শৈশবকে প্রভাবিত করতে পারে নানাভাবে। বাবা-মায়ের মধ্যে ক্রমেই অশান্তি, ঝগড়া, দোষারোপ, শিশুর মনে সৃষ্টি করতে পারে জটিল নিরাপত্তাহীনতা। যেহেতু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বাচ্চারা মায়ের কাছাকাছি থাকে, তাই মা-বাবার ঝগড়ার সময় বাবা খুব সহজেই তাদের চোখে ভিলেন বনে যান। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মতের মিল হতেই পারে, কিন্তু তার কুৎসিত রূপটি কখনোই সন্তানের সামনে আনা উচিত নয়। এ ছাড়া অনেক বাবাই ছেলেমেয়েদের সামনে মায়ের নানা দোষগুণ নিয়ে মজা করেন। এই নির্দোষ ঠাট্টার প্রভাবে অনেক সময় ছেলেমেয়েরা মাকে অসম্মান করতে শেখে। তাই তাদের সামনে এসব নিয়ে আলোচনা না করে কৌশলে এড়িয়ে যেতে হবে।

 সংসারের কাজকর্ম, ছেলেমেয়েদের দায়িত্বÑ সব স্ত্রীর ঘাড়ে চাপিয়ে নিশ্চিন্ত থাকেন অনেক পুরুষ। কিন্তু এই ব্যবহারের মাধ্যমে ছেলেমেয়েদের কাছে আপনার সম্পর্কে একটি ভুল মেসেজ পৌঁছায়। হয় আপনার দায়িত্বহীনতা নিয়ে ওদের মনে একটা পাকাপাকি বিরক্ত বাসা বাঁধবে অথবা নিজেরাও অন্যের ঘাড়ে দায়িত্ব দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে শিখে ফেলবে। এ দুটির মধ্যে কোনোটাই কাম্য নয়। সে জন্য প্রথম থেকেই বাড়ির ও বাইরের কাজ সমানভাবে ভাগ করে নিন স্ত্রীর সঙ্গে। ছেলেমেয়েরা বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওদের ওপরও দায়িত্ব দিন যাতে পুরো পরিবার একটি অভিন্ন ইউনিট হিসেবে সংসারের সব কাজ করতে পারে। কোনো একজনের ওপর যেন অযথা চাপ না পড়ে। ছেলেমেয়েদের স্কুল, টিউশন, হবি, খেলাধুলা সম্পর্কে খোঁজখবর রাখুন। অভিভাবক-শিক্ষক সমাবেশ, স্কুলের বার্ষিক প্রোগ্রামে উপস্থিত থাকা, শখের জিনিস কিনে দেওয়া, সন্তানের বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখা একজন ভালো বাবার দায়িত্বের মধ্যে অবশ্যই পড়ে।

 সাধারণত বাবা ও মা সন্তানের জীবনে আলাদা ভূমিকা পালন করেন। কিন্তু বাবা হয়েও মাঝেমধ্যে মায়ের তথাকথিত দায়িত্বগুলো পালন করলে সন্তানের সঙ্গে আপনার বন্ধন আরও মজবুত হয়ে উঠবে। বাচ্চার ডায়াপার বদলানো, গোসল করানো, জামা-কাপড় বদলানো, ঘুম পাড়ানোর মতো কাজকে মেয়েলি বলে তুচ্ছ করবেন না। বরং স্ত্রীকে মাঝেমধ্যে সাহায্য করার জন্য নিজেও এই কাজগুলো করুন। বাচ্চা বড় হলে তাকে টয়লেট ট্রেনিং দেওয়া, স্কুলের জন্য তৈরি করানো, হোমওয়ার্ক করানোর মতো কাজে সাহায্য করুন। তাহলেই আপনি আপনার সন্তানের কাছে ভালো বাবা হয়ে উঠবেন।

আপনি যে কাজগুলো ভালো পারেন, সেগুলো ধীরে ধীরে আপনার সন্তানকে শিখিয়ে দিন। ধরুন টাকাপয়সার হিসাবের ব্যাপারটা আপনার স্ত্রীর থেকে অনেক ভালো বোঝেন, সে ক্ষেত্রে হিসাবের খুঁটিনাটি, বিনিয়োগের গোড়ার কথা, ব্যাংকের কাজকর্ম ছেলেমেয়েকে বোঝাতে পারেন। গাড়ি সারানো বা ফুটবল খেলার মতো যেকোনো কাজই আপনার সন্তানের সঙ্গে আপনার বন্ধনকে অনেক বেশি মজবুত করে দিতে পারে।

 ছেলেমেয়েদের বিভিন্ন শখ এবং সৃজনশীল কাজে উৎসাহ দিন। নিজের ছেলেবেলায় ফিরে যাওয়ার এটি সর্বশ্রেষ্ঠ উপায়। মেয়ের নাচের অনুষ্ঠানের তোড়জোড় বা ছেলের জিওগ্রাফি প্রজেক্টে সাহায্য করলে হয়তো আপনার কিছুটা সময় ব্যয় হবে কিন্তু সন্তানের কাছে আপনি সহজেই ‘বেস্ট ফাদার’র

খেতাব পাবেন। ওরা বুঝতে পারবে যে ওদের সঙ্গে আপনি সব সময় রয়েছেন এবং যেকোনো সমস্যায় ওরা আপনার সাহায্য পাবেই। ওদের জীবনে আপনার গুরুত্ব বুঝেই ওরা আপনাকে ভালোবাসতে ও সম্মান করতে শিখবে।

 ধূমপান ছেড়ে দিন। সিগারেট আপনার স্বাস্থ্যের পক্ষে যেমন ক্ষতিকর, তার চেয়ে বেশি ক্ষতিকর আপনার সন্তানের জন্য। আপনার সিগারেটের ধোঁয়া ওর হার্টের ক্ষতি করার সঙ্গে সঙ্গে ওকে ধূমপানেও পরোক্ষভাবে উৎসাহিত করবে। সবচেয়ে ভালো হয় সন্তান জন্মের পরপরই সিগারেট ছেড়ে দিলে। যদি না পারেন তাহলে বাড়ির ভেতরে স্মোক না করার চেষ্টা করুন। আপনার সন্তানের হাতের নাগালে সিগারেট রাখবেন না। সিগারেট খাওয়ার কুফল সম্পর্কে ওকে অবহিত করাটাও আপনার কর্তব্যের আওতায় পড়ে।

 কথা দিয়ে কথা রাখুন। আপনার শত ব্যস্ততা থাকতে পারে কিন্তু সন্তানের ছোট ছোট চাওয়াকে গুরুত্ব দেওয়া থেকে বাদ দেবেন না। ওর ক্লাস টেস্টেও আগে পড়া তৈরিতে সাহায্য করা বা বন্ধুদের সঙ্গে ক্রিকেট ম্যাচের আগে স্পেশাল টিপস দেওয়া, কোনো ব্যাপারটাকে ছোট করে দেখবেন না। আপনার কাছে খুব তুচ্ছ হলেও, অসন্তানের কাছে সেটিই হয়তো খুব গুরুত্বপূর্ণ। তাই ওর আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর জন্য আপনার যতটুকু করা উচিত, ততটুকু অবশ্যই করুন।

 সন্তানকে নিজের মতো বড় হতে দিন। নিজের অপূর্ণ ইচ্ছে সন্তানের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার ভুল অনেক বাবাই করেন। আপনি ডাক্তার হতে পারেননি বলে ছেলেকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় বসানো বা অফিস কলিগের দেখাদেখি মেয়েকে কারাতে ক্লাসে ভর্তি করালে বাচ্চার শৈশব ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য আপনিও কিছুটা দায়ী থাকবেন। পড়াশোনা, শখ বা খেলাধুলা, যা হোক না কেন, ওর দক্ষতা ও মেধা অনুযায়ী ওকে এগোতে দিন। ও যদি পড়াশোনায় বা খেলাধুলায় অনেক ভালো না হয়ে মোটামুটি ভালো হয়, তাহলে হতাশ না হয়ে ওকে একজন ভালো মানুষ হয়ে গড়ে উঠতে সাহায্য করুন।

 বাচ্চাকে শাসন করার দায়িত্ব বেশির ভাগ সময়ই বাবার ওপর এসে পড়ে। বকাঝকা, হুকুম জারি বা মারধর করে নয়, বাচ্চাকে নিয়ন্ত্রণ করুন নমনীয়ভাবে। কী করা উচিত আর কী করা উচিত নয়, এটা ওর কাছে স্পষ্ট করে তোলার দায়িত্ব আপনার। ওকে বকাঝকা করা বা শাস্তি দেওয়ার আগে পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দিন আপনার ব্যবহারের পেছনের কারণটা।

শাস্তি হিসেবে কিছুদিনের কথা বন্ধ করে দিতে বা ওর পছন্দের কোনো কাজ যেমন : কার্টুন দেখা বা বন্ধুর পার্টিতে যাওয়া বন্ধ রাখতে পারেন। তবে শাস্তির নিয়ম সবার ক্ষেত্রেই এক রাখুন। কোনো একজনের প্রতি পক্ষপাতিত্ব দেখাবেন না। নিজে ভুল করলেও সেই ভুলটাও সন্তানের সামনে স্বীকার করুন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত