‘সত্য সু-পথ না চিনিলে পাবিনে মানুষের দরশন’

আপডেট : ২৩ মার্চ ২০১৯, ১২:৪৭ এএম

‘সত্য সু-পথ না চিনিলে, পাবিনে মানুষের দরশন’। আধ্যাত্মিক সাধক ও বাউল সম্রাট লালন শাহের গানের এই বাণীতে জাত-পাতের বিচার নয়, মানুষই সবার ঊর্ধ্বে। মানুষের পরিচয় কেবলই মানুষ। বিচার যদি করতেই হয় তাহলে মানুষ হিসেবে সে সত্য না মিথ্যা, শুদ্ধ না অশুদ্ধ, উত্তম না অধম তার ভিত্তিতেই হতে পারে। আগে আত্মশুদ্ধির মধ্য দিয়ে সত্য পথে আসা জরুরি। নচেৎ সকল সাধন-ভজন যাবে বিফলে। দোলপূর্ণিমার নির্মল আলোকচ্ছটায় সেই আত্মশুদ্ধির আকাক্সক্ষা নিয়েই কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ায় লালন সাঁইজির তীর্থধামে আয়োজিত স্মরণোৎসবে এসেছিলেন রাজশাহীর ফকির রহিম শাহ। উৎসবের বিদায় বেলায় গতকাল

শুক্রবার দেশ রূপান্তরের কাছে এভাবেই তিনি তার অভিব্যক্তি প্রকাশ করেন।

মহাত্মা গুরুবাদী আধ্যাত্মিক সাধক ফকির লালন শাহ তার একান্ত চিন্তা-চেতনায়, ভাবে-ভাবনায় ও বিশ্বাসে অর্থাৎ গুরুবাদী দর্শনে মূলত মানুষকেই অধিক প্রাধান্য দিয়েছেন। তার গানে দ্বিধাহীনভাবে আনন্দচিত্তে চরম ভালোবাসা আর বিশ্বাসের জায়গা থেকে মানুষেরই জয়গান গেয়েছেন; মানুষকেই তার পদে পরতে পরতে যারপরনাই পরমাত্মার অংশ হিসেবে মানবিক আধ্যাত্মিক এবং দার্শনিকভাবে তুলে ধরেছেন। মানুষকে তিনি ভক্তি ও পরম গুরুজ্ঞান করেছেন। মানব জনমকে তিনি শ্রেষ্ঠ জনম শ্রেষ্ঠ উপহার বলেছেন। ফকির লালন মানুষের ভেতরে লুকিয়ে থাকা অধরা সেই পরমাত্মারূপে বিরাজমান মনের মানুষকেই সতত সন্ধান করেছেন এবং সাধন-ভজনের জন্য গুরুতত্ত্বে একমাত্র মানুষের মুক্তির কথা বলেছেন। কেননা ভবে মানুষ হয়ে মানুষের কাছেই প্রেম নিবেদন, ভালোবাসা চাওয়া ও মানুষকে ভজাটাই আসল সাধন-ভজন। আর এর মধ্য দিয়েই পরমাত্মা অর্থাৎ লালনের সেই মনের মানুষকে পাওয়া যাবে।

গত বুধবার থেকে শুরু হওয়া তিন দিনব্যাপী স্মরণোৎসবে নড়াইল থেকে এসেছিলেন অঞ্জনা ফকিরানী। তীর্থধাম ছেড়ে যাওয়ার প্রাক্কালে গতকাল সকালে তিনি বলেন, ‘রাখিলেন সাঁই কূপজল করে আন্ধেলা পুকুরে; অতৃপ্ত আত্মক্ষুধা নিবারণে সাঁইজি এই বাণীতে বলেছেন, অন্ধকারে পড়ে থেকে আত্মার কোনো সার্থকতা নেই। ঈশ্বর এই জগৎ-সংসারের গোলকধাঁধায় মানুষকে পাঠিয়েছেন মানবাত্মার আলো ছড়িয়ে জগৎকে আলোকিত করতে। বারবার চেষ্টা-সাধনা করেও এখনো বেরোতে পারিনি অন্ধকার কূপজলের অশুদ্ধতামুক্ত হয়ে। সেই অশুদ্ধতা ঘুচিয়ে আত্মশুদ্ধির মধ্য দিয়ে বলতে চাইÑ কোথায় হে দয়াল কাণ্ডারি। এই অসীম সাগর পাড়ি দিয়ে পার কর আমায়।’

ঝিনাইদহ থেকে প্রতি বছর এই উৎসবে আখড়াবাড়িতে আসেন আমিরুল ফকির। তিনি বলেন, ‘ওরে মানুষ হোসনে বেহুঁশ, পাবিনে তার দরশন। দুই নৌকায় পা রেখে কখনো আত্মক্ষুধা মিটবে না। সত্য পথের সন্ধান করতে চাইলে ভেজালবিহীন একাগ্রতা ও উপলব্ধির প্রসার ঘটাতে হবে। জ্ঞানহারা হয়ে অন্ধকারে হাতিয়ে মুর্শিদের সান্নিধ্য পাওয়া সম্ভব নয়।’

লালন একাডেমির সাধারণ সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত) সেলিম হক জানান, তিন দিনব্যাপী দোল স্মরণোৎসব আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত হয়েছে গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায়। আধ্যাত্মিক সাধক ফকির লালন শাহ স্মরণে প্রতি বছরের মতো এবারও সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা ও লালন একাডেমির আয়োজনে হয় এই উৎসব। লালন অনুসারী সাধু, ভক্ত ও আশেকানরা এই উৎসবের জন্য সারা বছর অপেক্ষায় থাকেন।

লালন একাডেমির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক আসলাম হোসেনের সভাপতিত্বে শুক্রবারও লালন মুক্ত মঞ্চে লালন দর্শনের ওপর আলোকপাত করে আলোচনা এবং লালন সংগীত পরিবেশিত হয়। এদিন প্রধান অতিথি ছিলেন খুলনার বিভাগীয় কমিশনার লোকমান হোসেন মিয়া। প্রধান আলোচক ছিলেন কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক সেলিম তোহা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত