বিলুপ্তির পথে চাঁদপুরের লবণ শিল্প

আপডেট : ৩০ মার্চ ২০১৯, ০৩:৩০ পিএম

আর্থিক ক্ষতি আর প্রয়োজনীয় পুঁজির অভাবে বিলুপ্তির পথে চাঁদপুরের লবণ শিল্প। এক সময় সচল থাকা ৪০টি লবণ মিলের মধ্যে ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে প্রায় ৩৫টি। বর্তমানে ৪টি মিল সচল থাকলেও কেবল মাত্র দুটি মিলে লবণ উৎপাদন করা হয়। বাকি দুটি মিল চলছে নামমাত্র। মালিকরা লবণ শিল্প বিলুপ্তির কারণ হিসেবে উৎপাদন ব্যয় এবং বিভিন্ন সীমাবদ্ধতাকে দায়ী করছেন।

যোগাযোগের সুবিধা ও কাঁচামালের সহজলভ্যতার কারণে চাঁদপুরের পুরানবাজার এলাকার ডাকাতিয়া নদীর তীরে পাকিস্তান আমলে গড়ে উঠেছিল এই লবণ শিল্প। তখন দেশীয় পদ্ধতিতে তৈরিকৃত লবণের চাহিদা ছিল জেলাজুড়ে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ শিল্প ডিজিটালাইজড হলেও চাঁদপুরের লবণ শিল্প চলতে থাকে এনালগ পদ্ধতিতেই। এতে করে একটা সময় চাঁদপুরের লবণ শিল্পে ভাটা পড়তে থাকে।

উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি আর উপযুক্ত দাম না পাওয়ায় দিনের পর দিন আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে অনেকটা বাধ্য হয়েই লবণ মিলগুলো বন্ধ করে দেন মালিকরা। এর মধ্যে ২০/২৫টি লবণ মিলের বর্তমানে কোনো চিহ্নও নেই। কোনো কোনো লবণ মিলের জায়গায় তৈরি করা হয়েছে বড় ইমারত। আবার কোনটিতে লবণের পরিবর্তে গড়ে উঠেছে রাইস মিল।

ইতোমধ্যে পদ্মা সল্ট ইন্ডাস্ট্রিজ, আয়োডাইজ সল্ট মিলস, মুনলাইট সল্ট ইন্ডাস্ট্রি, ইসলামিয়া সল্ট মিলস, জালালাবাদ সল্ট মিলস, সীমা সল্ট ইন্ডাস্ট্রি, রিয়াদ সল্ট ফ্যাক্টরি, নবারুন সল্ট ইন্ডাস্ট্রিসহ বন্ধ হয়ে গেছে আরো অনেক লবণ ইন্ডাস্ট্রিজ। এতো প্রতিকূলতার মাঝেও এখনও পর্যন্ত বিসমিল্লাহ প্লাস সল্ট ফ্যাক্টরি ও জনতা সল্ট মিলস নামের দু’টি লবণ মিল টিকে রয়েছে চাঁদপুরে।

লবণ শিল্পের সাথে জড়িত ব্যবসায়ীরা জানান, চাষিদের কাছ থেকে কাঁচামাল কিনে চট্টগ্রাম থেকে ট্রলারযোগে চাঁদপুর আনতে অনেক খরচ পড়ে। অপরদিকে আয়োডিনের মূল্য বৃদ্ধি ও পুঁজির অভাবে মিলগুলো আধুনিকায়ন করতে না পারায় যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ব্যবসায় কার্যক্রম চালানো তাদের জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে।

এতে করে লাভের চেয়ে লোকসানই গুনতে হয় তাদের। এছাড়াও ‘এসআইপি’ (সল্ট আইয়োডাইজেশন প্লান্ট) না থাকায় বাতিল করা হয় অনেক লবণ মিলের রেজিস্ট্রেশন।

ফলে প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নেওয়া ঋণ পরিশোধ করতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের।

জনতা সল্ট মিলে কর্মরত কয়েকজন শ্রমিক বলেন, “চাঁদপুরের লবণ শিল্প ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় আমাদের এখন সংসার চালাতে অনেক কষ্ট হচ্ছে। ইতোমধ্যে অনেক শ্রমিক কর্মহারা হয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছে। আমরাও আতঙ্কে রয়েছি কখন জানি আমাদের লবণ মিলও বন্ধ হয়ে যায়। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য আমরা সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করছি। সরকার যেন এই লবণ শিল্প বাঁচিয়ে রাখতে পদক্ষেপ নেয়।

চাঁদপুর বিসমিল্লাহ প্লাস সল্ট ফ্যাক্টরির মালিক মো. বিল্লাল হোসেন বলেন, চাঁদপুরের লবণ শিল্প মৃতপ্রায়। নানা সীমাবদ্ধতার কারণে এই শিল্পের জৌলুস অনেক আগেই হারিয়ে গেছে। এখন যে কয়টি লবণ মিল টিকে রয়েছে তা বাঁচিয়ে রাখতে সরকারের সহযোগিতা একান্তভাবে কাম্য। আমাদেরকে যদি ভর্তুকি দেওয়া হয় এবং ব্যাংক লোনের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়, তবে আমরা লবণ শিল্প নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে পারবো। নয়তোবা যে কয়েকটা লবণ মিল টিকে রয়েছে তাও অচিরেই বন্ধ হয়ে যাবে।

চাঁদপুর চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজ সভাপতি জাহাঙ্গীর আখন্দ সেলিম বলেন, একটা সময় চাঁদপুরে জমজমাট লবণ ব্যবসা ছিল। যোগাযোগ ও বিভিন্ন সুবিধার কারণে এখানে প্রায় ৪০টির মত লবণ ফ্যাক্টরি গড়ে উঠে। এসব লবণ ফ্যাক্টরিতে হাজার হাজার শ্রমিক কাজ করে তাদের সংসার চালাতো। কিন্তু বর্তমানে কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি ও ব্যবসায়ীরা লোন সুবিধা না পাওয়ায় ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে এই লবণ শিল্প।

এতে করে শ্রমিকরা বেকার হয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছে। লবণ শিল্পে যদি ব্যাংক লোনের ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে তারা ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। নয়তো এই শিল্প টিকে থাকবে না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত