ভারতে লোকসভা নির্বাচনের হাওয়া বইছে পুরোদমে। ইতোমধ্যে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা হয়ে গেছে। নির্বাচন কমিশনও প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করেছে সাত দফায় ভোটগ্রহণের জন্য।
কেন্দ্র থেকে রাজ্য এমনকি তৃণমূল পর্যন্ত তুমুল উত্তেজনা ও পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি চলছে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে।
ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এবং কংগ্রেসকে প্রধানতম প্রতিদ্বন্দ্বী দল হিসেবেও ভাবা হলেও রাজ্যভিত্তিক গড়ে উঠেছে বড় বড় জোট। প্রধানতম দলের বাইরেও তৃণমূল পর্যায়ের জোটগুলো সাড়া ফেলতে সক্ষম হচ্ছে ভারতীয় জনগণের মধ্যে।
তবে কার ভাগ্যে কী ঘটছে, ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটছে কিনা, বিজেপির ভাগ্যে কী লেখা আছে এর জন্য অপেক্ষা করতে হবে আরও একমাস। ১১ এপ্রিল নির্বাচন শুরু হলেও ফলাফল প্রকাশ হবে ১৯ মে।
নির্বাচনকে সামনে রেখে বিলুপ্ত ছিটমহলবাসী কী ভাবছেন। ভাগ্য পরিবর্তনে কাকে বেছে নেবেন তারা। গত ২০১৫ সালের ৩১ জুলাই মধ্যরাতে সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের ১৬২টি ছিটমহল দুই দেশের মূল ভূখণ্ডের মধ্যে মিশে গিয়েছিল। আর এর মধ্যেই দুই দেশের ছিটমহলের ভেতরের বাসিন্দারা নিজভূমি বদলের সুযোগ পেয়েছিলেন। এরপর তাদের ভাগ্যে কতটুকু পরিবর্তন এসেছে সেই হিসাব কষার সময় এসেছে এবারের নির্বাচনে।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ১১১টি ভারতীয় ছিটমহলের ৩৭ হাজার ৩৬৯ জন বাসিন্দার মধ্যে ৯২১ জন (২০১৫ সালের ১৯ অক্টোবর থেকে ৩০ নভেম্বর কয়েক দফায়) ভারতের মূল-ভূখণ্ডে ফিরে গেলেও ভারতের অভ্যন্তরে বাংলাদেশের ৫১টি ছিটের ১৪ হাজার ২১৫ জন ভারতীয় হিসেবেই থেকে যান। সেখান থেকে কেউ বাংলাদেশে ফেরেননি। এইসব লোকের নির্বাচনী ভাবনা নিয়ে একটি অনুসন্ধানী চালিয়েছে কলকাতার সংবাদমাধ্যম এই সময়।
কয়েক বছর পার হয়ে গেলেও কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নের দেখা পাননি ছিটমহলবাসী। অবকাঠামোগত কিছু উন্নয়ন ঘটলেও বাড়েনি জীবনযাত্রার মান। আড়ালে লুকিয়ে থাকা ক্ষোভ আঁচ করা যায় কোচবিহারের দিনহাটার মধ্য মশালডাঙ্গায়।
সেখানকার বাসিন্দা সাদ্দাম হোসেন। তার বাড়ির সামনে দেখা গেল তৃণমূল কংগ্রেসের পতাকা ঝুলছে। বাড়ির পাশেই ৮০০ মিটার কালো পিচের রাস্তা। তিনি বলেন, “রাস্তা তো পেয়েছি। কিন্তু সাড়ে চারশ’ ছাত্রছাত্রী আছে এই গ্রামে। স্কুল কোথায়?”
পাওয়া আর না-পাওয়ার আরেকটি হিসেব দিলেন মোহাম্মদ এরশাদ নামে আরেক ছিটমহল বাসিন্দা। তিনি বললেন, “জব কার্ড আছে। কিন্তু কাজ নেই। গ্রামের কয়েকজন ১০০ দিনের কাজ করেছিলাম। কিন্তু এখনও কোনো টাকা পাইনি।”
নাগরিক অধিকারের দাবিতে এক সময় সোচ্চার ছিলেন দুই দেশের ছিটমহলের বাসিন্দারা। এখন তারা নিজস্ব দেশ পেয়েছে। পেয়েছে নাগরিক পরিচয়ও। কিন্তু নিশ্চিত হয়েছি কি নাগরিক সুযোগ-সুবিধা? এরকম প্রশ্নে অনেকেই মুখ খুলতে চান না।
মাজুক আলি শেখ নামে আরেক বাসিন্দা বলেন, “ভোটের হাওয়া কোন দিকে, তা নিয়ে কেউ কিছু বললেই বিপদ। তাই এ নিয়ে কোনো কথা না বলা ভালো। বাতাসেরও যে কান আছে। কথা ভেসে নেতাদের কানে গেলে বিপদ।”
তবে তিন বছর আগে ২০১৬ সালের কোচবিহার লোকসভা উপনির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছিলেন বিলুপ্ত ছিটমহলের বাসিন্দারা। এবারই প্রথম কেন্দ্রীয় সরকার গঠনে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন তারা। তবে কেন্দ্র কে শাসন করছেন তাও জানেন না তাদের অনেকে। হয়তো প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নামটা শুনেছেন শুধু।
এদিকে বিলুপ্ত ছিটমহলবাসীকে ভোটব্যাংক হিসেবে কাছে টানতে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে বিজেপি, কংগ্রেস, তৃণমূল সব দলই।
তৃণমূল কংগ্রেসের দিনহাটার বিধায়ক উদয়ন গুহ বলেন, “সাবেক ছিটমহল এলাকায় নির্বাচনী প্রচারে গিয়ে ভালো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। রাজ্য সরকার একাধিক উন্নয়নের কাজ করেছে। তাতে এখানকার সাধারণ মানুষ খুশি।”
এদিকে বিজেপি নেতৃত্ব বলছে ভিন্ন কথা। এর মধ্যে ভারত-বাংলাদেশ ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির যুগ্ম সম্পাদক দীপ্তিমান সেনগুপ্ত বিজেপিতে যোগ দিলে বিলুপ্ত ছিটমহলে বিজেপির প্রভাব বাড়ে।
তিনি বলেন, “প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উদ্যোগেই এই ছিটমহল বিনিময় হয়েছে। রাজ্য সরকার জমির খসড়া দিয়েছে বলে তৃণমূল কংগ্রেস ভোটে প্রচার করছে। অথচ সেই জমির খসড়া অজস্র ভুলে ভরা। তাই এ সব উন্নয়নের কথা বলে সাবেক ছিটের সাধারণ মানুষকে বোকা বানানো যাবে না।”
