শিশু ধর্ষণ বন্ধে সামাজিক আন্দোলন প্রয়োজন

আপডেট : ০৫ এপ্রিল ২০১৯, ০৩:০১ পিএম

দেশে ধর্ষণ তো কমছেই না বরং উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে শিশু ধর্ষণ ও দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা। ধর্ষণের পর কিংবা ধর্ষণের চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে হত্যার ঘটনাও বাড়ছে। নারীর প্রতি সহিংসতা এবং যৌন নিপীড়নের অন্যান্য ঘটনার বাইরে কেবল বিগত বছরগুলোর ধর্ষণের পরিসংখ্যানই সমাজে ধর্ষণের ভয়াবহতা বোঝার জন্য যথেষ্ট। সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী সালমা আলী দীর্ঘদিন ধরে মানবাধিকার আইনজীবী হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন। নারী নির্যাতন প্রতিরোধ, প্রবাসে নারী শ্রমিকদের অধিকার নিয়েও কাজ করছেন তিনি। বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালকের দায়িত্বও পালন করছেন তিনি। ধর্ষণের বিচারে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন প্রয়োগের নানা দিক, বিচারিক প্রক্রিয়া এবং সমাজে ধর্ষণ কমাতে করণীয় নিয়ে অ্যাডভোকেট সালমা আলী দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন উম্মুল ওয়ারা সুইটি

দেশ রূপান্তর : ধর্ষকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়াটা ধর্ষণ না কমার অন্যতম কারণ বলে মনে করেন নারী আন্দোলন ও অধিকারকর্মীদের অনেকে। বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখছেন?

সালমা আলী : আইনের ফাঁকফোকরের কারণে অনেক ধর্ষক পার পেয়ে যাচ্ছে। তবে যেটুকু রয়েছে, সেটা যথাযথ প্রয়োগ না হওয়ার অন্যতম কারণ হলো নারীবান্ধব পরিবেশ নেই। আমাদের দেশের আইনের কাঠামোটা সেই ব্রিটিশরা বানিয়েছিল সেই পদ্ধতিতেই চলছে। সেখানে ধর্ষণের যে ইনভেস্টিগেশন সেটা মান্ধাতা আমলের। ফলে আইনের দুর্বলতার কারণে অনেক ধর্ষক সহজেই পার পেয়ে যাচ্ছে।

দেশ রূপান্তর : ২০০১ সালে ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার চালু হওয়ার পর ২০১৭ সাল পর্যন্ত ৪ হাজার ৫৪১টি মামলা হয়। এর মধ্যে ১ হাজার ২২৯টি মামলার নিষ্পত্তি হলেও ৩ হাজার ৩১২টি মামলার নিষ্পত্তি হয়নি। বিচারের দীর্ঘসূত্রতা কি ধর্ষকদের পার পেতে সাহায্য করছে?

সালমা আলী : মামলার  ভিকটিম ও সাক্ষীর সুরক্ষা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু আমাদের দেশের সাক্ষী ও ভিকটিম সে সুরক্ষা থেকে অনেক সময় বঞ্চিত হয়। যখন সময়মতো মামলা নিষ্পত্তি হয় না, তখন মামলা হারিয়ে যায়। ধর্ষকরা সব সময় একটা পাওয়ারফুল অবস্থানে থাকে আর ভিকটিমরা নাজুক অবস্থানে থাকে। ফলে টাকা যার হাতে, মাসলম্যান যার হাতে থাকে কোর্ট তার দিকে থাকে, এভাবে মামলাগুলো একটা সময় হারিয়ে যায়। তা ছাড়া আসামি ধরা পড়লে ১৫ দিনের মধ্যে চার্জশিট দিতে হবে, ধরা না পড়লে ৩০ দিনের মধ্যে দিতে হবে। তারপর যথাসময়ে মামলা নিষ্পত্তি না হলে সময় একটু বাড়াতে হবে। কিন্তু কোনো কিছুই হয় না। সে কারণে আমাদের যে সবচেয়ে ভালো আইন রয়েছে তারও প্রয়োগ নেই, আইনের পরিকাঠামোগুলোরও অভাব। ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের সংখ্যা বাড়াতে হবে। সবচেয়ে বড় বিষয় হল সততা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এই তিনটি বিষয় থাকলে এই সমস্যগুলো কিছুটা কমে আসবে বলে মনে করি।

দেশ রূপান্তর : ধর্ষণ মামলার ক্ষেত্রে স্থানীয় ক্ষমতাধর এবং রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাবানদের প্রভাবের কথা শোনা যায়। পাশাপাশি মামলা করার সময় থানায় দুর্বল এফআইআরকে আইনের ফাঁক গলে ধর্ষকদের বেরিয়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন অনেকে বিষয়টি আসলে কী রকম, একটু ব্যাখ্যা করবেন কি?

সালমা আলী : দুর্বল এফআইআরের অন্যতম কারণ হলো অভিজ্ঞ লোক এবং সৎলোকের অভাব। সুবর্ণচরের ধর্ষণের সূত্র ধরে বলা যায়, ভিকটিম প্রধান আসামিকে উল্লেখ করে মামলা দায়ের করলেও ওই মামলায় প্রধান আসামির নামই নেই। কারণ এটা উদ্দেশ্যমূলকভাবে দেওয়া হয়নি। শুভঙ্করের ফাঁকি দেওয়ার জন্য মামলা দুর্বল করা হয়। এগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে করা হয়। সরকারের কাছে আমাদের অনুরোধ কিছু এক্সপার্ট লোক দিয়ে আলাদা মনিটরিংয়ের মাধ্যমে ধর্ষণের মামলাগুলো পরিচালনা করা। নারী শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলাগুলো জোরালো করতে হলে বাজেট বরাদ্দ করতে হবে এবং মেডিকেল ল্যাবগুলো আধুনিকায়ন করতে হবে। প্রশাসনে এক্সপার্ট লোক নিয়োগ করতে হবে। দেশে এ ধরনের ঘটনাগুলো ঘটতেই থাকবে যদি পুরো সিস্টেমটাকে চেঞ্জ করা না হয়।

দেশ রূপান্তর : সাম্প্রতিক সময়ে দেশে শিশু ধর্ষণের ঘটনা ব্যাপক হারে বেড়েছে। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের তথ্যানুসারে ২০১৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে দেশে ২ হাজার ৩২২টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ধর্ষণচেষ্টা ও যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে হয়েছে আরও ৬৩৯ শিশু। বিশেষভাবে শিশু ধর্ষণ বন্ধে জরুরি কী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে?

সালমা আলী : শিশু ধর্ষণ বন্ধ করতে হলে সবাই মিলে এটাকে একটা আন্দোলন হিসেবে নিতে হবে। প্রথমত একেকটা ঘটনা ঘটে, তারপর গণমাধ্যমসহ সব জায়গায় তুমুল আলোচনা হয়, তারপর একটা সময় আর মিডিয়ার ফলোআপ থাকে না। এ সময়ের মধ্যে তালিকায় আরও একটি ঘটনা যোগ হয়। ঘটনা যাতে ঘটতেই না পারে, সে জন্য একটি সামাজিক আন্দোলন খুব জরুরি হয়ে দেখা দিয়েছে। ধর্ষণ প্রতিরোধে বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি, তা থেকে বের হতে হবে। ধর্ষককে দৃষ্টান্তমূলক সাজার আওতায় আনতে হবে। শিশু ধর্ষণের ব্যাপারে সরকারকে জিরো টলারেন্স নিতে হবে। প্রথম কথা হলো এটাকে চাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। অনেকেই সাহস করে মামলা দিচ্ছে না। এ ছাড়া শিশুদের যত্ন নিতে হবে। শুধু প্রশাসনের ওপর ভরসা করলে হবে না। সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের এ বিষয়ে সচেতন করতে হবে।

দেশ রূপান্তর : ধর্ষণের পর কিংবা ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে শিশু হত্যার হারও মারাত্মকভাবে বাড়ছে। গত চার বছরে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৩১টি শিশুকে। ধর্ষণের যন্ত্রণা ও চাপ সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেছে ১৯টি শিশু। ভারতে শিশু ধর্ষণ রোধে ১২ বছরের কম বয়সী শিশুকে ধর্ষণের অপরাধে মৃত্যুদন্ডে আইন পাস হয়েছে। বাংলাদেশে এ সংক্রান্ত আইন সংশোধন প্রয়োজন বলে মনে করেন কি?

সালমা আলী : মেনকা গান্ধী ধর্ষণ বন্ধ করার জন্য যে আইন করেছেন, তাতে কিন্তু ভারতে ধর্ষণ কমেনি। আমি মনে করি না মৃত্যুদন্ড দিলেই ধর্ষণ কমবে। আমরা জেলখানাগুলোকে জেলখানা বলতে চাই না, আমরা এটাকে ‘উন্নয়ন কেন্দ্র’ বলতে চাই। কিন্তু আমাদের দেশের আসামিরা জেলখানায় থেকে আরও বড় দাগি আসামি হয়ে বের হয়ে আসছে। শিশু ধর্ষকরা আরও বড় ধর্ষক হয়ে বের হয়। কারণ আমাদের সিস্টেমগুলোতে গলদ রয়েছে। কোর্ট যদি নারীবান্ধব না হয়, পাবলিক প্রসিকিউটরের যদি সময় না থাকে, সে যদি টাকা নিয়ে বিপক্ষে চলে যায়, তাদের যদি যোগ্যতা না থাকে তাহলে ফাঁসির আইন করেও কোনো কাজ হবে না।

দেশ রূপান্তর : ধর্ষণ ও দলবদ্ধ ধর্ষণের শাস্তির বিষয়ে আইনগত কোনো তফাত আছে কি? দলবদ্ধ ধর্ষণ বাড়ার কারণ কী?

সালমা আলী : দলবদ্ধ ধর্ষণ আর ধর্ষণের সাজার বিষয়ে কোনো আইনগত তফাত নেই। শুধু চ্যালেঞ্জ হয় আসামিটাকে ধরা। ভিকটিম যখন আসামির নাম বলতে না পারে, তখন মূল আসামি ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যায়। এরা পাওয়ার রেপিস্ট। এরা রাজনীতিকে হাতিয়ার করে এই ধরনের ঘটনা ঘটায়। গণতন্ত্র যদি টেকসই না হয়, তা হলে এ ধরনের ঘটনা সব সময়ই ঘটতে থাকবে। ঘটনা বাড়বে। এই অপরাধীরা একসঙ্গে পর্নোগ্রাফি দেখে। পরে যাকেই সামনে পায় তার ওপর প্রয়োগ করে। এটা বিকৃত রুচি। বিচারহীনতার কারণে দলবদ্ধ ধর্ষণের মতো ঘটনাগুলো ঘটে থাকে। এটা কমাতে হলে পর্নোগ্রাফি আইন সেটা যথাযথ বাস্তবায়ন করতে হবে। সরকারের মনিটরিং সেল কার্যকর করতে হবে। পরিবারকে দায়িত্ব নিতে হবে এসব অপরাধীর ব্যাপারে। সরকার যদি এসব বিচার দ্রুত করতে চায় এবং এ ব্যাপারে যদি আমাদের সহযোগিতা দরকার হয়, আমরা প্রস্তুত আছি করার জন্য।

দেশ রূপান্তর : বিদ্যমান ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনটি কি নারী ও শিশু নির্যাতনের বিচারে যথেষ্ট বলে মনে করেন? এই আইনের কোনো সংশোধন প্রয়োজন বলে মনে করেন কি? কিংবা এ ক্ষেত্রে বিচারিক প্রক্রিয়ার কোনো দুর্বলতা আছে বলে মনে করেন কি?

সালমা আলী : আইনের দুর্বলতার চেয়ে প্রয়োগের যে কাঠামো, সেখানে দুর্বলতা বেশি। এ ক্ষেত্রে বাজেটেরও ঘাটতি রয়েছে। নারীবান্ধব পুলিশ ও অভিজ্ঞ পুলিশ দরকার। ধর্ষণের পরীক্ষায় ‘টু ফিঙ্গার টেস্ট’ নিয়ে এত আলোচনার পরও তা বন্ধ হয়নি। পাবলিক প্রসিকিউটরকে কমিটেড, সৎ ও যোগ্য হতে হবে। বিচারের ব্যাপারে তার কমিটমেন্ট থাকতে হবে। কোর্ট বাড়াতে হবে। বিচার যেন প্রতিটি কার্যদিবসে হয়। তা হলেই যথাসময়ে নিষ্পত্তি হবে। এ ধরনের বিচারের ক্ষেত্রে ‘কোর্ট টু ড্রামা’ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

দেশ রূপান্তর : আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

সালমা আলী : দেশ রূপান্তর এবং পাঠকদেরও অনেক ধন্যবাদ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত