‘আর কোন প্রিয়মুখ যেন আগুনে না পুড়ে’

আপডেট : ০৫ এপ্রিল ২০১৯, ০৯:৩৪ পিএম

সকাল সাড়ে ১০ টা। রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনের রাস্তা।  নারী, পুরুষ ও ছোট্ট ছোট্ট শিশুরা দাঁড়িয়েছেন মানববন্ধনে। কারও হাতের প্ল্যাকার্ডে লেখা- ‘আমার মা আগুনে পুড়ে মারা গেছে, তোমাদের মাকে আগুন থেকে বাঁচাও’। কারও হাতে লেখা ছিল, ‘আর কোন প্রিয়মুখ যেন আগুনে না পুড়ে’।

সেখানে অনেক বাচ্চার চোখে ছিল মা ও প্রিয়জন হারানো কান্নার অশ্রু। আগুনে তাদের কেউ মা হারিয়েছেন। কেউ স্ত্রী হারিয়েছেন। কেউ বাবা আবার কেউ স্বামী হারিয়েছেন।

শুক্রবার বিভিন্ন সামাজিক ও পরিবেশবাদী সংগঠনের ব্যানারে আয়োজিত এই মানববন্ধনে হাজির হওয়া সবাই ছিলেন সম্প্রতি চকবাজারের চুড়িহাট্টায় অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের স্বজন। তারা আগুনের হাত থেকে অন্যদের বাঁচানোর পাশাপাশি ভুক্তভোগী হিসেবে  উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন।

এই মানববন্ধনে অংশ নিয়ে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সংস্থার (বেলা) প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, চকবাজারের আগুনে যারা বাবা-মা, ভাই বোন হারিয়েছেন তাদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। নিহতদের পরিবারে যারা চাকরি করার উপযুক্ত তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। শাস্তির আওতায় আনতে হবে ঘটনায় দোষীদের পাশাপাশি যে সকল প্রতিষ্ঠান এসব ভবনের অনুমোদন দিয়েছে। ভবিষ্যতে যেন এমন দুর্ঘটনা না ঘটে সেই বিষয়ে সরকারের নজর দিতে হবে।

এদেরই একজনের নাম জহিরুল হক। পাঁচ বছর বয়সী শিশু বিবি মরিয়ম সানিনকে সঙ্গে নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন মানববন্ধনে। দেশ রূপান্তরকে বলেন, আগুনে আমার স্ত্রী হালিমা শীলা পুড়ে মারা গেছেন। রেখে গেছেন দুই অবুঝ শিশু কন্যা। ঘটনার দেড় মাস পরও কেউ আমার স্ত্রীর লাশের সন্ধান দিতে পারলো না। আক্ষেপ করে বলেন,  আমার সন্তানেরা বড় হয়ে  তাদের মায়ের কবর দেখতে চাইলে আমি তাদের কী দেখাব? কী জবাব দেব? অন্তত লাশটি খুঁজে  পেলে  মনকে  সান্ত্বনা দিতে পারতাম। মেয়েদের বলতে পারতাম, এই যে তোমাদের মা এখানে ঘুমিয়ে আছে।  এ সময় তার সঙ্গে থাকা তারই শিশু বিবি মরিয়ম সানিন বলে ওঠে,  আমাকে ছেড়ে মা চলে গেছে। আর আসে না। আমার ছোট আপুও তার জন্য কান্না করছে।

শিশু সানিনের বাবা জহিরুল আরও বলেন, আমার দুই মেয়ে। পাঁচ বছর বয়সী সানিন বড়। ছোটটির বয়স যখন  যখন সাড়ে তিন মাস, তখনই মা আগুনে হারিয়েছে।

মনসুর আলী দীপু বলেন, আমার তিন ভাই আগুনে পুড়ে মারা গেছে। দেড় মাসেও কেউ কোন খোঁজ নেয়নি। পাশে দাঁড়ানোর কেউ নেই। চরম কষ্টে দিন চলছে আমাদের।

জহিরুল হক বলেন, আমার যে ক্ষতি হয়েছে তা অপূরণীয়। আমার দুই অবুঝ সন্তানের প্রতিটি সন্ধ্যা আসে কান্না নিয়ে।  ভোরও কান্না দিয়ে। মাকে  পাওয়ার আশা নিয়ে। কারণ  ওদের মা বেঁচে থাকতে সবসময়  ওরা আদরের মধ্যেই থাকত। তিনি বলেন, মা ছিল দুই মেয়ের বড় বন্ধু। আগুনে তাদের মায়ের প্রাণ কেড়ে নেওয়ার পর থেকে দুই সন্তান আজ অসহায়।

একই অসহায়ত্বের কথা জানিয়ে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণসহ আরও ৬ দফা দাবি পূরণের কথা বলেছেন মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারী ভুক্তভোগীরা। তাদের সঙ্গে ছিলেন বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের সদস্যরা।

মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীদের দাবি- কেমিক্যালসহ দাহ্য পদার্থ নিরাপদ স্থানে রাখার ব্যবস্থা নেওয়া, নিহত আহত প্রত্যেক পরিবারকে উপযুক্ত আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়া, এই সব পরিবারের সন্তানদের চিকিৎসার দায়িত্ব নেওয়া, যোগ্যতা অনুযায়ী হতাহত পরিবারের সদস্যদের চাকরির ব্যবস্থা করা, রাজউকের নিয়ম মেনে ভবন নির্মাণ, ঝুঁকিপূর্ণ জীবনের সার্বিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সর্বোপরি জনসাধারণের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা।

মানব বন্ধনে আরও উপস্থিত ছিলেন চুড়িহাট্টার আগুনে নিহত ছেলে ওয়াসিউদ্দিন মাহিদের বাবা নাসির উদ্দিন। তিনি বলেন, আগুনে সন্তান হারানোর পর থেকে এক দিনের জন্যও জানে শান্তি নেই। সব সময় ছেলের কথা মনে পড়ে। সেই আগুনে আমাদের অনেক আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু সরকারিভাবে আমাদের যে আর্থিক সহযোগিতার কথা বলা হয়েছিল তা এখনো পাইনি। সেই সঙ্গে এলাকা এখনো কেমিক্যাল মুক্ত হয়নি।

উল্লেখ্য, গত ২০ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ আগুনের ঘটনায় ৭৩ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত