স্যামসাং দক্ষিণ কোরীয় একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। এই গ্রুপটি বিভিন্ন খাতে ব্যবসা করে থাকে, এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে স্যামসাং ইলেক্ট্রনিকস। যারা বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ইলেকট্রনিকস সামগ্রী নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া অন্যান্য খাতের মধ্যে উল্লেখযোগ্য জাহাজ নির্মাণ কেন্দ্র। এই কেন্দ্রের আয়তন ৪০ কোটি বর্গফুট যা গড়পড়তা ২০৪টি ফুটবল মাঠের সমান। পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু দালান বুর্জ আল খলিফা নির্মাণ করেছে স্যামসাং। বলা হয়ে থাকে এমন কোনো খাত নেই যেখানে স্যামসাং ব্যবসা করেনি। বিশ্বব্যাপী রাজত্ব করা স্যামসাংয়ের উত্থানের কাহিনী নিয়ে লিখেছেন লায়লা আরজুমান্দ
প্রতিষ্ঠাতা লি বিয়ং চল
আজকের বিশ্বখ্যাত ইলেকট্রনিকস পণ্য নির্মাতা স্যামসাংয়ের জন্ম যার হাত ধরে তিনি লি বিয়ং চল। দক্ষিণ কোরিয়ার সবচেয়ে সফল ব্যবসায়ীও তিনি। দক্ষিণ কোরিয়ার ইউরিংয়ের এক ধনাঢ্য পরিবারে ১৯১০ সালে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। গ্রাজুয়েশন করতে তাকে পাঠানো হয় টোকিওর ওয়াসেডা বিশ্ববিদ্যালয়ে। পড়া চলাকালীন তার বাবা মারা যান। তারপর পড়া শেষ না করে তিনি ফিরে আসেন। তার পরিবারের ছিল নানা রকমের ব্যবসা। তিনি ফিরে এসে এগুলোর সঙ্গেই জড়িয়ে পড়েন। ১৯৮৭ সালে ফুসফুস ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তিনি।
নুডলস দিয়ে শুরু
তার ব্যবসায়িক জীবন শুরু হয় পারিবারিক চাল কল দিয়ে। কিন্তু তিনি বেশিদিন এই ব্যবসা চালাননি। ব্যবসায় লস করে তিনি নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দাঁড় করালেন। ১৯৩৮ সালের ১ মার্চ মাত্র ৩০,০০০ ওন (প্রায় ২৭ ডলার) নিয়ে নিজে নতুন একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান শুরু করেন। প্রতিষ্ঠানের নাম দেন ‘স্যামসাং ট্রেডিং কোম্পানি’। দক্ষিণ কোরিয়ার দায়েগু শহরে ৪০ জন কর্মচারী, কয়েকটি ট্রাক নিয়ে গ্যারেজে শুরু হয় স্যামসাংয়ের যাত্রা। বর্তমানে স্যামসাং যে সব পণ্য তৈরি করে তার ধারেকাছেও ছিল না এইসব পণ্য। এটা ছিল অনেকটা গুদাম ঘরের মতো। শহরের মধ্যে যে সব মুদি দোকান রয়েছে সেখানে পণ্য পরিবহন করত তারা। পণ্যের মধ্যে ছিল ময়দা ও শুকনো সামুদ্রিক খাবার, শুকনো মাছ, শুকনো সবজি। তাছাড়া ছিল তাদের নিজেদের তৈরি নুডলস। ধীরে ধীরে ব্যবসা যখন বাড়তে থাকল তখন একবার সমস্ত সঞ্চয় দিয়ে অনেক পরিমাণ পণ্য কিনে ফেলেন। তারপর তার সঙ্গে যুক্ত করতে লাগলেন বিভিন্ন ধরনের প্যাকেজ, দিলেন ছাড়। এরপর খুব অল্প সময়ের মধ্যে জনপ্রিয়তা পেতে লাগল স্যামসাং। কিছুদিনের মধ্যেই দেশের গ-ি পেরিয়ে যায় এর জনপ্রিয়তা।
যুদ্ধ ও রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর লি সিদ্ধান্ত নেন তার প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় স্থানান্তর করার। ১৯৪৭ সালে তিনি প্রতিষ্ঠান স্থানান্তর করেন সিউলে। সেখানে ভালোই চলছিল তার ব্যবসা। সেই সময়ে সেরা ১০টি ট্রেডিং কোম্পানির মধ্যে একটি ছিল স্যামসাং। তবে আবারও বেজে ওঠে যুদ্ধের দামামা। শুরু হলো কোরীয় যুদ্ধ। চলল তিন বছর, ১৯৫০ থেকে ১৯৫৩। যুদ্ধ শেষে শুরু হলো রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা। সে সময় তিনি সিউল ছাড়তে বাধ্য হন। প্রায় সব হারিয়ে তিনি হয়ে যান সর্বস্বান্ত। কিন্তু মনোবল হারাননি তিনি। চলে যান বুসানে। সেখানে গিয়ে শুরু করেন চিনি শোধনাগারের ব্যবসা। প্রতিষ্ঠানের নাম দেন চেল জেদাং (আজকের বিশ্বখ্যাত সিজে করপোরেশন)।
দুর্নীতির অভিযোগ
ধীরে ধীরে বুসানে ব্যবসা জমিয়ে ফেলতে শুরু করেন লি। তবে এর পাশাপাশি দুর্নীতির অভিযোগও জমা হতে থাকে তার বিরুদ্ধে। যুদ্ধ শেষের পর তিনি উলের মিলের ব্যবসা শুরু করেন। দক্ষিণ কোরিয়ার ইতিহাসে সেটি ছিল সব থেকে বড় উলের মিল। তিনি এর নাম দেন ‘চেল মোজিক’। ১৯৬০ সালের মধ্যে তিনি জীবনবীমা, টেক্সটাইল, আবাসন, ব্যাংক প্রভৃতির ব্যবসা শুরু করেন। এভাবে কয়েক বছরের মধ্যে বিশাল অংকের ব্যাংক ব্যালেন্স জমা হয় তার নামে। ব্যাংক ব্যালেন্সের সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে দুর্নীতির অভিযোগও।
সাদা-কালো টেলিভিশন
বর্তমান সময়ে বিশ্বজুড়ে স্যামস্যাংয়ের পরিচিতি মূলত ‘ইলেকট্রনিকস জায়ান্ট’ হিসেবেই। অথচ প্রতিষ্ঠার প্রথম তিন দশকে স্যামসাং ইলেকট্রনিকস পণ্য উৎপাদনে তেমন কোনো বিনিয়োগই করেনি। মূলত ষাটের দশকের শেষ দিকে স্যামসাং উদ্যোগ নেয় ইলেকট্রনিক পণ্য উৎপাদনে। নিজের হারানো সুনাম পুনরুদ্ধারে লি মনোনিবেশ করেন। বিশ্ববাজারে তার ব্যবসার সুনাম নতুনভাবে গড়ে তুলতে একটি চুক্তিও করেন সরকারের সঙ্গে। ১৯৬৯ এর দিকে প্রথমবারের মতো ‘স্যামসাং ইলেকট্রনিকস ইন্ডাস্ট্রিজ’ নামের ইলেকট্রনিকস সামগ্রী নির্মাতা প্রতিষ্ঠান যুক্ত হয় স্যামসাং করপোরেশনের সঙ্গে। পরের বছর ১৯৭০ সালে স্যামসাং সর্বপ্রথম তাদের নিজেদের তৈরি সাদা-কালো টেলিভিশন বাজারে ছাড়ে। টেলিভিশনটির আকার ছিল ১২ ইঞ্চি। মূলত এই টেলিভিশন দিয়েই তাদের ইলেকট্রনিকস দুনিয়ায় হাতেখড়ি। এরপর ইলেকট্রনিকস দুনিয়ায় নিজেদের অবস্থান ক্রমেই পোক্ত করে স্যামসাং।
ইলেকট্রনিকস পণ্যে ঝোঁক
ইলেকট্রনিকস পণ্যের ব্যাপক জনপ্রিয়তার আভাস পেয়ে পরের বছরগুলোতে স্যামসাং ইলেকট্রনিকস পণ্য নির্মাণের দিকে মনোযোগ দেয়। ১৯৮০ সালে, স্যামসাং ইলেকট্রনিকস গবেষণা ও উন্নয়ন কাজে ব্যাপকভাবে বিনিয়োগ করতে শুরু করে। ফলে গড়ে ওঠে স্যামসাং ইলেকট্রনিকস ডিভাইস, স্যামসাং কর্নিং, স্যামসাং ইলেক্ট্রো-মেকানিক্স, স্যামসাং সেমিকন্ডাক্টর এবং স্যামসাং টেলিকমিউনিকেশনের মতো নানা শাখা।
রাজত্ব দখল
এরপর আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি স্যামসাংকে। দ্রুতগতিতে জনপ্রিয়তা পেয়ে গেছে এই প্রতিষ্ঠানটি। গ্রাহকদের একের পর এক উপহার দিয়ে গেছে চোখ ধাঁধানো সব পণ্য। বর্তমানে ইলেকট্রনিকস পণ্যের বাজারে অন্যদের তুলনায় কোনোভাবে পিছিয়ে নেই স্যামসাং। ২০০০ সালে সব ইলেকট্রনিকস কোম্পানিকে পেছনে ফেলে শীর্ষস্থানটি দখল করে নেয় স্যামসাং। ২০১০ সালে ব্র্যান্ড ভ্যালুর দিক দিয়ে স্যামসাং সারা পৃথিবীতে ১৯তম স্থান দখল করে নেয়। আর সবচেয়ে প্রশংসিত ইলেকট্রনিকস কোম্পানির তালিকায় লাভ করে দ্বিতীয় স্থান। ২০১২-এর প্রথম দিকে, নকিয়াকে ছাড়িয়ে বিশ্বের বৃহত্তম মোবাইল ফোন নির্মাতা হয়ে ওঠে স্যামসাং ইলেকট্রনিকস। এরপর এমন কোনো খাত নেই যেখানে স্যামসাং-এর পা পড়েনি। যেমন, ফাইবার অপটিক্স, যন্ত্রপাতি ও ভারী শিল্প, রাসায়নিক শিল্প, প্রকৌশল ও নির্মাণ শিল্প, বিনোদন, ব্যাংক ও বীমা, মেডিকেল ইত্যাদি।
আরও যত
স্যামসাং ১৯৯০ সালে একটি আন্তর্জাতিক করপোরেশন হয়ে ওঠা শুরু করে। ১৯৯২ সালে বিশ্বের বৃহত্তম মেমরি চিপ প্রস্তুতকারক হয়ে ওঠে স্যামসাং। এছাড়াও বিমানের ইঞ্জিন ও গ্যাস টারবাইন উৎপাদন করতে শুরু করে। বর্তমানে স্যামসাং প্রায় ৮০টি কোম্পানি নিয়ে গঠিত। এর অধীনস্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো স্যামসাং ইলেকট্রনিকস, স্যামসাং ইলেক্ট্রো-মেকানিক্স, স্যামসাং সিঅ্যান্ডডি করপোরেশন, স্যামসাং ইঞ্জিনিয়ারিং, স্যামসাং এভারল্যান্ড, স্যামসাং মোবাইলসহ আরও অনেক।

বিভক্ত স্যামসাং
দক্ষিণ কোরীয় ইলেকট্রনিকস প্রতিষ্ঠানটি মূলত লি পরিবার-নিয়ন্ত্রিত। ১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠাতা লি-এর মৃত্যুর পর স্যামসাং-এর ব্যবসা চার ভাগে ভাগ হয়ে যায়। এগুলো হলো স্যামসাং গ্রুপ, শিনছুজিয়া গ্রুপ, সিজে গ্রুপ এবং হ্যানছিল গ্রুপ। এদের মধ্যে শিনছুজিয়াÑ মূল্য ছাড়ের দোকান, ডিপার্টমেন্ট স্টোরের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। সিজে জড়িত খাদ্য, কেমিক্যালস, বিনোদন, সরবরাহের ব্যবসার সঙ্গে। হ্যানছিল গ্রুপ কাগজ ও টেলিকম ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। বর্তমানে এই পৃথক গ্রুপগুলো স্বাধীন এবং তারা স্যামসাং ইলেকট্রনিকস-এর সঙ্গে সংযুক্ত নয়।
উত্তরাধিকার
লি বিয়ং চল বিয়ে করেছেন দুটি। দুই সংসারে তার সন্তান মোট ১০ জন। এর মধ্যে চার জন ছেলে আর ছয় জন মেয়ে। এদের মধ্যে স্যামসাংয়ের বর্তমান কর্ণধার লি কুন-হি। বাবার মৃত্যুর পর ১৯৮৭ সালে তিনি চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তবে ২০০৮ সালে তিনি দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেন। তবে আবার দায়িত্বে ফিরে আসেন ২০১০ সালে। ফোর্বস ম্যাগাজিনের করা তালিকায় বিশ্বের ক্ষমতাবান শীর্ষ ৩৫ ব্যক্তির মধ্যে রয়েছে তার নাম। কিন্তু হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার পর ২০১৪ সালে কোম্পানিটির ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন তারই ছেলে লি জায়ে ইয়োং। বর্তমানে তিনিই কোম্পানিটির অলিখিত কর্ণধার।
সীমাবদ্ধতা
২০১৬ সালের আগস্টে স্যামসাং নোট৭ বাজারে ছাড়ার পর অন্তত ২৫ লাখ হ্যান্ডসেট বাজার থেকে সরিয়ে নিতে হয়। যেটা স্যামসাংয়ের ইতিহাসে প্রথম। পরে নোট৭ আর বাজারেই রাখেনি প্রতিষ্ঠানটি। তার কারণ ছিল ব্যাটারি ও চার্জারের সমস্যা। বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ করেছিলেন অনেক ব্যবহারকারী। এ সংক্রান্ত বেশ কিছু অভিযোগ পাওয়ার পর এই ডিভাইস বাজার থেকে সরিয়ে নেয়। এতে তাদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছিল।
বাংলাদেশেও স্যামসাং খুবই জনপ্রিয়। বর্তমানে পাঁচটি পরিবেশকের মাধ্যমে স্যামসাং তার পণ্য বিক্রি করছে। এ ছাড়া কিছুদিন আগে দেশে স্থাপিত হয়েছে স্যামসাংয়ের কারখানা। এর ফলে স্যামসাংয়ের কয়েক ধরনের ইলেকট্রনিকস গৃহস্থালি সামগ্রী এখন থেকে বাংলাদেশেই উৎপাদিত হচ্ছে। স্যামসাং ব্র্যান্ডের স্মার্টফোন তৈরির কারখানাও স্থাপিত হয়েছে বাংলাদেশে। স্যামসাং হচ্ছে দেশের প্রথম বৈশ্বিক হ্যান্ডসেট কোম্পানি, যারা বাংলাদেশে মোবাইল তৈরির কারখানা স্থাপন করছে।
খুঁটিনাটি

প্রতিষ্ঠাতা লি বিয়ং চল
স্যামসাং প্রতিষ্ঠা : ১৯৩৮ সালে
স্যামসাং বর্তমানে বিশ্বের ৮০ দেশে কাজ করছে।
প্রায় ৪ লাখ লাখ ৮৯ হাজার কর্মী রয়েছে
প্রথম সাদা-কালো টেলিভিশন বাজারে আনে ১৯৭০ সালে
প্রথম ডিজিটাল টেলিভিশন তৈরি করে ১৯৯৮ সালে
১৯৮৭ সালে স্যামসাং গ্রুপ চার ভাগে ভাগ হয়ে যায়
বর্তমানে কোম্পানির কর্ণধার লি’র ছেলে কুন হি
সবার প্রথম কার্ভড স্মার্টফোন তৈরি করে ২০১৩ সালে।
স্যামসাং প্রতি বছর প্রায় ৩০টি বড় জাহাজ তৈরি করে।
স্যামসাং প্রতি বছর প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলার দান করে থাকে অলাভজনক মেডিকেল সেন্টারে।
স্যামসাং দক্ষিণ কোরিয়ার এয়ারফোর্সের জন্য প্রথম ফাইটার জেট কঋ-১৬ তৈরি করেছিল।
লোগো

স্যামসাং শব্দটি কোরিয়ান। এখানে ‘স্যাম’ অর্থ থ্রি বা তিন এবং ‘সাং’ অর্থ স্টার বা তারা। অর্থাৎ দুয়ে মিলে এর অর্থ দাঁড়ায় ‘থ্রি স্টার’ বা তিন তারা। তাছাড়া কোরিয়ান ভাষায় ‘স্যাম’ শব্দটি দিয়ে বিশাল ও শক্তিশালী বুঝানো হয়। স্থানীয় পণ্যের পাশাপাশি তারা তাদের নিজস্ব যে নুডলস তৈরি করত তার প্যাকেটে দেওয়া থাকত থ্রি স্টারের চিহ্ন। যেটা ছিল তাদের কোম্পানির লোগো। ১৯৩৮ সালে এই লোগো প্রথম ব্যবহার করা হয়। এরপর লোগো বদল করা হয় ১৯৬৯ সালে। এরপর আবার লোগো বদল করা হয়েছে ১৯৮০ সালে। বর্তমানে আমরা যে লোগো দেখতে পাই সেটা ব্যবহার শুরু হয়েছে ১৯৯৩ সাল থেকে।