কমিটি করে দুর্নীতি বন্ধের পথ খুঁজছে জনপ্রশাসন

আপডেট : ১৩ এপ্রিল ২০১৯, ০২:৩০ এএম

সেবাগ্রহীতার সঙ্গে সেবাদাতার সাক্ষাৎ বন্ধ করে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে চায় সরকার। অনলাইনে সেবা দেওয়ার মাধ্যমে দুর্নীতি বন্ধের এই প্রাথমিক ধারণা নিয়ে কাজ করেছেন জনপ্রশাসনের কর্মকর্তারা। এ বিষয়ে বিস্তৃত ধারণাপত্র তৈরি করার জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এছাড়া সরকারি কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব নেওয়ার মাধ্যমকেও দুর্নীতি বন্ধের কৌশল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন তারা। মূলত দুর্নীতি বন্ধে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে এসব ধারণা খুঁজে পেয়েছেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।

জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন গত বৃহস্পতিবার রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী যেসব নির্দেশনা দিয়েছেন আমরা তা নিয়ে কাজ শুরু করেছি। একাধিক বৈঠক করে কার কী দায়িত্ব তা নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব নির্দেশনার অগ্রগতি কতটুকু তা নিয়েও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী সরকারি কর্মচারীদের দুর্নীতি বন্ধের কথা বলেছেন। সরকারি কর্মচারীদের প্রায় ১৩০ শতাংশ বেতন বাড়ানো হয়েছে। তাদের ৫ শতাংশ হারে গৃহঋণ, রক্ষণাবেক্ষণ খরচসহ বিনাসুদে গাড়ি কেনার জন্য ঋণ দেওয়া হচ্ছে। আরও অসংখ্য সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন তারা। এরপরও কেউ দুর্নীতি করলে রেহাই পাওয়া যাবে না। যে উপায়ে দুর্নীতি কমানো যাবে, তা-ই করা হবে। অনলাইনে সেবা দেওয়ার মাধ্যমে দুর্নীতি কমলে সেই ব্যবস্থাই নেওয়া হবে।’ 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ১৭ জানুয়ারি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি সরকারি কর্মচারীদের দুর্নীতি বন্ধের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে তিনি সরকারের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে দায়ের করা মামলা দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনার জন্য অ্যাটর্নি সার্ভিস গঠন, ক্যারিয়ার প্ল্যানিং অনুসরণ, কর্মকর্তাদের পদায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা আমলে নেওয়া, কর্মকর্তাদের বিশেষায়িত দক্ষতা বাড়ানোর জন্য বিশে^র বিভিন্ন নামকরা বিশ^বিদ্যালয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, চাহিদাভিত্তিক প্রশিক্ষণ, ক্যাডার কর্মকর্তাদের নিয়োগপ্রাপ্তির পরই ব্যাচভিত্তিক বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ গ্রহণের ব্যবস্থা গ্রহণসহ বিভিন্ন নির্দেশনা দেন। 

এসব নির্দেশনা বাস্তবায়নের কৌশল নির্ধারণ এবং কিছু নির্দেশনা বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনার জন্য গত ২৭ মার্চ জনপ্রশাসন সচিব ফয়েজ আহম্মেদের সভাপতিত্বে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভায় প্রধানমন্ত্রীর প্রতিটি নির্দেশনা নিয়ে আলোচনা করা হয় এবং এসব নির্দেশনা বাস্তবায়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কাছে কাজের সর্বশেষ অবস্থা জানতে চাওয়া হয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সভায় প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, সরকারি কর্মচারীদের জন্য বেতন-ভাতা এতটাই বৃদ্ধি করা হয়েছে যে, তাদের আর দুর্নীতি করার কারণ নেই। এরপরও কেউ দুর্নীতি করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই বার্তা তিনি প্রশাসনের তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশ দেন। প্রধানমন্ত্রীর এ নির্দেশ বাস্তবায়নের জন্য কর্মকর্তারা অনলাইনে সেবা দেওয়া নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন। দাতার সঙ্গে সেবাগ্রহীতার সাক্ষাৎ না হলে দুর্নীতি কমে যাবে বলে তারা জানান। এ বিষয়ে ধারণাপত্র প্রস্তুতের জন্য পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের শৃঙ্খলা শাখার যুগ্ম সচিবকে আহ্বায়ক করে এ কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটিকে ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে ধারণাপত্র প্রস্তুত করে উপস্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়।

প্রধানমন্ত্রী সরকারের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে দায়ের করা মামলা পরিচালনার জন্য কর্মকর্তাদের আরও তৎপর হওয়ার নির্দেশ দেন। এসব মামলা দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনার জন্য অ্যাটর্নি সার্ভিস গঠনের উদ্যোগ নিতে বলেন। জনপ্রশাসনের পর্যালোচনা বৈঠকে অ্যাটর্নি সার্ভিস গঠনের উদ্যোগ নেওয়ার জন্য আইন মন্ত্রণালয়কে তাগাদা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এছাড়া আলাদা অ্যাডভোকেট নিয়োগের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

বর্তমানে ক্যাডার কর্মকর্তারা নিয়োগ পাওয়ার পরই কাজে নেমে পড়েন। অনেক কর্মকর্তাই কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ ছাড়া চাকরি শুরু করেন। এই অবস্থা থেকে বের হয়ে আসার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, সিভিল সার্ভিসের ক্যাডার কর্মকর্তাদের নিয়োগ পাওয়ার পরই বুনিয়াদি প্রশিক্ষণে পাঠাতে হবে। তাদের ব্যাচভিত্তিক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর এ নির্দেশনা আলোচনার পর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পর্যালোচনা সভায় সিদ্ধান্ত হয় ব্যাচভিত্তিক বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ দেওয়ার দায়িত্ব পালন করবে সিপিটি অনুবিভাগ। বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ শেষ করে কাজে যোগদান করানোর বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য সব ক্যাডার নিয়ন্ত্রণকারী মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

কর্মকর্তাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা আমলে নিয়ে তাদের প্রশিক্ষণে পাঠানো এবং পদায়ন করতে নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। কর্মকর্তাদের পদায়নের ক্ষেত্রে তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণ প্রবণতা বিবেচনায় নিয়ে পদায়নের জন্য এপিডি অনুবিভাগকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। 

কর্মকর্তাদের বিশেষায়িত দক্ষতা বাড়ানোর জন্য বিশে^র বিভিন্ন নামকরা বিশ^বিদ্যালয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে তিনি মেধাবী কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ একাডেমিতে পদায়নের তাগিদ দিয়েছেন।  প্রশিক্ষণ একাডেমিতে কাজের আগ্রহ বৃদ্ধির জন্য প্রণোদনা বৃদ্ধির মাধ্যমে পদায়নকে আকর্ষণীয় করার নির্দেশ দেন তিনি। দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য উপসচিব, যুগ্মসচিব ও অতিরিক্ত সচিবদের বিশে^র নামকরা বিশ^বিদ্যালয় ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে পাঠানোর জন্য জনপ্রশাসনের এপিডি অনুবিভাগকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে পদায়নে আগ্রহী কর্মকর্তাদের তালিকা করার জন্যও এপিডি অনুবিভাগকে বলা হয়েছে। আর কর্মকর্তাদের প্রণোদনা বৃদ্ধির বিষয়ে প্রস্তাবনা তৈরির জন্য সিপিটি অনুবিভাগকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী কর্মকর্তাদের ক্যারিয়ার প্ল্যানিং অনুসরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। অর্থাৎ যে কর্মকর্তা যে বিষয়ে আগ্রহী তাকে সেই বিষয়ে পদায়ন করতে হবে। যে কর্মকর্তা যে বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন তাকে সেই বিষয়ে কাজ করতে অগ্রাধিকার দিতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর এ নির্দেশনা নিয়ে এরই মধ্যে কাজ শুরু হয়েছে। ক্যারিয়ার প্ল্যানিংয়ের খসড়া তৈরি করেছে জনপ্রশাসনের সিপিটি অনুবিভাগ। 

প্রধানমন্ত্রী কর্মকর্তাদের চাহিদাভিত্তিক প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। একই বিষয়ে খ- খ- প্রশিক্ষণ পরিহার করে সমন্বিত প্রশিক্ষণের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। প্রশিক্ষণ কেন্দ্র সুন্দর ও প্রাকৃতিক মনোরম পরিবেশে গড়ে তোলার জন্য তিনি নির্দেশনা দিয়েছেন। এ নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্য সব প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণকারী মন্ত্রণালয়কে জানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এ বিষয়ে কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য প্রধানমন্ত্রীর এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী যুগোপযোগী প্রশিক্ষণের জন্য কক্সবাজারে ৩০০ একর জমির ওপর সিঙ্গাপুরের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের  মতো আন্তর্জাতিক মানের বঙ্গবন্ধু সিভিল সার্ভিস প্রশিক্ষণ একাডেমি নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছেন। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে এ সংক্রান্ত ধারণাপত্র তৈরির জন্য উন্নয়ন অধিশাখাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়কের সঙ্গে আলোচনা করে এ ধারণাপত্র তৈরি করার কথা বলা হয়েছে।

সরকারি কর্মচারীদের প্রতিবন্ধী সন্তানদের পুনর্বাসনের জন্য একটি প্রস্তাব দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এ বিষয়ে একটি ধারণাপত্র প্রস্তুতের জন্য সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং অর্থ বিভাগকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বিষয়টির সমন্বয় করার জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিবকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসক ও নার্সের অনুপাত সামঞ্জস্যপূর্ণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগ কাজ শুরু করেছে বলে বৈঠকে জানানো হয়।

সরকারের বিরুদ্ধে কোনো মামলায় স্থগিতাদেশ হলে তা দ্রুত ভ্যাকেট করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আইন অনুবিভাগ দায়িত্ব পালন করছে বলে বৈঠকে জানানো হয়।  

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত