বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে বাংলা নতুন বছরকে বরণ করে নিয়েছে সর্বস্তরের মানুষ। গত রবিবার পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানমালার মধ্যে ছিল অপশক্তি বিনাশের ঐতিহ্যবাহী মঙ্গল শোভাযাত্রা, নাচ, গান, কথামালা, আবৃত্তি, গ্রামীণ মেলা ইত্যাদি। পাশাপাশি ফেনীর সোনাগাজীর নুসরাত হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদও জানানো হয়। ব্যুরো, নিজস্ব প্রতিবেদক, প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর
চট্টগ্রাম : বন্দরনগরী জুড়ে ছিল উৎসবের আমেজ। মঙ্গল শোভাযাত্রায় নানা প্রতিকৃতির মধ্য দিয়ে চট্টগ্রামের ঐতিহ্য কর্ণফুলী নদীর বিপন্নতাকে তুলে ধরা হয়। ডিসি হিলে দিনভর চলে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের পরিবেশনায় গান, নৃত্য, আবৃত্তি, অভিনয়সহ নানা অনুষ্ঠান।
খুলনা : বিভাগীয় জাদুঘর চত্বরের বকুলতলায় বৈশাখী গানের মধ্য দিয়ে দিবসের সূচনা করা হয়। পরে নগরীর শিববাড়ী মোড়ে বেলুন ও ফেস্টুন উড়িয়ে মঙ্গল শোভাযাত্রার উদ্বোধন করেন শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ান। এতে খুলনা সিটি করপোরেশনের মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক, বিভাগীয় কমিশনার লোকমান হোসেন মিয়া, পুলিশ কমিশনার খন্দকার লুৎফুল কবির প্রমুখ অংশগ্রহণ করেন।
রাজশাহী : সকালে বৈশাখের বর্ণিল সাজে মেতে ওঠে রাজশাহী। রাজশাহী জেলা প্রশাসন, রাজশাহী কলেজ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর, শহীদ কামারুজ্জামান কেন্দ্রীয় উদ্যান ও জিয়া পার্কে অন্যান্য দিনের তুলনায় দর্শনার্থীর সংখ্যা বেশি ছিল।
বরিশাল : ব্রজমোহন বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে কয়েক হাজার মানুষ পরস্পরের হাতে রাখি পরিয়ে অশুভ শক্তির বিনাশ কামনায় জাতীয় সংগীতে কণ্ঠ মেলান। পরে শুরু হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা। এরপর কাঠি হাতে ঢাক উদ্বোধন করেন সাবেক সাংসদ তালুকদার মো. ইউনুস, শেখ মো. টিপু সুলতান, বিভাগীয় কমিশনার রাম চন্দ্র দাস, জেলা প্রশাসক এসএম অজিয়র রহমান।
গাজীপুর : জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে রাজবাড়ী মাঠে বর্ষবরণ সংগীতানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। পরে মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশ নেন জেলা প্রশাসক ড. দেওয়ান মুহাম্মদ হুমায়ূন কবীর ও পুলিশ সুপার শামসুন্নাহার। গাজীপুর ক্লাব লিমিটেডের অনুষ্ঠানমালায় প্রধান অতিথি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক এমপি।
ময়মনসিংহ : নগরীর মুকুল নিকেতন উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে থেকে শুরু হওয়া মঙ্গল শোভাযাত্রার উদ্বোধন করেন সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ। শোভাযাত্রাটি নগরীর প্রধান প্রধান সড়ক ঘুরে শেষ হয় জয়নুল উদ্যানের বৈশাখী মঞ্চে।
গোপালগঞ্জ : পোশাক-পরিচ্ছদ, খাওয়া-দাওয়া, গান-বাজনা সবকিছুতেই প্রাধান্য পায় বাঙালিয়ানা। পৌর পার্ক থেকে শুরু হয় বৈশাখী শোভাযাত্রা। বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খ- খ- নিজস্ব শোভাযাত্রা নিয়ে জেলা প্রশাসন আয়োজিত বৈশাখী শোভাযাত্রার সঙ্গে মিলিত হয়।
জামালপুর : সূর্যোদয়ের সঙ্গে ডিসি পার্কে সানাইয়ের সুরে নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়া হয়। পরে বকুলতলা মোড় থেকে বের করা হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা। সদর আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোজাফফর হোসেন, জেলা প্রশাসক আহমেদ কবীর, পুলিশ সুপার দেলোয়ার হোসেন এতে অংশগ্রহণ করে।
ফেনী : সকালে ফেনী সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ থেকে শোভাযাত্রা বের হয়ে শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে শহীদ মিনার চত্বরে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে সংক্ষিপ্ত আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেয় হাজারো মানুষ।
চুয়াডাঙ্গা : সকাল ৮টায় চাঁদমারী মাঠ থেকে একটি মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করা হয়। শোভাযাত্রাটি শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজ মাঠে গিয়ে শেষ হয়।
ঝিনাইদহ : শহরের ওয়াজির আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠ থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করা হয়। র্যালিটি শহরের প্রধান প্রধান সড়ক ঘুরে একই স্থানে এসে শেষ হয়। র্যালিতে ঝিনাইদহ-১ আসনের সংসদ সদস্য, জেলা প্রশাসক সরোজ কুমার নাথ, পুলিশ সুপার হাসানুজ্জামানসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেয়।
জয়পুরহাট : মঙ্গল শোভাযাত্রা শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে জেলা প্রশাসন চত্বরে গিয়ে শেষ হয়। এতে অংশ নেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাকির হোসেন, পুলিশ সুপার রশিদুল হাসানসহ জেলার রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীরা।
সাতক্ষীরা : সকাল ৬টা ৪৫ মিনিটে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের হয়। এতে সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাঙালিয়ানা সাজ ও হারিয়ে যাওয়া গ্রামীণ লোকজ ঐতিহ্য নিয়ে অংশ নেয়।
লক্ষ্মীপুর : ফেনীর নুসরাত রাফী হত্যাকা-ের মূল হোতা মাদ্রাসা অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা ও লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জের শিশু নুশরাত হত্যাকারী শাহ আলম রুবেলের ফাঁসির দাবির মধ্য দিয়ে পালিত হয়েছে বর্ষবরণের আয়োজন।
মাগুরা : শহরের নোমানী ময়দান থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের হয়। এতে অংশ নেন সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও মাগুরা-২ আসনের সংসদ সদস্য ড. বীরেন শিকদার, জেলা প্রশাসক আলী আকবর, পুলিশ সুপার খান মুহাম্মদ রেজোয়ান প্রমুখ।
নওগাঁ : মঙ্গল শোভাযাত্রা শহরের জিলা স্কুল চত্বর থেকে বের হয়ে শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে। এতে নেতৃত্ব দেন সদর আসনের এমপি নিজাম উদ্দিন জলিল জন।
পঞ্চগড় : কালেক্টরেট আদর্শ শিক্ষা নিকেতন চত্বর থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের হয়। এতে বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের সদস্যরা পালকি, গরুর গাড়ি, নৌকা, নাপিত, কবিরাজ, ডাক্তার, দই বিক্রেতা, হোমিও চিকিৎসক, মাছ, প্রজাপতি, সাপুড়িয়া, গ্রামীণ বধূ, বেদে, হাতপাখা, বর-কনে, লাঙল-জোয়াল, খড়ের গাদা, আদিম মানুষ, পাথর শ্রমিক, চা শ্রমিকসহ নানান পোশাকে ও ঢঙে অংশ নেয়।
সাতক্ষীরা : মঙ্গল শোভাযাত্রাটি শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে সাতক্ষীরা শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্কে বৈশাখী মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মিলিত হয়। এ ছাড়া ছিল হাঁস ধরা, সাঁতার প্রতিযোগিতা, হাডুডু খেলা, লাঠিখেলা, মোরগ লড়াই, সংগীত প্রতিযোগিতা ইত্যাদি।
শরীয়তপুর : সদর উপজেলা চত্বর থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের হয়ে শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে শরীয়তপুর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার সংলগ্ন শরীয়তপুর পৌরসভার অডিটোরিয়ামের সামনে গিয়ে শেষ হয়।
ঠাকুরগাঁও : জজকোর্ট বটমূল চত্বরে অনুষ্ঠিত হয় প্রভাতি অনুষ্ঠান। রবীন্দ্র, নজরুল, ভাওয়াইয়া, পল্লীগীতি, আঞ্চলিক গান ছাড়াও পরিবেশিত হয় কবিতা আবৃত্তি।
নীলফামারী : জেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মঙ্গল শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে সূচনা ঘটে দিনটির। এ ছাড়া ছিল ঐতিহ্যবাহী বাঙালি খাবার পরিবেশন, গ্রামীণ মেলা ও শিশু আনন্দ মেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
সিরাজগঞ্জ : মঙ্গল শোভাযাত্রায় বাঙালি সংস্কৃতির পরিচয় বহনকারী মাথাল, কলসি, চালন, কুলা, একতারা, মাছ, পালকি, ঘুড়ি, চরকি ও বর-বউ সাজসহ বিভিন্ন প্রতীক নিয়ে স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীরা অংশগ্রহণ করে।
যশোর : সকাল ৬টা ১ মিনিটে পৌর উদ্যানে উদীচী যশোরের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শুরু হয়। ভৈরবী সুরে সেই চিরায়ত এসো হে বৈশাখ সংগীতে স্বাগত জানানো হয় নববর্ষের প্রথম সকালকে। পরে শুরু হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা।
ভোলা : অফিসার্স ক্লাবে ছিল প্রভাতি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও পান্তা উৎসবের আয়োজন। পরে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনে থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের হয়। এতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেয়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া : ভোর থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত শহরের শতাধিক স্থানে বর্ণাঢ্য আর ব্যাপক আয়োজনে নতুন বছরকে বরণ করে নেয় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষ। সকালে শহরের লোকনাথ টেংকের পাড় থেকে হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে একটি আনন্দ র্যালি শহর প্রদক্ষিণ করে।
হবিগঞ্জ : খেলাঘর আসরের আয়োজনে শিরীষতলায় নববর্ষের সূর্যকে বরণ করা হয়। পায়রা উড়িয়ে এর উদ্বোধন করেন সংসদ সদস্য আবু জাহির। এ সময় উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক মাহমুদুল কবীর মুরাদ ও পুলিশ সুপার মোহাম্মদ উল্লাহ।
নাটোর : শহরের কানাইখালী মাঠ থেকে নাটোর-২ আসনের সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম শিমুলের নেতৃত্বে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করা হয়। বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে নাটোর রানী ভবানীর রাজবাড়ি চত্বরে গিয়ে শেষ হয়। পরে মঞ্চে ছিল গ্রামবাংলার গান, নাচ ও নতুন বছরকে বরণ করে নিতে মনোজ্ঞ অনুষ্ঠান।
সোনাগাজী (ফেনী) : যেদিন নুসরাত হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হবে, সেদিন তারা নববর্ষের উৎসবের চেয়েও বেশি আনন্দিত হবেন। নুসরাতের শোককে শক্তিতে পরিণত করার প্রত্যয়ে হাজারো সোনাগাজীবাসী নববর্ষের উৎসবে শামিল হয়। নতুন বছরের প্রথম দিনে সবাই নুসরাত হত্যার প্রতিবাদ জানিয়েছে।
জাবি : নববর্ষের আগের রাতে এক ছাত্রের মৃত্যুতে ম্লান হয়ে গেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) পহেলা বৈশাখ পালন উৎসব। বাতিল হয়ে যায় মঙ্গল শোভাযাত্রাসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান।
এ ছাড়া বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় বিভিন্ন আয়োজনের মধ্য দিয়ে নতুন বছরকে বরণ করে। পহেলা বৈশাখ উদযাপনের আরও খবর এসেছে কিশোরগঞ্জের ভৈরব, কুমিল্লার দাউদকান্দি, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া, গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া, দিনাজপুরের হাকিমপুর, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ, লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ ও নরসিংদীর মনোহরদী থেকে। এর বাইরে বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও পৃথকভাবে আলোচনা সভা, গ্রামীণ মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নববর্ষ পালন করে।
