হওয়ার কথা ছিল ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার, হয়েছে বিজিএমইএ ভবন

রেলওয়ের কাছে ৪৪ কোটি টাকা ফেরতের আবদার ইপিবির

আপডেট : ১৬ এপ্রিল ২০১৯, ১১:৩০ পিএম

রাজধানীর কারওয়ান বাজারের হাতিরঝিল প্রকল্পের ভেতরের যে জমিতে তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ ভবন নির্মাণ করা হয়েছে, সেই জমিটি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা বা ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার নির্মাণের কথা বলে বাংলাদেশ রেলওয়ের কাছ থেকে কিনে নিয়েছিল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্রতিষ্ঠান রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)। বিজিএমইএ সেই জমি কিনে নেওয়ার কথা বললেও মালিকানার স্বত্ব দেখাতে পারেনি আদালতে। অন্যদিকে, জমি বেহাত হওয়ার পর জমির দাম বাবদ রেলওয়েকে পরিশোধ করা অর্থ সুদাসলে ফেরত চাচ্ছে ইপিবি। 

১৯১০ সাল থেকে ওই জমির মালিকানা ছিল বাংলাদেশ রেলওয়ের। ৪৪ কোটি টাকা ব্যয়ে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা নির্মাণের জন্য রেলওয়ের কাছ থেকে ২০০৬ সালে কিনে নেয় ইপিবি। অন্যদিকে রেলওয়ের কাছ থেকে রেজিস্ট্রেশন করে মালিকানা স্বত্ব পাওয়ার আগেই ইপিবির কাছ থেকে জমিটি নিয়ে ভবন নির্মাণ করে ফেলেন পোশাক মালিকরা। পোশাক মালিকরা দাবি করেন, সরকারের অনুমোদন ইপিবির কাছ থেকে পাঁচ কোটি ১৭ লাখ টাকায় জমিটি কিনে নেয় তারা। তবে মালিকানা স্বত্ব আদালতে দেখাতে পারেনি পোশাক মালিকদের সংগঠনটি। সরকার পরে হাতিরঝিলের উন্নয়নে সমন্বিত প্রকল্প হাতে নিলে ওই জমি প্রকল্প এলাকাভুক্ত হয়। এখন ইপিবি বলছে, জমিটি হাতিরঝিল প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় জমির দাম বাবদ দেওয়া অর্থের সঙ্গে রেজিস্ট্রেশন খরচ সুদসহ ফেরত দিতে হবে রেলওয়েকে।

উচ্চ আদালত বিজিএমইএ ভবনকে হাতিরঝিল প্রকল্পের ‘ক্যানসার’ হিসেবে উল্লেখ করে চলতি বছরের ১২ এপ্রিলের মধ্যে ভেঙে ফেলার নির্দেশ দিয়েছেন। এরই মধ্যে বিজিএমইএ উত্তরায় নির্মাণাধীন নতুন কমপ্লেক্সে কার্যালয় স্থানান্তর করেছে। গতকাল কারওয়ান বাজারের বিজিএমইএ ভবনে থাকা অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো বিকেল ৫টার মধ্যে মালামাল সরিয়ে নেওয়ার পর সিলগালা করে দিয়েছে রাজধানী উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষ (রাজউক)। রাজউক বলছে, তারা ভবনটি ভাঙার কাজ শুরু করেছে।

২০১৬ সালে ইপিবির ১৩৪তম বোর্ড সভায় রেলওয়ের কাছ থেকে সুদাসলে টাকা ফেরত নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ওই বোর্ড সভার কার্যবিবরণী বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্র নির্মাণের জন্য রেলওয়ের কাছ থেকে ৫ দশমিক ৫৬ একর জমি কিনে নেয় ইপিবি। এ জন্য রেলওয়েকে জমির দাম বাবদ ইপিবি পরিশোধ করেছে ৪৩ কোটি ৫৬ লাখ ৮৬ হাজার ২৭৪ টাকা। এ ছাড়া জমিটি রেজিস্ট্রেশন করতে ইপিবির আরও অর্থ ব্যয় হয়েছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা গতকাল দেশ রূপান্তরকে ইপিবির বোর্ডসভার কার্যবিবরণী দেখিয়ে বলেন, জমিটি হাতিরঝিল সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কারণে যেহেতু ইপিবি ওই জমি ব্যবহার করতে পারবে না, তাই রেলওয়ের কাছ থেকে পরিশোধ করা অর্থ ফেরত আনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ জন্য ইপিবির মহাপরিচালক-১কে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওই কমিটি কয়েকটি সভা করলেও এখনো রেল থেকে অর্থ ফেরত পায়নি ইপিবি।

বিজিএমইএ ভবন নিয়ে হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়, ১৯১০ সালের পর বিজিএমইএ ভবনের জমিটি রেলওয়ের জন্য অধিগ্রহণ করা হয়। ২০০৬ সালে জমিটি ইপিবিকে হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু বিজিএমইএ কর্র্তৃপক্ষ রাজউকে যে দলিল উপস্থাপন করেছে, তাতে ২০০১ সালে জমিটি নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ইপিবি কীভাবে বিজিএমইএকে জমিটি দিল। কারণ ২০০১ সালে ইপিবি ওই জমির মালিক ছিল না। স্বীকৃতভাবে এই জায়গা ছিল জলাশয়, যা বেআইনি ও অপরাধমূলকভাবে ভরাট করা হয়েছে। জমির মালিক বিজিএমইএ হলেও জলাধার আইন অনুসারে ভবন নির্মাণ করতে পারত না।

আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, বিজিএমইএ ভবন নিয়ে বহু জালিয়াতি হয়েছে। এর পেছনে একটি অপরাধী চক্র জড়িত থাকতে পারে। এটি ভূমি দখলের মতো একটি ঘটনা। রাজউকের কাছে পাঠানো দরখাস্তে জমি ক্রয়ের সাব-কবলা দলিল সংযুক্ত করার কথা বলা হলেও তা পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া বিজিএমইএ তাদের প্রধান কার্যালয় নির্মাণের জন্য ১৯৯৮ সালে জায়গাটি নির্ধারণ করে। ওই বছরের ২৮ নভেম্বর ভবনটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। তারা রাজউকে যে কাগজপত্র দাখিল করেছে, এতে দেখা যায়, জায়গাটি ইপিবির কাছ থেকে কেনা। অথচ ২০০৬ সাল পর্যন্ত এর মালিক ছিল বাংলাদেশ রেলওয়ে। পর্যবেক্ষণে উচ্চ আদালত উল্লেখ করেন, কী করে এসব সম্ভব হলো, তা তদন্ত করে দেখা দরকার।

১৯৯৮ সালের ২৮ নভেম্বর তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কারওয়ান বাজারে দুই বিঘা জমির ওপর বিজিএমইএ কমপ্লেক্স নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ১৬ তলা ভবন নির্মাণ শেষ হলে ২০১৬ সালের ৮ অক্টোবর তখনকার প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ভবনটি উদ্বোধন করেন। তখন থেকেই ১৬ তলা ভবনটির চতুর্থ ও পঞ্চম তলা নিজেদের অফিস হিসেবে ব্যবহার করছে সংগঠনটি। বাকি ফ্লোরগুলো একটি ব্যাংক ও বিভিন্ন পোশাক মালিকদের কাছে অফিস হিসেবে বিক্রি করা হয়।   

১৯৯৮ সালের ২৮ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিজিএমইএ ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ভবন নির্মাণ শেষ হলে ২০০৬ সালের ৮ অক্টোবর বিজিএমইএ ভবন উদ্বোধন করেন সে সময়কার প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। এরপর থেকে ভবনটি বিজিএমইএর প্রধান কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ভবনটি নির্মাণে রাজউকের অনুমোদন ছিল না। ২০১০ সালে এ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ হলে হাইকোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রুল জারি করে। ২০১১ সালের এপ্রিল মাসে হাইকোর্ট এক রায়ে ভবনটিকে হাতিরঝিল প্রকল্পের ‘ক্যানসার’ হিসেবে উল্লেখ করে ছয় মাসের মধ্যে ভবন ভেঙে ফেলে ভবন নির্মাণের আগে জমি যে অবস্থায় ছিল, সে অবস্থায় নেওয়ার রায় দেয়। পরে বিজিএমইএ লিভ টু আপিল করলে ২০১৬ সালে তা খারিজ হয়ে যায়। তারপর থেকে তৃতীয় দফা আবেদন করে ভবন ভাঙার জন্য সময় চাইলে ২০১৮ সালের ১০ এপ্রিল উচ্চ আদালত ২০১৯ সালের ১২ এপ্রিল পর্যন্ত সময় দেয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত