যদি ইংরেজিতে আপনার দক্ষতা থাকে, আইটি সেক্টর সম্পর্কেও ভালো ধারণা রাখেন এবং যদি কথা বলতে পারেন গুছিয়ে, তবে আর দেরি কেন? সিভি নিয়ে ঢুঁ মারতে পারেন আগামীকাল শুরু হতে যাওয়া চতুর্থ বিপিও সম্মেলনে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং বা বিপিও খাতের অবস্থানকে তুলে ধরার লক্ষ্যে শুরু হচ্ছে ‘বিপিও সামিট বাংলাদেশ ২০১৯’ শীর্ষক সম্মেলন। রাজধানীর প্যানপ্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে দুদিনব্যাপী (২১ ও ২২ এপ্রিল) এই সম্মেলনে অনস্পট অন্তত ৮০০ জনকে চাকরি দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে আয়োজনকারীরা।
বিপিও কী?
দীর্ঘদিন ধরেই বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে দেশের প্রথম খাত হিসেবে তৈরি পোশাকশিল্প প্রধান ভূমিকা রাখছে। তবে আধুনিক যোগাযোগ প্রযুক্তির এই হাল আমলে এখন কেবল তৈরি পোশাক রপ্তানি করেই বিশ্ববাজারে টেকা যাবে না। তাই প্রযুক্তির উৎকর্ষের সঙ্গে সঙ্গে পাল্টেছে পেশার ধরনও। এমনই এক পেশা বিপিও। এ খাতে বিশ্বের বর্তমান বাজার ৫০০ বিলিয়ন ডলার। যেখানে বাংলাদেশ মাত্র ১৮০ মিলিয়ন ডলার আয় করতে পারছে।
তবে, উন্নত বিশ্ব বিশেষ করে জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও কোরিয়ায় শ্রমশক্তি হ্রাস পাওয়ায় বাংলাদেশের জন্য দরজা খুলে গেছে। ২০২১ সালের মধ্যেই বাংলাদেশ ১ বিলিয়ন ডলার আয় করতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিপিও মানে বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং। এই নামটা বিশ^জুড়ে এখন খুব পরিচিত। আউটসোর্সিং বলতে কেবল কল সেন্টার আউটসোর্সিং নয়। টেলিকমিউনিকেশন, ব্যাংক, বীমা, হাসপাতাল, হোটেলের ব্যাক অফিসের কাজ, এইচআর, আইটি অ্যাকাউন্ট সবকিছুই এর অন্তর্ভুক্ত। এসব কাজ আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে করার বিষয়টি সাধারণভাবে বিপিও বলে পরিচিত।
বিশ্বের সবচেয়ে ক্রমবর্ধমান ইন্ডাস্ট্রি এখন বিপিও খাত। আইসিটিতে বর্তমানে বাংলাদেশের যে পরিবর্তনের গল্প, তার উল্লেখযোগ্য অবদান হচ্ছে বিপিও খাতের। সরকার আইটি সেক্টর থেকে ২০২১ সাল নাগাদ ৫ বিলিয়ন ডলার আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, আশা করা যায় সিংহভাগই আসবে বিপিও থেকে। তাই সরকারি উদ্যোগে এসইআইপি প্রজেক্টের আওতায় বিপিও খাতে প্রশিক্ষণও দেওয়া হচ্ছে। আগ্রহীরা এখানে বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ তো নেবেই উপরন্তু তাদেরকে ভাতা প্রদানেরও ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশে বিপিওর যাত্রা
দেশে কল সেন্টার ও ডাটা এন্ট্রির মাধ্যমে প্রথম বিপিও ধারাটির সূচনা ঘটে। প্রথমে ছোট আকারে শুরু হয়েছিল। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় এখন এটি বেশ বড় আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে গত কয়েক বছরে সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ ধারণাটির পৃষ্ঠপোষকতা করার কারণে এ ব্যাপারে নতুন একটি জাগরণ তৈরি হয়েছে। তাই বাংলাদেশে বিপিও একটি নতুন সম্ভাবনার নাম। কারণ বাংলাদেশে বিপিও ব্যবসার প্রবৃদ্ধি বছরে শতকরা ১০০ ভাগের বেশি। এবারের বিপিও সম্মেলনে কেবল জনবল নিয়োগই নয়, আড়াই মাসের বিনামূল্যে স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রশিক্ষণের নিবন্ধন করা যাবে। যারা সদ্য পড়াশোনা শেষ করেছেন, তাদের জন্য চাকরিতে ঢোকার আগে এই প্রশিক্ষণ অনেক উপকারী। প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে প্রায় পাঁচ হাজার তরুণকে। ২০১৬ সালে সরাসরি সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে বিপিও সম্মেলন থেকে কল সেন্টারসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে চাকরি পেয়েছেন তিন শতাধিক শিক্ষার্থী। ২০১৫ সালে প্রথম বিপিও সম্মেলন থেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি পেয়েছিলেন ২৩৫ জন শিক্ষার্থী।
সম্ভাবনা কতটুকু?
বিষয়টি স্পষ্ট যে বিপিও খাতে একটি বিশাল বাজার পড়ে আছে। এখন যদি বাংলাদেশ এই খাতে নজর দেয়, তাহলে তৈরি পোশাকশিল্পের পরই বিপিও হবে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সবচেয়ে বড় খাত। এখন প্রয়োজন বিপিওকে তরুণ প্রজন্মের কাছে আরও জনপ্রিয় করা। কারণ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও জাপানে এই মুহূর্তে প্রোগ্রামার প্রয়োজন প্রায় ২০ লাখ। আগামী ৫ বছরে ২০ লাখ প্রোগ্রামার কোডার-এর প্রয়োজন হবে জাপান, ইউরোপ ও আমেরিকায়।
কিন্তু তাদের সেই জনগোষ্ঠী নেই। জাপানে ৫০ শতাংশ মানুষের বয়স ৫০-এর ঊর্ধ্বে। ইউরোপ, আমেরিকাতেও তাদের তরুণ প্রজন্মের সংকট বিরাজ করছে। আমাদের দেশের জনবলের ৬৫ শতাংশই তরুণ। বাংলাদেশ যদি তার বিপুল সংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠীকে সঠিক প্রশিক্ষণ দিতে পারে তাহলে আগামী ৫ বছরে ইউরোপ, আমেরিকা, জাপানের বাজার আমাদের তরুণরাই নিয়ন্ত্রণ করবে।
বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় দুই লাখ ৫০ হাজার শিক্ষার্থী স্নাতক ডিগ্রি লাভ করছে। এদের বিরাট অংশ বিপিও সেক্টরে কাজ করতে পারে। যে কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতার মানুষ এখানে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। এই খাতে যারা কাজ করবেন, তাদের মাত্র দুটি যোগ্যতা থাকা দরকার। প্রথম যোগ্যতা হলো- শেখার মানসিকতা আর দ্বিতীয়টি হলো- যোগাযোগের দক্ষতা।
২০০৯ সালে দেশে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের আয় ছিল মাত্র ২৬ মিলিয়ন ডলার। বর্তমানে বিপিও সেক্টরে অর্ধ লক্ষাধিক লোক কাজ করছে। ২০২১ সালের মধ্যে এ খাতে কয়েক লাখ লোক কাজ করবে। বিপিও খাতে আয় যত বাড়বে, দেশ অর্থনৈতিকভাবে ততই এগিয়ে যাবে। তরুণদের উচ্চতর প্রশিক্ষণ দিয়ে তথ্যপ্রযুক্তির বিভিন্ন খাতে কাজে লাগাতে হবে। দেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য পোশাক খাতের চেয়ে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে আয় কয়েকগুণ বেশি হওয়ায় ভবিষ্যতে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আইনজীবীর পাশাপাশি বিপিও খাতকে পেশা হিসেবে বেছে নেবে তরুণরা।
ভালো করার সুযোগ আছে যাদের
বিপিও সেক্টরে দেশের যেকোনো জায়গায় বসে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। যে কোনো বয়সের মানুষই এই কাজ করতে সক্ষম। এই খাতে দুই ধরনের কাজ হয়ে থাকে। একটি হলো ভয়েসের মাধ্যমে, অন্যটি লিখিত কাজ। বর্তমানে বাংলাদেশে ভয়েসের মাধ্যমেই বেশি কাজ করা হচ্ছে। যারা বিপিওতে ভয়েসের মাধ্যমে কাজ করে তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতার ধরাবাধা কোনো নিয়ম নেই। এখানে অল্প শিক্ষিতরাও কাজ করতে পারে। আর যারা লিখিত বিষয় নিয়ে কাজ কওে, তারা শিক্ষিত হলে এগিয়ে যাওয়ার ভালো সম্ভাবনা রয়েছে। এরই মধ্যে দেশের শিক্ষার্থীরা বুঝতে সক্ষম হয়েছে, বিপিও কী, এখানে কাজের সম্ভাবনা কতটুকু। অনেকেরই ধারণা ছিল, বিপিও মানেই কল সেন্টার। এই ভুল ধারণাটি গত কয়েক বছরের প্রচারে অনেকটাই দূর হয়েছে।
বিপিওতে যারা কাজ করছে, তাদের স্কিল ডেভেলপমেন্টের জন্য প্রতিটি প্রতিষ্ঠানই প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের জন্যও যে কেউ নিজেকে প্রস্তুত করতে পারছে। এ জন্য এখন যারা বিপিওতে কাজ করছেন, তাদের গ্রাহকদের সন্তুষ্টি অর্জন করতে হবে। না হলে নতুন কাজ সৃষ্টি হবে না।
বিপিও কাজের ধরন বা কলসেন্টারের ধরন এবং তারা যে সেবা দেয় তার ওপর মূলত নির্ভর করে আবেদনকারীর শিক্ষাগত ও অন্যান্য যোগ্যতা। কলসেন্টারের বেশির ভাগ কাজই খ-কালীন। তবে পাশাপাশি পূর্ণকালীন কাজের জন্যও কলসেন্টারগুলোতে প্রচুর লোকবল নিয়োগ দেওয়া হয়ে থাকে। আর তাই কলসেন্টারে খন্ডকালীন ও পূর্ণকালীন চাকরির জন্য যোগ্যতাগুলোও হয় ভিন্ন।
যা জানা জরুরি
বিপিও খাতে দুই ধরনের কাজ হয়ে থাকে। একটি স্থানীয়, অন্যটি আন্তর্জাতিক। আন্তর্জাতিক বাজারে কাজের জন্য অবশ্যই ভালো ইংরেজি জানা প্রয়োজন। আর স্থানীয় বাজারে কাজের জন্য ভালো বাংলা জানতে হবে। তবে সমস্যা হচ্ছে, শুদ্ধভাবে বাংলা বলতে পারে এমন চাকরিপ্রত্যাশীর সংখ্যা অনেক কম। কিন্তু ঠিকঠাক বাংলা বলতে পারলেই এ খাতে চাকরি করা সম্ভব। আর কম্পিউটারের বেসিক জ্ঞান তো থাকতেই হবে। খন্ডকালীন চাকরির জন্য আবেদন করতে আবেদনকারীকে বিশ্ববিদ্যালয় অথবা কলেজে অনার্স বা ডিগ্রি পড়ুয়া হতে হবে। পূর্ণকালীন চাকরি করতে আবেদনকারীকে কমপক্ষে স্নাতক হতে হবে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে কাজের কোনো অভিজ্ঞতা থাকলে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। শিক্ষাগত যোগ্যতার পাশাপাশি আবেদনকারীকে শুদ্ধ করে বাংলা ও ইংরেজিতে কথা বলা, সুন্দর উপস্থাপনা, কম্পিউটার ব্যবহার সম্পর্কে মৌলিক ধারণা থাকা, স্মার্টনেস, উপস্থিত বুদ্ধি, বুদ্ধিমত্তা ইত্যাদি বাড়তি যোগ্যতা থাকা দরকার। যদি সুনির্দিষ্ট একটি পরিকল্পনার আওতায় এই কাজ এগিয়ে যায় তবে অল্প সময়ের মধ্যেই বিশ্ববাজারে আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে বাংলাদেশ।
এবারের সম্মেলন
গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ের আইসিটি টাওয়ারের তথ্য ও প্রযুক্তি অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে সংবাদ সম্মেলন করে আয়োজন এবারের আয়োজন সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। দুই দিনব্যাপী বিপিও সম্মেলনের আয়োজন করছে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কলসেন্টার অ্যান্ড আউটসোর্সিং (বাক্য) এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তর। আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, দুদিনের আয়োজনে দেশি-বিদেশি তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, সরকারের নীতিনির্ধারক, গবেষক, শিক্ষার্থী এবং বিপিও খাতের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা অংশ নেবেন। সংবাদ সম্মেলনের প্রধান অতিথি ছিলেন তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের সচিব এন এম জিয়াউল আলম। তিনি বলেন, তরুণদের কাছে দেশের প্রযুক্তি খাতকে তুলে ধরার জন্য এ আয়োজন করা হয়েছে। গত তিনবারের চেয়ে এবারের বিপিও সামিট আরও বড় পরিসরে আয়োজন করা হয়েছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এ বি এম আরশাদ হোসেন বলেন, সারা বিশে^ বিপিওর বড় বাজার রয়েছে। দেশেও খাতটিতে ব্যাপক কাজ শুরু হয়েছে। এবারের সম্মেলনের মাধ্যমে দক্ষ তরুণদেরকে খুঁজে বের করা হবে। এবারের বিপিও সামিটে ১৩টি সেমিনার ও কর্মশালা অনুষ্ঠিত হবে। দুই দিনের মূল্য আয়োজনের আগে ৩০টি বিশ^বিদ্যালয়ের অ্যাক্টিভেশন কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হবে। এবারের সম্মেলন আয়োজনে অংশীদার হিসেবে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস), বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি (বিসিএস), বাংলাদেশ উইমেন ইন টেকনোলজি (বিডব্লিউআইটি), আইএসপি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (আইএসপিএবি), বাংলাদেশ মোবাইল ফোন ইমপোর্টারস অ্যাসোসিয়েশন (বিএমপিআইএ) ইত্যাদি।
