প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পেও দুর্নীতি

আপডেট : ২০ এপ্রিল ২০১৯, ০১:৫৬ এএম

ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলায় ‘যার জমি আছে ঘর নাই, তার নিজ জমিতে ঘর নির্মাণ’ প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পে ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এসব ঘর পেতে প্রত্যেককে ১০ হাজার টাকা করে ঘুষ দিতে হয়েছে। এদিকে নির্মাণের কয়েক মাসের মধ্যেই অনেকের ঘর বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ঘর নির্মাণের সময় সরকার যে বরাদ্দ দিয়েছিল, সেখান থেকেও টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ উঠেছে।

প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্প-২-এর আওতায় বোয়ালমারী উপজেলায় ২ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে সুবিধাভোগী ২২৫ জনের একটি চূড়ান্ত তালিকার অনুমোদন দেওয়া হয় গত বছর ২৫ মে। তার আগে প্রথম দফায় আরও ১৪৬ জনকে এ প্রকল্পের আওতায় ঘর তুলে দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে এ প্রকল্পের আওতায় উপজেলায় ৩৭১টি ঘর নির্মাণ করা হয়। প্রতিটি ঘর নির্মাণে সরকারি বরাদ্দ ছিল ১ লাখ টাকা।

প্রকল্পের নির্মাণ তথ্য অনুযায়ী, ১২ ফুট দৈর্ঘ্যরে ঘরে ১২টি পিলার ও ১০ ফুটের ঘরে ৯টি পিলার লাগানোর কথা। কিন্তু পিলার লাগানো হয়েছে এক ফুট কম করে। শুধু তাই নয়, পুরো নির্মাণ প্রক্রিয়াতেই দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। ঘরে চার ইঞ্চি ব্যাসের পিলার দেওয়ার কথা থাকলেও সেখানে ৩ ইঞ্চি পিলার দেওয়া হয়েছে। পিলারে ৬ মিলি রডের পরিবর্তে দেওয়া হয়েছে ৪ মিলি রড। ঘরের মেঝে ৩ ইঞ্চির স্থানে দেড় ইঞ্চি ঢালাই, ছয়টির স্থানে চারটি জানালা দেওয়া হয়েছে। শৌচাগারে আটটি রিং বসানোর কথা থাকলেও বসানো হয়েছে ছয়টি। ডোয়া (ঘরের মেঝের নিচের অংশ) থেকে ৬ ইঞ্চি করে চাপিয়ে দুপাশে এক ফুট করে ছোট করে দেওয়া হয়েছে ঘর। ঘরের মেঝের চারপাশে ইটের গাঁথুনির জন্য মাটি কাটা হয়নি। দায়সারাভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে টিন ও রাজমিস্ত্রির কাজ। বোয়ালমারীর ঘোষপুর ইউনিয়নের শেলাহাটি গ্রামের মৃত মেহেরুজ্জামানের স্ত্রী হুরি বেগম (৬০) বলেন, ‘মাত্র চার-পাঁচ মাস আগে তার ঘর বানানো হয়েছে। এরই মধ্যে ঘরের দুটি আড়া ফেটে গেছে। ঘরের মেঝেতে মাঝ বরাবর বড় ফাটল দেখা দিয়েছে।’

মৃত সামছেল শেখের স্ত্রী ছাহেরা বানু (৬০) বলেন, ‘পরের বাসায় কাজ কইর‌্যা, ভিক্ষ্যা কইর‌্যা ১০ হাজার টাকা জোগাড় কইর‌্যা দিছি। কিন্তু এহন ঘরের জানালা খসানো যায় না। দরজার কপাট লাগানো যায় না।’ আশ্রয়ণ প্রকল্পে বসবাসকারীরা অভিযোগ করেন, ঘর বাবদ প্রত্যেকের কাছ থেকে টাকা নিলেও ঘরটিও ভালোভাবে তৈরি করে দেওয়া হয়নি।

ঘোষপুর ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ড সদস্য খলিলুর রহমান জানান, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে ১০ হাজার টাকা করে ঘুষ দেওয়ার অভিযোগ শুনেছেন। সেই হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর এই আশ্রয়ণ প্রকল্পে ৩৭ লাখ টাকার বেশি দুর্নীতি হয়েছে। এই প্রকল্পের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন বোয়ালমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ জাকির হোসেন। তিনিই এ প্রকল্পের বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইসি)। তবে কোনো সুবিধাভোগীই সরাসরি তার হাতে টাকা দেননি। কিন্তু ভুক্তভোগীরা জানান, ঘর পাওয়ার জন্য পিআইসিকে দেওয়ার কথা বলে প্রত্যেকের কাছ থেকেই ১০ হাজার টাকা করে নেওয়া হয়েছে। এই টাকা ইউএনওকে ‘ঘুষ’ দিতে হবে বলে তাদের জানান প্রকল্প সমন্বয়কারীর লোকজন।

বোয়ালমারী উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের এই আশ্রয়ণ প্রকল্পের মূল সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করেছেন ঘোষপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফারুক হোসেন এবং চতুল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান যুবলীগ নেতা শরীফ সেলিমুজ্জামান লিটু।

প্রকল্প কর্তকর্তা ইউএনওর নাম ভাঙিয়ে অসহায় মানুষদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে ইউপি চেয়ারম্যান ফারুক হোসেন কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। এদিকে প্রকল্প সমন্বয়কারী আরেক ইউপি চেয়ারম্যান শরীফ সেলিমুজ্জামান লিটু বলেন, ‘অনেক প্রতারকচক্র থাকে, তারা হয়তো টাকা নিতে পারে। আমরা এ বিষয়ে কিছুই জানি না।’ নিম্নমানের ঘর তৈরি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রথম দিকের ঘর তৈরির সময় কিছু সমস্যা হয়েছে। পরে সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ হয়েছে।

এদিকে অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে নিজের জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেন প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ও বোয়ালমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ জাকির হোসেন। তিনি দাবি করেন, প্রতিটি ঘর নিয়মানুযায়ীই তৈরি করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘একসঙ্গে অনেক কাঠ কেনার কারণে কিছু কিছু ঘরের কাঠের আড়া ফেটে যেতে পারে। তবে লিখিত অভিযোগ পেলে সরেজমিন তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত