পাঙাসবাহী ট্রাককে ময়মনসিংহ-ঢাকা মহাসড়কের ‘প্রধান শত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। নির্দেশ দিয়েছিলেন পাঙাশের প্রতিটি ট্রাকেই ড্রামের মধ্যে নেট ব্যবহারের। যাতে করে ড্রামের পানিতে মহাসড়ক ভিজে বিটুমিন ওঠে না যায়।
কিন্তু কে শোনে কার কথা! প্রায় সাড়ে ৪ বছর আগে মন্ত্রী এই নির্দেশনা দিলেও তা মানেননি কোন মাছ ব্যবসায়ীই। মাছ জীবিত রাখার বাণিজ্যিক স্বার্থেই নিত্যদিন ময়মনসিংহ থেকে প্রায় তিন শতাধিক ট্রাক পাঙাশ মাছ ঢাকা ও বিভিন্ন জেলায় পরিবহন করা হচ্ছে। ট্রাকের ড্রাম থেকে পানি উপচে ভিজছে সড়ক। এতে করে চারলেনের এই মহাসড়কটির ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসনের এই বিষয়ে কোন নজরদারি না থাকায় এই মহাসড়কটি নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই অবস্থা চলতে থাকলে এক সময় মহাসড়কে গর্ত সৃষ্টি হতে পারে।
জানা যায়, চারলেনে ময়মনসিংহ-ঢাকা মহাসড়ক উন্নীত হওয়ার পর এখান দিয়ে ৩০ হাজারের বেশি যাত্রী ও পণ্যবাহী গাড়ি প্রতিদিন চলাচল করে। যাতায়াতে সময়ের ব্যবধানেও দুই থেকে আড়াই ঘণ্টায় নেমে এসেছে। ঝকঝকে মহাসড়কে নির্বিঘ্নে পণ্য পরিবহন করতে পেরে সন্তুষ্ট ব্যবসায়ীরা।
তবে এই মহাসড়কটির নির্মাণের সময়েই ‘মাথাব্যথা’র কারণ হয়ে দাঁড়ায় ট্রাকে থাকা পানি ভর্তি ড্রাম। মূলত ময়মনসিংহ জেলার ভালুকা ও ত্রিশাল উপজেলা থেকে প্রতিদিন কমপক্ষে ৪ শতাধিক ট্রাক পাঙাশ মাছ ঢাকা ও আশপাশের জেলায় পরিবহন করা হয়।
এসব ট্রাকে ড্রামের ভেতর পাঙাশ মাছ রাখা হয়। আর ড্রামে মাছ তাজা রাখতে রাখা হয় পানি। ফলে ট্রাক চলার সময় ড্রাম থেকে উপচে পানি পড়ে। এতে করে গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়কটি ভিজে যায়। পিচঢালাই সড়কে পানিতে ভিজে থাকলে বিটুমিন উঠে যায়। এতে করে দ্রুত সময়ের মধ্যে মহাসড়ক নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, ময়মনসিংহ-ঢাকা মহাসড়কের চারলেনের কাজ চলার সময় ২০১৩ সালের ৩১ জুলাই সড়ক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের পরিদর্শনে এলে তৎকালীন জেলা প্রশাসক (ডিসি) লোকমান হোসেন মিয়া পাঙাশের ট্রাকে মহাসড়কের সর্বনাশের কথা প্রথম মন্ত্রীর সামনে তুলে ধরেন।
মন্ত্রী মাছ ব্যবসায়ীদের সাথে আলোচনার মাধ্যমে এই বিষয়টি সমাধানের নির্দেশ দেন তাকে। এরপর জেলা প্রশাসক ওই বছরের আগস্ট মাসে ভালুকা ও ত্রিশালের মাছ চাষি ও ব্যবসায়ীদের সাথে মতবিনিময় করেন। তিনি মাছ ব্যবসায়ীদের মাছবাহী ট্রাকের ড্রাম থেকে পানি পড়া বন্ধে নেট ব্যবহার করার জন্য অনুরোধ জানান।
এরপরও এই অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় পরের বছরের ১০ মে ওবায়দুল কাদের মহাসড়কে পাঙাশ মাছবাহী ট্রাক চলাচল বন্ধের নির্দেশ দেন। এরপর কিছু মাছ ব্যবসায়ী ট্রাকের ড্রামে নেট ব্যবহার করলেও কিছুদিন পর পরিস্থিতি আগের মতোই রয়ে যায়। গত কয়েক দিনে সরেজমিনে দেখা যায় নিয়মিতই ট্রাকে নেটবিহীন ড্রামে মাছ বহন করা হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, জেলার ভালুকার হাজীর বাজার, বাসস্ট্যান্ড এলাকা ও ত্রিশাল উপজেলার বইলর এবং বাসস্ট্যান্ড এলাকার ২০ টির বেশি অবৈধ পানির পাম্প রয়েছে। এসব পাম্প থেকেই মোটা পাইপের মাধ্যমে ট্রাকে পানি সরবরাহ করা হয়। পানি সরবরাহকারী পাম্প মালিকরা এর মাধ্যমে অবৈধভাবে টাকা কামিয়ে নিচ্ছেন।
মহাসড়কের ত্রিশাল উপজেলার বইলর বাজার এলাকার সন্নিকটে আব্দুল গণির পানির পাম্পে বেশ কয়েকটি ট্রাকের ওপর থাকা ড্রামে পানি ভরার কাজ করছিলেন হেলপার জুলহাস (২৬)। ড্রামে নেট ব্যবহার না করলে সড়কের ক্ষতি হয় বিষয়টি জানে এই হেলপার।
তিনি বলেন- ‘কেউ তো আমগরে (আমাদের) নেট লাগাইতে (ব্যবহার) কয় (বলে) না। কইলে (বললে) অবশ্যই লাগাইতাম (ব্যবহার)।’
এখান থেকে কয়েক কিলোমিটার এগোতেই ত্রিশাল দরিরামপুর এলাকায় সারি সারি মাছবাহী ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে। ঢাকা মেট্রো ট-২২-২৬৪১ নম্বর ট্রাকের চালক শফিকুল ইসলাম (৪০) জানান, ড্রামে নেট ব্যবহার বাধ্যতামূলক নয়। আর কোন ট্রাকের চালক বা মাছ ব্যবসায়ীই এই নিয়ম মানেন না।
জানতে চাইলে ময়মনসিংহ সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ) অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মনিরুল ইসলাম জানান, ইতিপূর্বে আমরা কয়েকবার ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে অভিযান চালিয়ে এই প্রবণতা বন্ধ করেছিলাম। এখন আবার শুরু হয়েছে। পুনরায় এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
তবে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রীর নির্দেশনার দীর্ঘ সাড়ে ৪ বছর পরেও তা বাস্তবায়ন না হওয়ার বিষয়ে জানতে ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক (ডিসি) ড. সুভাস চন্দ্র বিশ্বাসকে একাধিকবার কল দিলেও তিনি সাড়া দেননি। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) বেলায়েত হোসেন জানান, বিষয়টি আমার নজরে আসেনি। খোঁজ খবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
