রাজধানীর ৭০ শতাংশ বহুতল ভবনে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা খুঁজে পায়নি রাজধানী উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষ (রাজউক)। আর ৩৩ শতাংশ বহুতল ভবনে অগ্নিকাণ্ডের সময় দ্রুত প্রস্থানের জন্য বিকল্প সিঁড়ি বলতে কিছুই পায়নি সংস্থাটি। বাকি ৬৭ শতাংশ ভবনে এই সিঁড়ি থাকলেও ব্যবহার উপযোগী মাত্র ৪৩ শতাংশ। কিন্তু বাকি ৩৪ শতাংশ ভবনের সিঁড়ি ব্যবহার অনুপযোগী বলে মনে করছে সংস্থাটি। রাজউকের ২৪টি দলের ১৫ দিন ধরে রাজধানীজুড়ে ১৮১৮টি বহুতল ভবন পরিদর্শন করে পাওয়া তথ্য পর্যালোচনায় আরও দেখা গেছে, কেবল বিকল্প সিঁড়িই নয়, ১৫ শতাংশ বহুতল ভবন ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ করার ক্ষেত্রে নিয়ম মানা হয়নি। আর বহুতল ভবন নির্মাণে যে পরিমাণ উন্মুক্ত স্থান রাখার কথা, তা মানা হয়নি ৩৭ শতাংশ ভবনের ক্ষেত্রে। ৪৭৪টি বহুতল ভবন নকশা দেখাতে পারেনি, যা পরিদর্শন করা ভবনগুলোর ২৬ শতাংশ। এ ছাড়া, সরকারের অন্য সংস্থার ৪৪টি বহুতল ভবনেরও নকশা পায়নি রাজউক।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজউক চেয়ারম্যান আবদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা ২৪টি টিমের প্রতিবেদন হাতে পেয়েছি। এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্ত্রী মহোদয় গণমাধ্যমে তুলে ধরবেন। এর বেশি কিছু এই মুহূর্তে বলতে চাই না।’
বনানীর একটি বহুতল ভবনে অগ্নিকা-ের পর রাজধানীর বহুতল ভবনগুলোর নির্মাণ, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাসহ সার্বিক নিরাপত্তার বিষয় খতিয়ে দেখতে ৮টি জোনে ২৪টি টিম গঠন করে রাজউক। ১ এপ্রিল থেকে টিমগুলো ১০ তলার অধিক উচ্চতার ১৮১৮টি ভবন সরেজমিন পরিদর্শন করে যেসব তথ্য পেয়েছে, দেশ রূপান্তরের পক্ষ থেকে তা পর্যালোচনা করে আরও দেখা যায়, পরিদর্শন করা ১৮১৮ ভবনের মধ্যে ২৭৫টি ভবন ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে রাজউকের অনুমোদন নেওয়া হয়নি। ৬৬৯টি ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে নিয়মানুযায়ী উন্মুক্ত স্থান (সেটব্যাক) মানা হয়নি। ১৮১৮টি ভবনের মধ্যে রাজউক ছাড়া সরকারের অন্যান্য সংস্থা থেকে অনুমোদিত ভবন রয়েছে ২০৭টি। এই ২০৭টির মধ্যেও ৪৪টি ভবন ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ করা হয়েছে নিয়ম না মেনে। ৬৬টির ক্ষেত্রে নিয়ম মেনে উন্মুক্ত স্থান রাখা হয়নি।
রাজউকের ২৪ দলের তদন্তে সবচেয়ে বেশি অনিয়মের চিত্র মেলে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থায়। অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র (ফায়ার এক্সটিংগুইশার, ফায়ার অ্যালার্ম, হোস পাইপ, ফায়ার হাইড্রেন) আছে ৫৩৯টি ভবনে। আর ১২২২টিতে নেই। অগ্নিনির্গমন সিঁড়ি যথাযথ আছে এমন ভবন ৭৮৬টি। তবে সেগুলোর মধ্যে ৫৯১টিই ব্যবহার করার মতো নয়। আর মোট ১৮১৮টি বহুতল ভবনের মধ্যে অগ্নিনির্গমন সিঁড়িই নেই ৬০২টিতে।
তদন্তদলের পাওয়া তথ্য সূত্রে, অনুসন্ধানে পাওয়া ১৮১৮টি বহুতল ভবনের মধ্যে রাজউকের অনুমোদিত নকশা আছে ১১৩৬টির। রাজউক ব্যতীত অন্যান্য সরকারি সংস্থার অনুমোদিত ভবন ২০৭টি। ১৮১৮ ভবনের মধ্যে ৪৩১টি ভবনের মালিক রাজউকের অনুমোদিত নকশা দেখাতে পারেননি। এ ছাড়া সরকারি অন্যান্য সংস্থার অনুমোদিত ভবনের মধ্যে নকশা দেখাতে পারেনি ৪৪টি।
যেসব বহুতল ভবন রাজউকের নকশা অনুমোদনের পর হয়েছে সেগুলোর মধ্যে ঊর্ধ্বমুখী ব্যত্যয় আছে ২৭৫টিতে। আর নিয়ম অনুযায়ী উন্মুক্ত স্থান (সেটব্যাক) ও অন্যান্য অনিয়ম রয়েছে ৬৬৯টিতে। রাজউক ছাড়া অন্যান্য সংস্থা থেকে অনুমোদিত ভবনের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ৪৪টিতে ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণে ব্যত্যয় রয়েছে। ৬৬টিতে উন্মুক্ত স্থান নিয়ম মেনে রাখা হয়নি। এ ছাড়া বহুতল ভবনের ক্ষেত্রে নকশা দেখাতে ব্যর্থ আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে নকশা নেই এমন ভবনের সংখ্যা পাওয়া গেছে ৪৭৪টি।
রাজউক কর্মকর্তারা বলছেন, অগ্নিকা-ের ঘটনার জন্য নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে ভবন ব্যবহারের বিষয়টিও অন্যতম। দেখা গেছে, ১৮১৮টি বহুতল ভবনের মধ্যে আবাসিক অনুমোদন নিয়ে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে ১২৪টি। আবাসিক অনুমোদন নিয়ে অ-আবাসিক কাজে ব্যবহার হচ্ছে ৪৯টি। সবচেয়ে বেশি অনিয়ম পাওয়া গেছে পার্কিংয়ের জায়গায়। দেখা গেছে ৩০৯টি বহুতল ভবনে পার্কিংয়ের স্থলে বাণিজ্যিক বা অন্যান্য কাজ করা হচ্ছে।
রাজউকের জোন-২ (উত্তরা-টঙ্গ ) এলাকায় বহুতল ভবন নির্মাণে বেশি অনিয়ম ধরা পড়েছে। দেখা যায়, মোট বহুতল ভবন রয়েছে ৮৩টি। এগুলোর মধ্যে ৬৫টি নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে ঊর্ধ্বমুখী নির্মাণ করা হয়েছে। অন্যান্য অনিয়ম হয়েছে ৬১টি ভবনে। অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র আছে ১৬টিতে; নেই ৫৪ টিতে। আর অগ্নিনির্গমন সিঁড়ি আছে ৬৯টিতে, নেই ১৩টি। জানতে চাইলে জোন ২-এর পরিচালক (উপসচিব) মো. নূরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা বেশ কিছু বিষয় মাথায় রেখে এ তদন্তকাজ পরিচালনা করেছি। ১১ তলা থেকে ঊর্ধ্বে থাকা ইমারতগুলোকেই বহুতল ভবন হিসেবে ধরা হয়েছে। এসব বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ করে এরই মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে।’
রাজউক কর্মকর্তারা জানান, সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্তে ভবনের মূল মালিক এবং নির্মাণ প্রতিষ্ঠান, অনুমোদিত নকশা, নকশা কত সালে অনুমোদিত হয়েছে, ভবন কত সালে হয়েছে, নকশা প্রণয়নকারী স্থপতি এবং প্রকৌশলীর নাম ও রেজিস্ট্রেশন নম্বর, নকশা অনুযায়ী নির্মিত হয়েছে কি না, কার পার্কিং আছে কি না, সেটব্যাক আছে কি না, ব্যত্যয় হয়ে থাকলে কী পরিমাণ হয়েছে, নির্মাণের সময় বিধিমালা অনুযায়ী অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, অগ্নিনির্বাপণ পথ, সিঁড়ির প্রশস্ততা সঠিক ছিল কি না, অতিরিক্ত ইনটেরিয়র ডিজাইন করা হয়েছে কি না, প্রয়োজনীয় সংখ্যক অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র আছে কি না এবং ভবন ব্যবহারের শ্রেণি পরিবর্তন হয়েছে কি নাÑএসব বিষয় খতিয়ে দেখা হয়েছে। এ ছাড়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স থেকে ফায়ার ফাইটিং নকশা ও অনাপত্তি দেওয়া হয়েছিল কি না তাও খতিয়ে দেখা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, রাজউকের আটটি জোনের মধ্যে আশুলিয়া-গাজীপুর নিয়ে গঠিত জোন ১-এ সবচেয়ে কম বহুতল ভবন আছে। উত্তরা, টঙ্গী নিয়ে গঠিত জোন ২-তে আছে ৮৩টি। বেশি বহুতল ভবন রয়েছে মিরপুর-মোহাম্মদপুর এলাকা নিয়ে গঠিত জোন-৩, গুলশান, বারিধারা, নিকেতন, তেজগাঁও এলাকা নিয়ে গঠিত জোন-৪, ধানম-ি-লালমাটিয়া এলাকা নিয়ে গঠিত জোন ৫ এবং রামপুরা, মতিঝিল ও খিলগাঁও এলাকা নিয়ে গঠিত ৬ জোন-এ। লালবাগ, সূত্রাপুর, কেরানীগঞ্জ এলাকা নিয়ে গঠিত জোন ৭ এবং ভুলতা-নারায়ণগঞ্জ নিয়ে গঠিত জোন ৮-এ বহুতল ভবন তুলনামূলক কম।
ঢাকা মহানগর ইমারত (নির্মাণ, উন্নয়ন, সংরক্ষণ ও অপসারণ) বিধিমালা, ২০০৮-এর ৬০ ধারা মতে, বহুতল ভবন বলতে বোঝায়, ‘১০ তলা বা ৩৩ মিটারের ঊর্ধ্বে যে কোনো ইমারত বা ভবন।’ এ আইনের ফলে রাজউক এলাকায় থাকা ১০ তলা উঁচু পর্যন্ত ভবনগুলো ‘বহুতল ভবন’ হিসেবে ধরা হয়নি।
