আত্মঘাতী সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে শুধু কি ধর্ম জড়িত

আপডেট : ২৬ এপ্রিল ২০১৯, ১০:৩৩ পিএম

শ্রীলঙ্কা দক্ষিণ এশিয়ার একটি দ্বীপরাষ্ট্র। শ্রীলঙ্কায় অনেকগুলো জাতিগোষ্ঠী বসবাস করলেও সেখানে মূলত সিংহলিজ এবং তামিলদের মধ্যে জাতিগত বিভাজন ছিল। এর সূত্র ধরে ১৯৮০ সালের দশকে সেখানে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। মূলত সেখানে তামিলরা স্বায়ত্তশাসনসহ অধিক সুযোগ-সুবিধা চাচ্ছিল। অন্যদিকে সিংহলিজরা তামিলদের দাবিকে বলে প্রত্যাখ্যান করে। এর ফলে সেখানে গৃহযুদ্ধ শুরু হয় এবং তা প্রায় তিন দশক ধরে চলমান ছিল। এতে হাজার হাজার নিরীহ মানুষ প্রাণ হারান। অবশেষে শ্রীলঙ্কান সেনাবাহিনী বলপ্রয়োগের মাধ্যমে তামিল বিদ্রোহীদের পরাজিত করে। ফলে ২০০৯ থেকে শ্রীলঙ্কায় একটা শান্তিপূর্ণ অবস্থা বিরাজ করছিল। যদিও অনেক বিশেষজ্ঞ তামিলদের পুনরুত্থান হতে পারে বলে আশঙ্কা করেছিলেন।

কিন্তু গত রবিবার শ্রীলঙ্কায় লোকজন যখন ইস্টার সানডে পালন করার জন্য গির্জাতে যাচ্ছিল, তখন সন্ত্রাসীরা আত্মঘাতী বোমা হামলা চালায়। এতে প্রায় ৩০০ জনের অধিক মানুষ প্রাণ হারান, আহত হন আরও ৫০০ জনেরও বেশি। সন্ত্রাসীরা শুধু একটি চার্চে হামলা চালিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, তারা কয়েকটি হোটেলেও হামলা চালায়। এতে শ্রীলঙ্কাসহ বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে নিন্দার ঝড় উঠেছে। তবে এই হামলা শ্রীলঙ্কার জন্য খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। কেননা, ২০০৯ সালে তামিল বিদ্রোহীদের নির্মূল করার পর এত বড় ধরনের হামলার সম্মুখীন শ্রীলঙ্কা হয়নি। এর ফলে তামিল এবং সিংহলিজদের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব বিভাজন ছিল, তা নতুন করে সামনে আসবে বলে মনে হয়। যদিও তাৎক্ষণিকভাবে হামলার দায় কেউ স্বীকার না করলেও পরে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আইএস এই হামলার দায় স্বীকার করে।

সন্ত্রাসবাদ এবং আত্মঘাতী সন্ত্রাসী হামলা নতুন কিছু নয়। ১৯৮৮ সালে আল-কায়েদা প্রতিষ্ঠার আগে বেশির ভাগ সন্ত্রাসী হামলা সংঘটিত হয়েছে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদের মাধ্যমে। তখন পর্যন্ত আত্মঘাতী বোমা হামলা আজকের মতো

বিস্তার লাভ করেনি। কিন্তু ১৯৭৯ সালে আফগানিস্তানে যখন তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন সামরিক আগ্রাসন চালায়, তার এই পরিপ্রেক্ষিতে আল-কায়েদা নামক অরাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর উত্থান হয়।

পরে ১৯৯১ এবং ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন হামলা এবং ২০০১ সালে আমেরিকান টুইন টাওয়ারে সন্ত্রাসী হামলার পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসী কার্যক্রম ব্যাপক মাত্রায় বিস্তার লাভ করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রায় এক দশক পর সিরিয়া গৃহযুদ্ধের সুযোগ নিয়ে ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠা লাভ করে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট। ফলে বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসী হামলা একটা নতুন মাত্রা লাভ করে। বর্তমানে বেশির ভাগই সন্ত্রাসী হামলা চালাচ্ছে আইএস, তালেবানের মতো অরাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো।

বর্তমানে অরাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো যে সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালাচ্ছে, তার বেশির ভাগই আত্মঘাতী বোমা হামলা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই যে সন্ত্রাসী লোকজন যারা নিজেকে বোমার মাধ্যমে উড়িয়ে দিয়ে শত শত মানুষ হত্যা করছে, তার কারণ কী? কোন জিনিস তাদের এই আত্মঘাতী বোমা হামলায় ইন্ধন জোগাচ্ছে? এ প্রশ্নের একটা উত্তর খোঁজা দরকার।

আত্মঘাতী সন্ত্রাসবাদের উত্থান কীভাবে ভালোভাবে ব্যাখ্যা করা যায়? বিশেষ করে, আত্মঘাতী বোমা হামলা কি ধর্মীয় অনুসন্ধানের পরিপূর্ণতা হিসেবে সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায়? যদিও আত্মঘাতী হামলা নতুন কিছু নয় (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্রায় চার হাজার জাপানিজ পাইলট আত্মঘাতী বিমান হামলার মাধ্যমে হাজার হাজার নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছিল)। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আত্মঘাতী হামলা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। যেমন ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি এক বছরে তিনটি হামলার গড় থেকে ১৯৯০-এর দশকে এক বছরে গড়ে ১০টি হামলা হয়েছিল এবং ২০০০ সাল থেকে এক বছরে গড়ে ১০০-এর বেশি আত্মঘাতী সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে।

কোরআন-হাদিসের ভুল ব্যাখ্যার মাধ্যমে অনেক সন্ত্রাসীগোষ্ঠী তাদের অনুসারীদের আত্মঘাতী হামলায় প্ররোচিত করে। একটা কথা বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার, সেটা হলো আত্মঘাতী বোমা হামলা শুধু মুসলমান নামধারী সন্ত্রাসীরা চালায় তা নয়, অন্যান্য ধর্মগোষ্ঠী বা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকারীরা এসব হামলার সঙ্গে প্রচুর পরিমাণে জড়িত। ফলে আত্মঘাতী বোমা হামলা মানেই কোনো ধর্মীয় গোষ্ঠী জড়িত এ ধারণা পোষণ করা ঠিক হবে না। যেমনÑ ১৯৯০ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত আত্মঘাতী সন্ত্রাসবাদের সব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বিশ্লেষণের ভিত্তিতে, পেপে সন্ত্রাসবাদ ও ইসলামি মৌলবাদের মধ্যে বা অন্য ধর্মের মৌলবাদীদের সঙ্গে আত্মঘাতী সন্ত্রাসবাদের সম্পর্ক জোরালোভাবে খুঁজে পাননি। সর্বাধিক আত্মঘাতী সন্ত্রাসবাদ জাতীয়তাবাদী বা বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগ্রামের প্রেক্ষাপটে ঘটেছে, আত্মঘাতী হামলার নেতৃস্থানীয়দের মধ্যে আছে শ্রীলঙ্কান তামিল টাইগারস, যা একটি ধর্মনিরপেক্ষ মতাদর্শের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন। এই আলোকে, কৌশলগত বিবেচনার ভিত্তিতে আত্মঘাতী সন্ত্রাসবাদকে সবচেয়ে ভালোভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।

ভারতীয় উপমহাদেশে সূর্য সেনের জাতীয়তাবাদী কর্মকাণ্ডকে অনেকে সন্ত্রাসী হামলা বলে। (সূর্য সেনের উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশদের অত্যাচার, নির্যাতন থেকে দেশকে স্বাধীন করে দেশের জনগণকে মুক্ত করা)। এ ছাড়া ইহুদিরা তাদের জায়নবাদ প্রতিষ্ঠা করতে আত্মঘাতী সন্ত্রাসী হামলার পথ বেছে নিয়েছিল। এভাবে আমরা দেখতে পাই, জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে দেশ স্বাধীন করার জন্য অথবা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের জন্য অথবা অন্য কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করার জন্য কিংবা ধর্মীয় উদ্দেশ্য সাধন করার জন্য আত্মঘাতী সন্ত্রাসী হামলার পথ বেছে নিয়েছিল।

সুতরাং, এ কথা বলাই যায়, আত্মঘাতী বোমা হামলা মানেই কোনো ধর্মীয় গোষ্ঠীর হামলা, এ কথা বলা ঠিক নয়। এ কথা বলা মানে হচ্ছে প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করে ঘটনার মোড় অন্যদিকে ঘোরানো। যদিও বর্তমানে ধর্মীয় অভিপ্রায়ে আত্মঘাতী বোমা হামলার পরিমাণ অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই বলে একে ধর্মের সঙ্গে জড়িত করে অতি সরলীকরণ করা আদৌ ঠিক হবে না।

লেখক : শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত