দিনাজপুরে দুটি ইট ভাটার বিষাক্ত ধোঁয়ায় কয়েকশ’ বিঘা জমির ফসল পুড়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গাছপালা ও লিচুর বাগান। এতে প্রায় শতাধিক কৃষকের কোটি টাকার বেশি লোকসান হয়েছে। ফসলের ক্ষেত নষ্ট হয়ে যাওয়ায় পথে বসেছে এসব কৃষক পরিবার।
জানা গেছে, দিনাজপুরের খানসামা উপজেলার ভাবকী ইউনিয়নের কুমড়িয়া গ্রামে এস এইচ এস এবং টু-স্টার নামে দুটি ইট ভাটা রয়েছে। ভাটা দুটির বিষাক্ত ধোঁয়ায় ফসলের ক্ষতি ছাড়াও আম, কাঁঠাল, লিচুসহ পুড়ে গেছে বাঁশ ঝাড়।
স্থানীয় কৃষকেরা জানান, বোরো ধান, লিচু, ব্রয়লার মুরগি, বাঁশ ও ভুট্টাসহ অন্যান্য ক্ষেত-খামার পুড়ে গেছে। ধোঁয়া বন্ধ হলেও বিষাক্ত রাসায়নিক বিক্রিয়ায় এখনও নতুন ফসলের ক্ষেতসহ গাছপালা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
জানা গেছে, গত এপ্রিল মাসের ২৮ ও ২৯ তারিখ এস এইচ এস এবং টু-স্টার ভাটায় ইট তৈরির কার্যক্রম এ বছরের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছিল। বন্ধ করার সময় হঠাৎ ভাটার চিমনি দিয়ে বিষাক্ত এবং দুর্গন্ধযুক্ত ধোঁয়া বের হতে থাকে।
রাতে ক্ষয়ক্ষতি বোঝা না গেলেও পরেরদিন কৃষকেরা দেখতে পান তাদের ক্ষেত-খামার এবং রাস্তায় লাগানো গাছপালার পাতা কুঁকড়ে যাচ্ছে। কয়েকদিনে তারা লক্ষ্য করেন ফসলের ক্ষেতও পুড়ে যাচ্ছে। প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকা জুড়ে পুড়ে গেছে বোরো ধানের ক্ষেত।
গাছপালার পাতা ও ফল ঝড়ে পড়ছে। এই বিষাক্ত ধোঁয়ায় কুমড়িয়ার আলমপাড়া, মন্ডলের বাজার এলাকার আশপাশের কয়েকটি গ্রামে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
কুমড়িয়া গ্রামের আলমপাড়ার রবিউল ইসলাম (৩৮) জানান, তার ২২ কাঠা জমির ধান একেবারে পুড়ে গেছে। ধানের গাছও পুড়ে গেছে এবং বাড়ির চারপাশের আম-কাঁঠাল গাছের পাতা কুঁকড়ে গেছে। ফলগুলো ঝরে পড়েছে।
একই গ্রামের রশিদুল ইসলাম জানান, তার ৩ বিঘা জমির ধান পুড়ে গেছে। তিনি ৩ বিঘা জমি এক বছরের জন্য ৬০ হাজার টাকায় চুক্তি নিয়ে ধান রোপণ করেছেন। ৩ বিঘা জমিতে সার,কীটনাশক, মজুরিসহ আর ৫০ হাজার টাকা খরচ করে বোরো ধানের আবাদ করেছেন। কিন্তু ইট ভাটার বিষাক্ত ধোঁয়া তার জমির সব ফসল নষ্ট করেছে। পরিবার নিয়ে বিপাকে পড়েছেন তিনি। রশিদুল ইমলাম ইট ভাটার মালিকের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করেন।

মন্ডলের বাজারের আবেদ আলী (৫৫) বলেন, “আমি শ্রমিক। কষ্ট করে টাকা জমিয়ে এক বিঘা জমিতে বোরো ধান করেছি। আমার পুঁজি শেষ। আমি পথে বসে যাবো।” ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা ক্ষতিপূরণ দাবি করছেন।
লিচু বাগান ব্যবসায়ী মো. ফজির আলী বলেন, “আমি ৫ বছরের জন্য কয়েক’শ লিচুর গাছ ডাক নিয়েছি। কিন্তু ভাটার বিষাক্ত ধোয়ায় লিচু সব ঝরে যাচ্ছে।”
খানসামার ভাবকী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. সফিকুল ইসলাম জানান, আমার ইউনিয়নের কুমড়িয়া গ্রামের শতাধিক কৃষকের প্রায় চার’শ বিঘা জমির ধান ভাটার বিষাক্ত ধোঁয়ায় নষ্ট হয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জানানো হয়েছে। তারাও দেখে গেছেন। এখন ভাটার মালিকদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
খানসামা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আহমেদ মাহবুব-উল ইসলাম বলেন, “ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকার কাজ চলছে। শতাধিক কৃষকের প্রায় চার’শ বিঘা জমির ফসল নষ্ট হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। ভাটা মালিকের সঙ্গে ক্ষতিপূরণের ব্যাপারে আলাপ-আলোচনা চলছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়া চলছে এস.এইচ.এস এবং টু-স্টার ভাটা। বন্ধের সময় বিষাক্ত ধোঁয়া নির্গমন হতে পারে এ ব্যাপারে কোনো ধারণা নেই কর্তৃপক্ষের। এস.এইচ.এস ভাটার মালিক মো. মান্নান সরকার ও মোজাফফর সরকারের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তারা এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
তবে এস.এইচ.এস ভাটার সহকারী ম্যানেজার মো. আব্দুর রহিম বলেন, “আমাদের ভাটায় ইউএনও স্যার এসেছিলেন, তিনি যা সিদ্ধান্ত দিবেন তাই করতে আমরা বাধ্য থাকবো।”
টু-স্টার ভাটার মালিক সাইফুর রহমান বলেন, “আমার ভাটা থেকে যদি এ রকম কোনো ঘটনা ঘটে তাহলে আমি ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য থাকবো। তবে আমার ভাটা থেকে এমনটা হয়নি। আমার ভাটায় বিষাক্ত ধোঁয়া নির্গমনের ব্যবস্থা আছে।”
