নুসরাত হত্যাকাণ্ড

৪ পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হচ্ছে

আপডেট : ০৩ মে ২০১৯, ০৩:২৬ এএম

ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় পুলিশ সদর দপ্তরের উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে পুলিশ সদর দপ্তর। এ ঘটনায় ফেনীর পুলিশ সুপার এস এম জাহাঙ্গীর আলম সরকারসহ চার পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন। ওই কর্মকর্তারা জানান, জাহাঙ্গীর আলমকে যেকোনো সময় বদলি করে ঢাকায় আনা হবে। পাশাপাশি সোনাগাজী মডেল থানার তৎকালীন ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন এবং ওই থানার আরও দুই এসআইকে সাময়িক বরখাস্ত করা হবে। এছাড়া নুসরাত হত্যার ঘটনায় ফেনীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিসি) পি কে এনামুল করিমও ফেঁসে যাচ্ছেন। পুলিশ সদর দপ্তরের তদন্ত প্রতিবেদনে এডিসি এনামুল ঘটনার পর নুসরাতের পরিবারকে কোনো ধরনের সহযোগিতা করেননি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ জন্য তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়া গেছে। যেসব পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে  অভিযোগ এসেছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। আমরা অ্যাকশনে যাব। পুলিশ জনগণের বন্ধু হোক তা আমি সব সময় চেয়ে আসছি এবং তা হচ্ছে এটা বলতে পারি।’

পুলিশপ্রধান আরও বলেন, ‘নুসরাতের ঘটনাটি অবশ্যই মর্মান্তিক। হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরে এর সঙ্গে যারা জড়িত তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। ইতোমধ্যে মামলার বেশিরভাগ আসামিকেই পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে।’

পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা গতকাল বৃহস্পতিবার দেশ রূপান্তরকে জানান, গত মঙ্গলবার রাতে পুলিশ সদর দপ্তরের উচ্চপর্যায়ের কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন ডিসিপ্লিন শাখায় জমা দেওয়া হয়। প্রতিবেদনটি গতকাল বৃহস্পতিবার আইজিপি দেখেছেন। তাছাড়া প্রতিবেদনের একটি কপি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে এসপি এসএম জাহাঙ্গীর আলম সরকার, ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন, এসআই ইকবাল হোসেন ও এসআই ইউসুফের বিরুদ্ধে দায়িত্বে গাফিলতির প্রমাণ মিলেছে। তাছাড়া ফেনীর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পি কে এনামুল করিমসহ মাদ্রাসার ব্যবস্থাপনা কমিটির কয়েকজন সদস্য এবং কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা আসামিদের পক্ষ নিয়ে ইন্ধন জুগিয়েছিলেন। বিশেষ করে ফেনীর এডিসির সহযোগিতা করার সুযোগ থাকলেও তা তিনি করেননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পুলিশ সদর দপ্তর একমত হয়েছে। এসপির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতামত চাওয়া হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরে এসপি জাহাঙ্গীরসহ চার পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড়। আর এডিসির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।’

পুলিশ সদর দপ্তরের এই ডিআইজি জানান, সর্বশেষ গতকাল বৃহস্পতিবারও ফেনীর এসপি এবং সদর থানার ওসির বিরুদ্ধে আইজিপির কাছে অভিযোগ জমা দিয়েছেন ছাগলনাইয়া থানার মহারাজগঞ্জ জয়পুর গ্রামের কাজী জায়েদ মোহাম্মদ গোলাম ফারুক নামে এক ব্যক্তি।

পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তদন্ত প্রতিবেদন পেয়ে পুলিশ সদর দপ্তর বেশ ক্ষুব্ধ। কারণ নুসরাতের পরিবারকে পুলিশ সহযোগিতা না করে উল্টো আসামিদের পক্ষ নিয়েছে। জেলার এসপি বেশি ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি ওসির পক্ষে ওকালতি বেশি করেছেন। প্রতিবেদনের আলোকে এসপিসহ চার পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। আপাতত এসপিকে ফেনী থেকে প্রত্যাহার করা হবে। তাকে নন-অপারেশনাল ইউনিটে বদলি করা হবে। আর ওসি ও দুই এসআইকে সাময়িক বরখাস্ত করা হবে। এছাড়া এডিসি এনামুল করিমের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে গতকাল বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে।’

তদন্ত প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে এসপি জাহাঙ্গীর মিথ্যাচার করেছেন। তিনি তদন্ত কমিটিকে জানিয়েছেন, সকাল সাড়ে ৯টায় ঘটনা ঘটলেও তাকে শুরুতে জানানো হয়নি। খাগড়াছড়িতে তার একটি পূর্বনির্ধারিত অনুষ্ঠান ছিল। বেলা সাড়ে ১২টার পর তিনি সেখানে রওনা দেন। রামগড় পার হওয়ার পর ঘটনাটি তাকে জানানো হয়। এরপর তিনি খাগড়াছড়িতে না গিয়ে ফেনীতে ফেরত আসেন। কিন্তু তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার পরপরই সকাল ১০টার দিকে এসপিকে বিষয়টি জানানো হয়। এরপর প্রায় তিন ঘণ্টা তিনি ফেনীতে অবস্থান করেন। আধা ঘণ্টার মধ্যেই ফেনী থেকে সোনাগাজীতে যাওয়া যায়। কিন্তু নুসরাতকে আগুনে পোড়ানোর ঘটনা শোনার পর এসপি তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে যাননি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত