সোনাগাজীর মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির হত্যার এক মাস পুর্ণ হলো। ১০ এপ্রিল বাংলার 'জোয়ান অব আর্ক' আগুনে দগদ্ধ হওয়ার দুঃসহ যন্ত্রনা নিয় পৃথিবী ছেড়ে চলে যান।
তবে তার মৃত্যু নেই। তার স্মৃতি এখনো খুঁজে বেড়ান তার পরিবার, স্বজন ও শিক্ষক-সহপাঠিরা। কিছুতেই ভুলতে পারছেন না তারা নুসরাতকে।
হত্যাকাণ্ডের এক মাস হলেও নুসরাত নেই এমনটি ভাবতে পারছেন না কেউই।
বৃহস্পতিবার সকালে নুসরাতের বাড়ীতে গিয়ে দেখা যায়, শুনসান নিরবতা। নুসরাতের বেশ কয়েকজন সহপাঠি ও প্রতিবেশী কয়েকজন নারী আছেন তাদের ঘরে।
সে ঘর থেকে ভেসে আসছে থেকে মৃদু কান্নার আওয়াজ। নুসরাতের মা শিরিন আক্তার মেয়ের কাথা স্মরণ করে আজো কাঁদছেন।
নুসরাতের ঘরের টেবিল, তাতে সাজানো বই, কাপড় সব আগের মতো আছে। তার বাবা বাড়ী ছিলেন না তখন। বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বৃহস্পতিবার এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের সোনাগাজীর বক্তারমুন্সি শাখায় যোগদান করেছেন।
কথা হয় নুসরাতের ছোট ভাই রাশেদুল হাসান রায়হানের সঙ্গে।
সে জানায়, 'বোন নুসরাত ছাড়া আমাদের পরিবার শূন্য। আমাদের বোন ঘর আলোকিত করে রাখত। বোনের স্মৃতির কথা মনে পড়লে রাতে ঘুম আসে না। আমার সঙ্গে কতই না দুষ্টুমি করত বোন আমার'।
রায়হান আরো জানান, 'মা এখনো বোনের জন্য কেঁদে কেঁদে বুক ভাসান। বাবা একেএম মুসার বোবা কান্নায় থেকে বুকটা ফেটে যায়।'
পরীক্ষা না থাকায় নুসরাতের মাদ্রাসায় গিয়ে তার কোনো সহপাঠীকে পাওয়া যায়নি।
তবে সেখানে উপস্থিত শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অত্যন্ত শান্ত স্বভাবের ছিল নুসরাত জাহান রাফি।ছোট ভাইয়ের সঙ্গে প্রায় মাদ্রাসায় আসা-যাওয়া করত। আচার-ব্যবহারে কোনো ত্রুটি পাওয়া যেত না।
নুসরাতের খুব কাছের বন্ধু নিশাত, ফূর্তি, সাথী ও তামান্না।
নিশাত ও ফূর্তির সঙ্গে নুসরারেত হাজারো স্মৃতি। তাদের বাড়িতে নিয়ে অপ্যায়ন করানোসহ মাদ্রাসার খুনসুটি হতো তাদের সঙ্গে। নুসরাত তার সবকিছুই শেয়ার করতেন তাদের।
অধ্যক্ষের হাতে যৌননিপীড়নের পর নিশাত ফূর্তি সঙ্গে থাকলেও সাথী-তামান্না ছিলো না। তাদের চিঠির মাধ্যতে অধ্যক্ষের কুকর্মের কথা জানিয়েছে নুসরাত।
মুঠোফোনে ফূর্তি জানান, আমাদের খুব কাছের বান্ধবী নুসরাত। তার সঙ্গে অনেক স্মৃতি যা এখনো অমলিন। দেখা হলেই আমাদের নাম না বলে ‘আই লাভ ইউ’ বলে সম্বোধন করত। আর কোনো কারণে দু’ একদিন মাদরাসায় না আসলে ‘আই মিস ইউ’ বলে জড়িয়ে ধরতো নুসরাত।
তিনি বলেন, নুসরাত শিক্ষা দিয়ে গেছেন কীভাবে প্রতিবাদ করতে হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমন অসংখ্য নুসরাত নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন। এখনো অসংখ্য সিরাজ স্কুল-মাদ্রাসায় ঘাপটি মেরে বসে আছে।
নুসরাতের দুই সহপাঠী মোশাররফ হোসেন ও আবদুল্লাহ আল মামুন। তারা জানান, ছেলেদের সঙ্গে না মিশলেও প্রায় সব মেয়ের সঙ্গেই নুসরাতের বন্ধুত্বপূর্ণ সর্ম্পক ছিলো।
মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাওলানা মো. হোসাইন বলেন, নুসরাতকে এর আগে দেখেছি কি না মনে পড়ছে না। তবে অগ্নিদগ্ধ হওয়ার পর ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে তাকে দেখতে যাই। এমন একটি নিষ্পাপ মেয়ের ওপর কীভাবে এমন নৃশংসতা চালিয়েছে ভাবতেই শিউরে উঠি। নুসরাত হত্যাকান্ডের সাথে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি কামনা করেন তিনি।
ফেনীর পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মনিরুজ্জামান বলেন, নুসরাত হত্যার ক্লু অল্প সময়ের মধ্যে উদঘটিত হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে শতভাগ আসামি গ্রেপ্তার হয়েছে। আদালতে ১২ আসামি জবানবন্দি দিয়েছেন।
অন্য আসামিদের জবানবন্দি নেওয়ার কাজ চলেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, চলতি মাসের মধ্যেই অভিযোগপত্র দাখিল সম্ভব বলে আমরা আশাবাদী।
আলোচিত এ মামলা এ পর্যন্ত ২১ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ও পিবিআই।
ফরাসী স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রতীক জোয়ান অব আর্ক। তাকেও পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছিল। ফেনীর নুসরাত জাহান বাংলাদেশের লাঞ্ছিত, নিগৃহীত নারী সমাজের মুক্তির প্রতীক। তার মৃত্যু জীবন্ত দগ্ধ হয়েই। নিজের জীবন দিয়ে ফরাসীদের আত্মপ্রত্যয়ী হতে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন জোয়ান। নুসরাতও পথ দেখিয়ে গেছ বাংলাদেশের নারীদের লড়াইয়ের ও সাহসের।
নুসরাতের মৃত্যু নেই।
