বাঘ আতঙ্কে দিনরাত পাড় করছে বরগুনার তালতলী এলাকাবাসী। লোকমুখে ও বিভিন্ন মাধ্যমে তালতলী থেকে পাওয়া তথ্য মতে গত প্রলয়ঙ্করী ঝড় ফেনীর পর থেকেই এলাকায় দেখা দিয়েছে বাঘের উপদ্রব। বিগত কয় দিনে কথিত সেই বাঘ তালতলী এলাকায় গৃহপালিত পশুপাখির উপর বহুবার আক্রমণ চালিয়েছে বলে জানা যায়।
তালতলীতে প্রথম সেই বাঘের আক্রমণ ঘটে মরানিদ্রা সরকারি প্রাইমারি বিদ্যালয় সংলগ্ন লালমিয়া ফরাজীর একটি ছোট বাছুররের উপর। রাতে সবার অজান্তে বাঘ গোয়ালে আক্রমণ করে ছোট একটি বাছুর টেনে নিয়ে যায়। পরেরদিন সকালে বাড়ীর লোকজন পাশের মাঠে সেই বাছুরের আধা খাওয়া দেহ দেখতে পায়। ঘটনাটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে গ্রামের লোকজন বাছুরের অবশিষ্ট দেহ দেখে অনুমান করে হয়তো বাঘ এমন কাণ্ড ঘটিয়ে থাকতে পারে। ফলে সুন্দরবন সংলগ্ন বলেশ্বর নদীর পূর্ব পাড়ের তালতলীর এলাকায় বাঘের আতঙ্ক ছড়িয়ে পরে। পরবর্তীতে প্রায় প্রতি রাতেই গ্রামের কোন নাকোনো বাড়ীতেই হানা দিচ্ছে সেই বাঘ। ইতিমধ্যে কয়েকটি ছোট গরু, বাছুর ও ছাগল আহত করেছে।
এলাকাবাসী আশঙ্কা করছে হয়তো ফেনী ঝড়ের তোড়ে সুন্দরবন থেকে কোন বাঘ তালতলী গ্রামে ভেশে আসতে পারে। এলাকাবাসী নিকটস্থ ট্যাংরাগিরি বন অফিসে বিষয়টি জানিয়েছে। ট্যাংরাগিরি বন অফিসের কর্মকর্তা মোঃ জাহিদ জানান, তিনি এই ঘটনা সম্পর্কে অবগত আছেন ও নিজেও বাঘের বিষয়টি তদন্ত করছেন। তবে গ্রামবাসী বা বন কর্মকর্তা কেউ বাঘের উপস্থিতির বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারেনি। এদিকে গবাদিপশুর উপর বাঘের আক্রমণের আতঙ্কে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে তালতলীর লোকজন। বাঘের আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে গ্রামের মানুষ রাত জেগে পাহারা দিচ্ছে। বাঘের ভয়ে গ্রামের নারী, বৃদ্ধ, শিশু সন্ধ্যার পর বাড়ী থেকে বেড় হচ্ছে না।
তালতলীর বাঘ আতঙ্কের এমন উদ্ভেদ পরিস্থিতি তাই সরজমিনে খোঁজ খবর করে জানা গেলো, তালতলীতে বাঘের আতঙ্ক ছড়ালেও বিগত কয়দিনের ঘটে যাওয়া ঘটনায় বাঘের উপস্থিতির উল্লেখযোগ্য কোন আলামত পরিলক্ষিত হয়নি। তালতলীর আক্রান্ত গবাদিপশু গুলীর দেহে নখের আঁচড় পর্যবেক্ষণে তা বাঘের বলে মনে হয়নি। এছাড়াও ঘটনাস্থলে পাওয়া প্রাণীটির পায়ের ছাপ আঁকারে মেছো বিড়ালের পায়ের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। তাছাড়া সুন্দরবন ও ঘটনাস্থল তালতলীর মধ্যে দূরত্ব বিবেচনায় বাঘের এতো দূর নদীপথ পাড়ি দিয়ে আসা স্বাভাবিক নয়, কেনোনা সুন্দরবন থেকে পূর্বে তালতলীর নিকটতম দূরত্ব অন্তত প্রায় ১৪ থেকে ১২ কিলোমিটার।
এমনকি এই অঞ্চলে এমন কোন বন নেই যেখানে বাঘের মত বড় একটি প্রাণী দিনের বেলা লুকীয়ে থাকতে পারে। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, প্রথম ঘটনায় যে বাছুরটির আধা খাওয়া দেহ পাওয়া গেছে তা কোন ভাবেই একটি মেছো বিড়ালের একার পক্ষে এক রাতেই সাবাড় করা সম্ভব নয়। তবে মেছো বিড়ালের পক্ষে গরুর ছোট বাছুর শিকারের এমন ঘটনার প্রমাণ পূর্বেও পাওয়া গেছে মৌলভীবাজারের হাওড় অঞ্চলে। তবে মেছো বিড়ালের এমন ধারাবাহিক গবাদিপশুর উপর আক্রমণ সচরাচর হয়না। ফলে বিষয়টি আশঙ্কাজনক। তাছাড়া মেছো বিড়ালের পক্ষে গরুর বাছুরের হাড় চিবিয়ে খাওয়া সম্ভব নয়। হতে পারে বিড়ালের শিকারের পরে ঐ অঞ্চলের শিয়াল বা কুকুর পরবর্তীতে সকালের আগেই মরা বাছুরের বেশীরভাগ অংশ খেয়েছে।
আবার এমন ধারাবাহিক আক্রমণ গ্রামের বেওয়ারিশ দলবদ্ধ কুকুর বা শেয়ালেরও হতে পারে। তবে আতঙ্ক ও রহস্যের এখানেই শেষ নয়। বাঘের উপদ্রবের কয়দিন বাদেই স্থানীয় লোকজন গ্রামীণ বনে বাঘ সাদৃশ্য একটি প্রাণী দেখতে পেয়ে ধাওয়া দিলে প্রাণীটি দৌড়ে ঝোপঝাড়ে হাড়িয়ে যায়। পরে খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে বিড়ালের মত দেখতে একটি প্রাণীকে ঝোপের আড়ালে বিশ্রাম নিতে দেখলে গ্রামবাসী মোবাইলে ছবি তুলে রাখে।
যা আরও বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে। ছবিটিতে প্রাণীটির অবস্থানগত দূরত্ব, কম রেজুলেশন ও মুখ দেখা না যাওয়ায় শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রাণীটি গড়নে বিড়াল সাদৃশ্য হলেও সাধারণ বন বিড়াল বা মেছো বিড়াল নয়। স্থানীয় লোকজনের মতে প্রাণীটি আঁকারে কুকুরের সমান মতান্তরে কুকুরের থেকেও বড় তবে কুকুর নয়। আবার ছবির এই প্রাণীটি যে বিগত ঘটনা গুলীর জন্য দায়ী তাও নিশ্চিত হওয়া যায়না। ফলে বাঘ আতঙ্কের ধোঁয়াশা এখনো পরিষ্কার নয়।
তাই বিষয়টি এখনো পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। তালতলী এলাকাবাসীকে সতর্ক থাকার পাশাপাশি বাঘ আতঙ্ককে কেন্দ্র করে যেকোনো ঘটনায় দ্রুত যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।
লেখা ও পর্যবেক্ষণ- ইসমে আজম।
কৃতজ্ঞতায়ঃ H M Alam ও Abu Naim
[লেখাটি ফেসবুক থেকে নেয়া। বানান ও বক্তব্য লেখকের নিজস্ব।]
