কর্ণফুলীর বৃহৎ খননকাজ তথা ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের জন্য চীন থেকে আনা শক্তিশালী সাকশন ড্রেজার কাজ করতে পারছে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাদের ভাষ্য, ড্রেজারকে আটকে দিচ্ছে কর্ণফুলীর তলদেশে জমে থাকা পলিথিন। ৩১ ইঞ্চি ব্যাসের ড্রেজারটি ইতিমধ্যে কাজ শুরু করলেও ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টার বেশি খননকাজ চালাতে পারছে না। এর ফলে কাক্সিক্ষত গতি আসছে না নদীর নাব্য ফেরাতে চট্টগ্রাম বন্দরের ক্যাপিটাল ড্রেজিং প্রকল্পে। আট মাস আগে শুরু হওয়া প্রকল্পটিতে এই সময়ের মধ্যে সম্পূর্ণ কাজের ৫০ শতাংশ অগ্রগতি হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে হয়েছে মাত্র ৩০ শতাংশ।
প্রকল্প কর্মকর্তা ও চট্টগ্রাম বন্দরের চিফ হাইড্রোগ্রাফার কমান্ডার এম আরিফুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, কর্ণফুলী নদীর নিচে মাটির উপরিস্থলে অন্তত দুই থেকে তিন মিটার পলিথিনের স্তর জমেছে। আর এই পলিথিনই খননকাজে বড় বাধা হয়েছে দাঁড়িয়েছে। চীন থেকে আনা নতুন সাকশন ড্রেজারটিও পলিথিন আটকে কিছু সময় পরপর বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তা পরিষ্কার করে আবার খননকাজ শুরু করতে হচ্ছে। এর ফলে কাজের কাক্সিক্ষত গতি বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। বর্তমানে কাজের ৩০ শতাংশ অগ্রগতি হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পুরো খননকাজ শেষ করতে আরও তিন থেকে চার মাস সময় লাগতে পারে।
কর্ণফুলী নদীর নাব্য ফেরাতে প্রায় ২৫৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘সদরঘাট টু বাকলিয়ার চর ড্রেজিং’ শিরোনামের ড্রেজিং প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয় বন্দর কর্র্তৃপক্ষ। ই-ইঞ্জিনিয়ারিং ও চায়না হারবার নামে দুটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলাদেশ নৌবাহিনী প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পের আওতায় সদরঘাট থেকে উজানের দিকে বাকলিয়ার হামিদচর পর্যন্ত প্রায় আড়াই কিলোমিটার এলাকা খনন করে ৪৩ লাখ ঘনমিটার পলি ও মাটি তোলার কথা রয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর সূত্র জানায়, গত বছর ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে ২০ থেকে ২৬ ইঞ্চি ব্যাসের তিনটি ড্রেজার দিয়ে প্রকল্পটির কাজ শুরু করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু কর্ণফুলীর তলদেশ থেকে মাটি খনন করতে গিয়েই বিপাকে পড়ে তারা। সেখানে জমে থাকা পলিথিন, ময়লা ও প্লাস্টিক জাতীয় বিভিন্ন জিনিসের কারণে বারবার বন্ধ হয়ে পড়তে থাকে ড্রেজারগুলো। এর ফলে শুরু থেকেই স্বাভাবিক গতিতে প্রকল্পের কাজ এগোচ্ছিল না। খননকাজের জন্য গত বছর নভেম্বর মাসে চীন থেকে আসার কথা ছিল ৩১ ইঞ্চি ব্যাসের শক্তিশালী সাকশন ড্রেজার। কিন্তু সেই ড্রেজার আসে নির্ধারিত সময়ের পাঁচ মাস পর গত মার্চের মাঝামাঝিতে। এরপর আরও দুই মাস লেগে যায় ওই ড্রেজার দিয়ে খননকাজ শুরু করতে।
চট্টগ্রাম বন্দরের সিনিয়র হাইড্রোগ্রাফার নাসির উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, সাকশন ড্রেজার দিয়ে খননকৃত মাটি ফেলার জন্য প্রায় ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইন স্থাপন করতে হয়েছে। আর এতেই দেড় মাসের বেশি সময় লেগেছে। গত ১৬ মে থেকে ড্রেজারটি দিয়ে খননকাজ শুরু হয়েছে এবং প্রতিদিন গড়ে ৩০ হাজার ঘনমিটার পলি ও মাটি উঠছে। তিনি বলেন, মনে করা হয়েছিল ছোট ড্রেজারগুলোতে পলিথিনের কারণে যে সমস্যা হচ্ছিল সাকশন ড্রেজারে তা থাকবে না। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে সাকশন ড্রেজারও পলিথিনে আটকে যাচ্ছে। আধ ঘণ্টা পরপর তা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এরপর আটকে থাকা পলিথিন পরিষ্কার করে আবার খননকাজ শুরু করা হচ্ছে। এর ফলে কর্মঘণ্টা কমে যাচ্ছে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টার বেশি খননকাজ করা যাচ্ছে না। পাশাপাশি কর্ণফুলীর বিভিন্ন ঘাটকে ঘিরে যত্রতত্র বেঁধে রাখা নৌকাগুলোর কারণেও কাজের সমস্যা হচ্ছে।
সবগুলো ড্রেজার মিলে প্রতিদিন প্রায় ৩৮ হাজার ঘনমিটার মাটি খনন করা যাচ্ছে উল্লেখ করে বন্দরের সিনিয়র হাইড্রোগ্রাফার বলেন, প্রকল্পের কাজগুলো এখন দৃশ্যমান হচ্ছে।
প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা যায়, সাকশন ড্রেজার দিয়ে বর্তমানে ব্রিজঘাট এলাকার নিচের দিকে এবং অপর ড্রেজারগুলো দিয়ে শাহ আমানত সেতু থেকে ওপরের দিকে সৎসঙ্গ বিহারের কাছে মাটি খনন করা হচ্ছে। সেখান থেকে পাইপলাইনে এসব মাটি নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বাকলিয়ার চরে। সদরঘাট থেকে শাহ আমানত সেতু পর্যন্ত কর্ণফুলী নদীসংলগ্ন খালের মুখে জমে থাকা পলিমাটি পরিষ্কার করা হচ্ছে। প্রকল্প-সংশ্লিষ্টরা জানান, বাকলিয়ার চর এলাকায় ৪ লাখ ঘনমিটার মাটি ফেলার পর জুনের মাঝামাঝি থেকে হামিদচরে বঙ্গবন্ধু মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য প্রস্তাবিত স্থানে মাটি ফেলা শুরু হবে।
