নিয়োগ নিয়ে অচলাবস্থা কাটেনি

বঙ্গবন্ধুতে আন্দোলনকারী চিকিৎসকদের পুলিশের লাঠি

আপডেট : ১০ জুন ২০১৯, ০২:০০ এএম

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) চিকিৎসক নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগে আন্দোলনকারী চিকিৎসকদের ওপর লাঠিচার্জ করেছে পুলিশ ও বিশ^বিদ্যালয়ের আনসাররা। গতকাল রবিবার দুপুর ১২টার দিকে অর্ধশতাধিক আন্দোলনকারী চিকিৎসক নিয়োগের অনিয়মের ব্যাপারে উপাচার্যের সঙ্গে দেখা করতে গেলে উপাচার্যের কক্ষের সামনে হঠাৎ করেই পেছন থেকে তাদের ওপর এই লাঠিচার্জ করা হয়। এ সময় চিকিৎসকরা      

 

 মেঝেতে পড়ে গেলে বন্দুরের বাঁট দিয়ে আঘাত করে পুলিশ ও আনসাররা। আঘাতে অন্তত ২০ চিকিৎসক আহত হন। গুরুতর আহত ছয় চিকিৎসককে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে আন্দোলনকারী চিকিৎসকরা প্রশাসনিক ভবনের নিচতলায় নেমে অবস্থান নেন এবং অনশনে বসেন।

আন্দোলনকারী চিকিৎসকদের প্রতিনিধি ডা. মাঈদুল হাসান শিপন দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা শান্তিপূর্ণভাবে উপাচার্যের সঙ্গে নিয়োগের অনিয়মের ব্যাপারে কথা বলতে গিয়েছিলাম। বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসন কী সিদ্ধান্ত নিলেন তা জানতে গিয়েছিলাম। কিন্তু পুলিশ ও আনসাররা হঠাৎ করেই আমাদের ওপর লাঠিচার্জ করে।

ডা. শিপন বলেন, আমরা আনসারদের অনুমতি নিয়ে উপাচার্যের কক্ষের সামনে যাই। সেখানে শাহবাগ থানার ওসির নেতৃত্বে এক দল পুলিশ আমাদের ওপর এই হামলা চালায়। পরে আমরা কোনো ধরনের সংঘর্ষে না জড়িয়ে নিচে নেমে আসি ও অনশনে বসি। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমাদের এই অনশন কর্মসূচি চলবে। আমরা এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি। বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসনের ওপর আমাদের আর কোনো আস্থা নেই।

এর আগে আন্দোলনকারী চিকিৎসকরা সকাল ১১টার দিকে মেডিকেল অফিসার নিয়োগে আজ থেকে শুরু হওয়া মৌখিক পরীক্ষা বাতিলের দাবিতে ক্যাম্পাসে মিছিল বের করেন ও নিয়োগ পরীক্ষা বাতিল করে আবার গ্রহণের দাবি জানিয়ে সেøাগান দেন।

বিশ^বিদ্যালয় উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়–য়া অবশ্য লাঠিপেটার কথা অস্বীকার করেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, আন্দোলনকারী চিকিৎসকদের কয়েকজন আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল। আনসারদের সঙ্গে তাদের ধাক্কাধাক্কি হয়েছে। পরে চিকিৎসকরা দেখা না করেই নেমে গেছে। এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক। অফিস শেষ করে আমি তো তাদের সামনে দিয়েই এসেছি।

লাঠিপেটার অভিযোগ অস্বীকার করে শাহবাগ থানার ওসি আবুল হাসান বলেন, পুলিশ কোনো লাঠিচার্জ করেনি, আন্দোলনকারীরা ওপরে উঠেছিল, তাদের নামিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এ ব্যাপারে ডা. শিপন বলেন, পুলিশ কোনো ধরনের উসকানি ছাড়াই আমাদের ওপর লাঠিচার্জ করেছে। আমরা শান্তিপূর্ণভাবেই উপাচার্যের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। পরে দুপুর আড়াইটার দিকে মেডিসিন বিভাগের ডিন এসে আমাদের সরে যেতে বলেন। এর কিছুক্ষণ পর উপাচার্য আমাদের সামনে দিয়ে বিশ^বিদ্যালয় ত্যাগ করেন। এ সময় তিনি আমাদের সঙ্গে কোনো কথা বলেননি।

এদিকে নিয়োগ বাতিলের দাবিতে চিকিৎসকদের আন্দোলনের মুখেই গত ৩ জুন সোমবার মৌখিক পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করা হয়। আজ সোমবার থেকে উপাচার্যের কক্ষে এই মৌখিক পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা। আন্দোলনকারী চিকিৎসকরা অবশ্য মৌখিক পরীক্ষা প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েছেন। ফলে আজ এই মৌখিক পরীক্ষা ও তা প্রতিহতে আন্দোলনকারী চিকিৎসকদের অনশন কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে যেকোনো ধরনের উদ্বেগজনক পরিস্থিতির আশঙ্কা করছেন বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

বিশ^বিদ্যালয় উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়–য়া অবশ্য ‘মৌখিক পরীক্ষা হবে’ বলে জানান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বলেছি বিশ^বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে। এজন্য ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

এর আগে গত বৃহস্পতিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনে রেজিস্ট্রারের কক্ষের সামনে থেকে পেট্রলবোমা উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনাকে বিক্ষোভকারী চিকিৎসকদের নাশকতা বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া। আজ থেকে শুরু হওয়া চিকিৎসক নিয়োগের মৌখিক পরীক্ষা বানচালের অপচেষ্টা হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। এ ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।

গত ২০ মার্চ বিএসএমএমইউতে ২০০ চিকিৎসক নিয়োগ পরীক্ষার ফল মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রকাশিত হয়। ১৮০ জন মেডিকেল অফিসার ও ২০ জন ডেন্টাল চিকিৎসক পদে ২০০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষায় ৮ হাজার ৫৫৭ জন চিকিৎসক অংশগ্রহণ করেন। লিখিত পরীক্ষায় এক পদের জন্য চারজন পাস করেন। এ হিসাবে ৭৩৯ জন মেডিকেল অফিসার ও ডেন্টালের ৮১ জন মিলে মোট ৮২০ জন লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ফল ঘোষণার পরপরই বিক্ষোভে ফেটে পড়েন ‘সুযোগবঞ্চিত’ চিকিৎসকরা। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের বিভিন্ন দেয়ালে ‘ছেলের জন্য সাজানো নিয়োগ, লজ্জা, ভিসি লজ্জা, ভিসির পদত্যাগ চাই!, অর্থের বিনিময়ে এ নিয়োগ মানি না, মানবো না, প্রশ্ন ফাঁসের এ নিয়োগ কাদের জন্য, আমাদের সংগ্রাম চলছে, চলবে’Ñ সেøাগান লেখা পোস্টার সেঁটে দেন।

তবে বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্যের দাবি, সঠিক নিয়ম মেনে পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়েছে। কোনো অনিয়ম হয়নি। এর আগেও ফল প্রকাশের পর তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের বলেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা অনুযায়ী সম্পূর্ণ মেধাভিত্তিতে ফল প্রকাশিত হচ্ছে। মেধাবীরাই চিকিৎসক হিসেবে নিয়োগ পাবেন। এ ক্ষেত্রে কোনো চাপের কাছে নতিস্বীকার করা হবে না।

আন্দোলনকারী চিকিৎসকরা বলেন, ভর্তি পরীক্ষার ফলাফলে নজিরবিহীন অনিয়ম হয়েছে। উপাচার্য ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকসহ তাদের স্বজনদের নিয়োগ দিতে ফল ট্যাম্পারিং করা হয়েছে। ছয়টি অনিয়ম স্পষ্ট। এসব তথ্য ও প্রমাণ বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে দেওয়া হয়েছে।

ডা. শিপন বলেন, আমরা এ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিভিন্ন কোর্সে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেছি। এখানে আমাদের চাকরি হবে বলে প্রত্যাশা করেছিলাম। কিন্তু অনিয়মের কারণেই আমরা বাদ পড়েছি। ভিসি স্যার নিজেই নিয়োগ বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত। এই নিয়োগে ব্যাপক হারে আত্মীয়করণ, অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত