প্রায়োগিক নির্দেশনার বাস্তবিক পদক্ষেপ নিন

আপডেট : ১৩ জুন ২০১৯, ১১:৪২ পিএম

৮ দশমিক ২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে কম আয় সত্ত্বেও বিপুল ব্যয়ের উচ্চাকাক্সক্ষী বাজেট জাতীয় সংসদে পেশ করেছেন অর্থমন্ত্রী

আ হ ম মুস্তফা কামাল। দেশের ইতিহাসের বৃহত্তম এই বাজেট মোট ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার। এতে নতুন অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার ধরা হয়েছে ৮ দশমিক ২০ শতাংশ। অন্যদিকে, নতুন বাজেটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৮১০ কোটি টাকা। আগের বছরের চেয়ে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা বাড়ছে ৩৮ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ২৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এনবিআর-বহির্ভূত করব্যবস্থা থেকে আসবে ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং বিভিন্ন সেবামূলক থেকে ৩৭ হাজার ৭১০ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য ঠিক করে রাখা হয়েছে। এ হিসাবে আগামী বাজেটে ঘাটতি থাকছে জিডিপির ৫ শতাংশ। মোট ঘাটতি ১ লাখ ৪৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা।

 

প্রাথমিক পর্যালোচনায় মনে হয়েছে, এই বাজেটে কাক্সিক্ষত প্রবৃদ্ধি অর্জনে অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে। কেননা, বিপুল ঘাটতি ও কম আয়ের পাশাপাশি বাজেটে লক্ষ্য পূরণের জন্য বিভিন্ন খাতে যথাযথ প্রায়োগিক নির্দেশনার অভাব রয়েছে। ভুলে গেলে চলবে না যে সর্বশেষ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নের হার ছিল মাত্র ৭৬ শতাংশ। অন্যদিকে, কাক্সিক্ষত উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে অনেক বেশি জোর দেওয়া হলেও আর্থিক খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাঠামোগত এবং আইনগত সংস্কারের লক্ষ্যে তেমন কোনো জোরালো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। অর্থনীতির আকার বড় হতে থাকলেও এই অর্থনৈতিক উন্নয়নকে টেকসই করার জন্য যে সামাজিক প্রগতি প্রয়োজন সে লক্ষ্যে খুব একটা অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। এজন্য প্রয়োজনীয় কিছু ক্ষেত্রে বরাদ্দ বাড়লেও মানবসম্পদ উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের মতো মৌলিক বিষয়গুলোতে কাঠামোগত সংস্কারের কর্মসূচি অপ্রতুল।

 

জাতিসংঘের ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল কমিশন ফর এশিয়া অ্যান্ড প্যাসিফিকের (এসকাপ) ২০১৮ সালের অর্থনৈতিক ও সামাজিক জরিপ অনুযায়ী, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ৫২টি দেশের মধ্যে জিডিপির অনুপাতে স্বাস্থ্য খাতে সবচেয়ে কম খরচ করা হয় বাংলাদেশে। শিক্ষা খাতে এ অঞ্চলের ৩৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৩৪তম। ২০১৯-২০ অর্থবছরের শিক্ষা বাজেটে মোট ৮৭ হাজার ৬২০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে যা মোট বাজেট বরাদ্দের ১৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এটা জিডিপির ৩ দশমিক ০৪ শতাংশ এবং এখন পর্যন্ত বাজেটে শিক্ষায় সর্বোচ্চ বরাদ্দ। কিন্তু শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়লেও শিক্ষা কাঠামোর প্রয়োজনীয় কোনো সংস্কার পরিকল্পনা এখানে দেখা যাচ্ছে না। একইভাবে তরুণ প্রজন্মকে দক্ষ মানব সম্পদে রূপান্তরিত করার লক্ষ্যেও বড় কোনো পরিকল্পনা দেখা যায়নি। উল্লেখ্য, গত অক্টোবরে বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত দক্ষ মানব সম্পদ সূচকে ১৫৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৬তম।

 

এই বাজেটের অন্যতম আলোচিত বিষয় ছিল নতুন ভ্যাট আইন। অবশ্য ব্যবসায়ীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নতুন আইনে পাঁচটি ধাপে ভাগ করে ভ্যাট কার্যকর করায় নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা কমেছে। অন্যদিকে, অনেক জল্পনা থাকলেও করমুক্ত আয়সীমা কমেওনি, বাড়েওনি। সাধারণ করদাতাদের এই সীমা আগের মতো আড়াই লাখ টাকাই আছে এবং নারী ও ৬৫ বছরের বেশি বয়সী করদাতাদের ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত কর দিতে হবে না। পুঁজিবাজারে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বাড়তি সুবিধা দিতে করমুক্ত লভ্যাংশ আয়ের সীমা ২৫ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৫০ হাজার টাকা করা হয়েছে। কিন্তু বিনিয়োগকারী ও শিল্প উদ্যোক্তাদের দীর্ঘদিনের দাবি সত্ত্বেও করপোরেট করহার কমেনি। এছাড়া তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানিতে প্রণোদনা দিতে বাজেটে আরও দুই হাজার ৮২৫ কোটি টাকার বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।

 

বাজেট একটা সরকারের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পদক্ষেপ। কিন্তু আমাদের দেশে দীর্ঘদিনের মতোই রাজনৈতিক অর্থনীতিকে যথাযথ গুরুত্ব না দিয়েই অর্থনৈতিক উন্নয়নের পরিকল্পনা ও কর্মসূচি বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে এবারও কোনো পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে না। কেননা দেশে ক্রমবর্ধমান ধনী-দরিদ্র বৈষম্য কমানোর লক্ষ্যে মনোযোগ দিয়ে কোনো কর্মসূচি নেওয়া হয়নি এই বাজেটে। এতে বাস্তবিক কোনো নতুন চমক যেমন দেখা যায়নি, তেমনি কম আয় নিয়ে লক্ষ্যপূরণের এত ব্যয়ের এই বাজেট কীভাবে বাস্তবায়িত হবে তারও কোনো যথাযথ নির্দেশনা দেখা যায়নি। এ অবস্থায় বাজেট বাস্তবায়নে যথাযথ নির্দেশনামূলক বাস্তবিক পদক্ষেপ গ্রহণ করার কোনো বিকল্প নেই।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত