বৃষ্টিভেজা বিশ্বকাপে সৃষ্টিছাড়া আনন্দের একটি বল!

আপডেট : ১৮ জুন ২০১৯, ০২:২৯ এএম

রোহিত শর্মায় মোহিত বিশ্ব। বিরাটত্বে কোহলি আকাশে। বিশ্বকাপে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের হ্যাংওভার সহজে কাটতে চায় না। আর, ভাবতে ভাবতে হঠাৎই উঠে আসে একটা বল। বাঁহাতি রিস্ট স্পিনারের। ডানহাতি ব্যাটসম্যানকে টেনে বাইরে এনে ফেলার পরিস্থিতি তৈরি করে বলটা ভেতরে ঢুকে আসে। ব্যাটসম্যান হতচকিত হয়ে দেখে, অনড় জিং বেলও মাটি ধরেছে! বোলার তখন হাত ঘুরিয়ে ‘জিঙ্গল বেল জিঙ্গল বেল’ নৃত্যরত।

বছর ২৬ আগে ঘটনাটা ঘটেছিল। একদিনের ম্যাচে নয়, টেস্টে। ব্যাটসম্যান ছিলেন মাইক গ্যাটিং। বল হাতে স্ফীতোদর এক লেগ স্পিনার, বছর দুই আগে যাকে টেস্ট অভিষেকে রবি শাস্ত্রী আর শচীন টেন্ডুলকার বল হাতে ডাবল সেঞ্চুরি দিতে বাধ্য করেছিলেন। ইংল্যান্ডের মাটিতে তার প্রথম বল তাকে এনে দিয়েছিল বিশ্বসেরার খ্যাতি। লেগ স্টাম্পের অনেকটা বাইরে পড়ে বল গ্যাটিংয়ের পায়ের পেছন দিয়ে ঘুরে এসে ভেঙে দিয়েছিল স্টাম্প। ধারাভাষ্যে তখন ছিলেন আরেক লেগ স্পিনার রিচি বেনো। মাইক হাতেও কম কথার মানুষ রিচিই বোধহয় বলে ফেলেছিলেন, ‘বল অফ দ্য সেঞ্চুরি’!

ইংল্যান্ডের মাটিতে শেন ওয়ার্নের প্রথম বল এখনো ক্রিকেটপ্রেমীদের আলোচনায়। মুগ্ধতার আবেশ তাকে ঘিরে। বল করতে আসতেন, মনেই হতো না। চার পা হেঁটে দুটো স্টেপ ছোট দৌড়। বল ভেলকি দেখাত। ভারতের বিপক্ষে যদিও কখনো তেমন সফল হতে পারেননি, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং ইংল্যান্ডের ব্যাটসম্যানরা, যারা স্পিন খেলতে হবে ভেবেই ভীত, ওয়ার্নিকে দিয়েছিলেন বিশ্বসেরার সমীহ ও সম্মান। ইংল্যান্ডের কাউন্টি-কাউন্টিতে কান পেতে রাখুন। নিশ্চিত শুনবেন ওয়ার্নির ওয়ার্নিং!

ভারতের কুলদিপ যাদবের বলটা কি এবারের বিশ্বকাপে সেরা? শতাব্দীসেরা হবে না। প্রথমত ওই বলে ইংল্যান্ডের কোনো ব্যাটসম্যান আউট হননি। প্রতিযোগিতার শেষ পর্বে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেলার দিন যদি আবারও তেমনই একটি বল কুলদিপের হাত থেকে বেরিয়ে এসে ভেঙে দেয় জো রুট বা জস বাটলারের স্টাম্প, হলেও হতে পারে। আপাতত সে খানিক দূরের ভবিষ্যৎ। এখন বরং ভাবা যাক, বিশ্বকাপের সেরা বল কি না! সেরা ক্যাচ, সেরা ইনিংস, সেরা স্পেল নিয়ে যদি তর্ক করে যেতে পারেন ক্রিকেটপ্রেমীরা, কেনই বা সেরা বল নিয়ে করবেন না?

পরিস্থিতি ভাবুন। সেই আইপিএল থেকে শুরু। উইকেট পাচ্ছিলেন না কুলদিপ। বিশ্বকাপে শাস্ত্রী-কোহলি তাকে নিয়ে এসেছিলেন বিশেষ অস্ত্র হিসেবেই। বাঁহাতি রিস্ট স্পিনারের আকাল এখন ক্রিকেট দুনিয়ায়। আর কোনো দলেই নেই দ্বিতীয় কুলদিপ। কিন্তু কুলদিপেরও তো উইকেট ছিল না! দুটি ম্যাচে মাত্র একটি। তাদের কুল-চা জুটির যুজবেন্দ্র চাহাল নিয়মিত উইকেট তুলছেন। দলে থাকবেন কি না, জোর তর্ক। তবুও শাস্ত্রী-কোহলি তাকে বাদ দেওয়ার কথা ভাবলেনই না। ব্যর্থ হলে, তাও পাকিস্তানের বিপক্ষে, পরের ম্যাচগুলোয় প্রথম এগারোয় সুযোগ পাওয়া সমস্যা। মানসিক এ চাপ নিয়েই বল করতে শুরু করেছিলেন কুলদিপ।

প্রথম উইকেটে চটপট হারিয়ে পাকিস্তান তখন ফখর জামান আর বাবর আজম ঘিরে ফিরে আসার লড়াইয়ে। বোর্ডে ১১৩ রান, বিপক্ষে পাকিস্তানের সেরা জুটি। ৩৩৬ অনেক বড় লক্ষ্য হলেও, এই দুজন টিকে গেলে কী হবে, বলা মুশকিল। কুলদিপকে সাহস জুগিয়ে গেলেন অধিনায়ক। নিজের ষষ্ঠ ওভারে এল সেই মুহূর্ত, যার জন্য কুলদিপের সঙ্গেই হয়তো গোটা ভারত পথ চেয়ে বসেছিল। নির্ভেজাল ক্রিকেট-আনন্দ, ব্যক্তিগত স্কিলের ছটায় উদ্ভাসিত তখন ওল্ড ট্র্যাফোর্ড।

তরুণদের প্রতি থাকে অপ্রত্যাশিতের প্রত্যাশা। যা কখনো ভাবা যায়নি, এমন কিছু ঘটিয়ে ফেলতে পারেন তারা। ‘সিজনড ক্যাম্পেইনার’ বা অভিজ্ঞতায় পরিপূর্ণ যারা, সচরাচর তেমন কিছু করতে রাজি হন না, যাতে বিপদের ছিটেফোঁটা আছে। ছায়ার সঙ্গে যুদ্ধ ঠিক নয়, কিন্তু নিজেদের অতীতের সঙ্গে যুদ্ধটা অবচেতনেই থেকে যায়। শৃঙ্খলার বেড়ির বাঁধন। অমন একটা মুহূর্তে যখন কিছুই ঠিকঠাক চলছে না, বলে বাড়তি ফ্লাইট আনার ভাবনাটাও তেমনই, বাঁধনছেঁড়ার আনন্দে ভরপুর। না হলে, বিদেশের মাটিতে, চিরশত্রুর দেশে কেনই বা বড় স্পিন করানোর চেষ্টা করবেন প্রথম ডেলিভারিতেই ওয়ার্ন? কুলদিপের কথায় ওয়ার্নকে টেনে আনা কিন্তু একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক নয়। জহির খান হতে চেয়েছিল ছোট কুলদিপ। তার শরীরের কাঠামো তাকে বাঁহাতি ফাস্ট বোলার হতে দেয়নি। তারপর প্রাণমন সঁপে দিয়েছিলেন বাঁহাতি রিস্ট স্পিনে। আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা দেখে গিয়েছেন ওয়ার্নের বোলিং-ভিডিও। ওয়ার্নের চলাফেরা, বোলিং ক্রিজের ব্যবহার, কোণ তৈরি করা। দেখে শেখা, শেখার চেষ্টা করা। বৃষ্টিভেজা বিশ্বকাপে তাই তো তিনি এনে দিতে পারেন সৃষ্টিছাড়া আনন্দ, ছলনাময়ী বলে। শুধুই একটা বলে যখন ঘুরে যায় ম্যাচের গতি। বাঁক নেয় ম্যাচ, বলের মতোই। দ্রুত, চকিত।

ম্যাচের সেরা হয়তো কুলদিপ যাদব নন। স্মৃতিতে থেকে যাবেন তবু, একটি বলের কারণেই শুধু। ঠিক যেমন থেকে গিয়েছেন তার গুরু, গত শতাব্দীর সেরা বলের মালিক!

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত