প্রথমবারের মতো এমপি হয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের মহুয়া মৈত্র ভারতীয় লোকসভায় প্রথম ভাষণেই তোলপাড় সৃষ্টি করেছেন। মঙ্গলবার তিনি ফ্যাসিবাদ বা কর্তৃত্ববাদী জাতীয়তাবাদের প্রাথমিক লক্ষণ উল্লেখ করে বক্তব্য দেন।
ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসি’র বাংলা সংস্করণের প্রতিবেদনে জানা যায়, মহুয়ার ভাষণকে ‘বছরের সেরা’ আখ্যা দিয়েছেন দেশটির অনেকে।
বিরোধী এমপি মহুয়া মৈত্র বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের হলোকাস্ট মেমোরিয়াল মিউজিয়ামে একটি পোস্টারে তিনি ফ্যাসিবাদের প্রাথমিক লক্ষণের এক তালিকা দেখেছিলেন।
তালিকার সে সব লক্ষণ তিনি একে একে পড়ে শুনিয়ে বলেন, ভারতের সংবিধান হুমকির মুখে। ক্ষমতাসীন দলের ‘বিভক্তির রাজনীতি’র কারণে দেশ এখন ‘ছিঁড়ে টুকরো’ হয়ে যাচ্ছে।
বিজেপির বিজয় উল্লেখ করে বক্তব্য রাখতে শুরু করেন মহুয়া। বলেন, “এখন এই বিপুল জয়ের একটি প্রধান দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায় ভিন্নমত অবলম্বনকারীদের স্বর যাতে ‘শোনা না যায়’ তা নিশ্চিত করা।”
মহুয়ার মতে ফ্যাসিবাদের সাতটি প্রাথমিক লক্ষণ:
১. শক্তিশালী ও ধারাবাহিক জাতীয়তাবাদ ক্রমে দেশের জাতীয় পরিচয়ে পরিণত হয়। আসলে এর কোনো গভীরতা নেই। বলেন, “এটা বর্ণবাদ ও সংকীর্ণ ভাবনা। এটা বিভক্তি বাড়ায় আর কোনোভাবেই ঐক্যের চেষ্টা করে না।”
২. ‘মানবাধিকারের প্রতি ব্যাপক অবজ্ঞা’ দেখা যাচ্ছে, যা ২০১৪ থেকে ২০১৯ এর মধ্যে অন্তত ১০গুন বেড়েছে।
৩. গণমাধ্যমের ওপর কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের কড়া সমালোচনা করে বলেন, “ভারতের টিভি চ্যানেলগুলো নিজেদের এয়ারটাইমের বড় অংশ ক্ষমতাসীন দলের প্রচার-প্রোপাগান্ডায় ব্যয় করেছে।”
৪. জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বাড়তি সচেতনতার জন্য ভারতে এক ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করা হয়েছে এবং প্রতিনিয়ত নতুন শত্রু তৈরি করা হচ্ছে।
৫. “সরকার ও ধর্ম পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। এ সম্পর্কে কি আমার বলবার প্রয়োজন আছে? আমার কি বলার প্রয়োজন আছে যে নাগরিক হওয়ার মানে কী সেটাই আমরা বদলে দিয়েছি?” আরও উল্লেখ করেন মুসলমানদের টার্গেট করে আইনে সংশোধন আনা হয়েছে।
৬. বুদ্ধিজীবী ও শিল্পের প্রতি চরম অবজ্ঞা দেখানো হয়েছে, এবং ভিন্ন মতাবলম্বীদের ওপর শোষণ চালানো হয়েছে। একে ফ্যাসিবাদের সব চিহ্নের মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিকর উল্লেখ করে মহুয়া বলেন, “এটা ভারতকে অন্ধকার যুগে নিয়ে গেছে।”
৭. দেশটির নির্বাচন ব্যবস্থার স্বাধীনতা নষ্ট হয়ে গেছে। তার মতে, এটি ফ্যাসিবাদের শেষ চিহ্ন।
জেপি মর্গানের সাবেক ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকার মহুয়া মৈত্র রাজনীতিতে নামার উদ্দেশে ২০০৯ সালে লন্ডনে চাকরিতে ইস্তফা দেন। কয়েক বছর ধরে তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের জাতীয় মুখপাত্র হিসেবে কাজ করছিলেন এবং নিয়মিত টেলিভিশন বিতর্কে অংশ নিতেন।
নির্বাচনী প্রচারণার সময় সব বক্তৃতায় নরেন্দ্র মোদিকে আক্রমণ করে জ্বালাময়ী বক্তব্য রাখেন মহুয়া। কাশ্মীরে ভয়াবহ আত্মঘাতী হামলা ও পাকিস্তানে চালানো ভারতের বিমান হামলার সমালোচনা করেন। তার মতে, ওই ঘটনাগুলোতে হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে বিভক্তি তৈরির চেষ্টা চালায় বিজেপি।
লোকসভায় দশ মিনিট বক্তৃতার পুরো সময় সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা হট্টগোল করে মহুয়াকে থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে বিচলিত না হয়ে তিনি বক্তব্য করেন বলে জানায় বিবিসি।
নানা তথ্য উপাত্ত ব্যবহার করে ১০ মিনিট ধরে ইংরেজিতে বক্তব্য রাখেন মহুয়া মৈত্র, মাঝখানে হিন্দিতে কয়েক ছত্র কবিতার উদ্ধৃতি দেন। মহুয়ার এই ভাষণ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রশংসা পাচ্ছেন।
