মন্ত্রীদের সফর ফিরিস্তিতে বিরক্ত প্রধানমন্ত্রী

আপডেট : ০৬ জুলাই ২০১৯, ০১:৩৯ এএম

মন্ত্রীদের সফরবৃত্তান্ত শুনতে গিয়ে মন্ত্রিসভার মূল্যবান সময় নষ্ট হচ্ছে। মন্ত্রীরা তাদের বিদেশ সফরের অর্জন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে মন্ত্রিসভার সদস্যদের সামনে বিশদভাবে উপস্থাপন করায় মন্ত্রিসভার শ্রমঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। এই অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রীদের বিদেশ সফরের বৃত্তান্ত সংক্ষিপ্ত আকারে মৌখিকভাবে মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের নির্দেশ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর এ অনুশাসন লিখিত আকারে গতকাল বৃহস্পতিবার সব মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীকে জানানো হয়েছে।  

আইনি বাধ্যবাধকতা থাকায় মন্ত্রীরা যেসব দেশে সরকারি সফরে যাচ্ছেন সেসব দেশে সফরের সারসংক্ষেপ মন্ত্রিসভার অবগতির জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠাতে হয়। পরে মন্ত্রিসভা বৈঠকে সম্পূর্ণ সারসংক্ষেপটি মৌখিকভাবে উপস্থাপন করতে হয়।

একজন মন্ত্রী নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে জানান, গত ২৪ জুন মন্ত্রিসভার সর্বশেষ অনুষ্ঠিত বৈঠকের এজেন্ডা ছিল ১৩টি। এর মধ্যে দুটি এজেন্ডা ছিল আইনের খসড়া চূড়ান্তকরণ সংক্রান্ত। একটি করে এজেন্ডা ছিল নীতিমালার খসড়া অনুমোদন এবং সিদ্ধান্ত বাতিলের প্রস্তাব অনুমোদনের। বাকি ৯টি এজেন্ডা ছিল মন্ত্রীদের বিদেশ সফরসংক্রান্ত। এসব এজেন্ডা শুনতে শুনতে অনেক মন্ত্রী বিরক্ত হয়েছেন। একপর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রীদের বিদেশ সফর অবহিতকরণ সংক্রান্ত বিষয়গুলো সংক্ষিপ্ত আকারে উপস্থাপনের অনুশাসন দেন।

অপর এক সিনিয়র মন্ত্রী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মন্ত্রীরা হরদমই বিদেশ যান। গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অংশগ্রহণ করার জন্য যেমন যাচ্ছেন, তেমনি গুরুত্বহীন বৈঠকেও অনেকে অংশ নেন। মন্ত্রীরা বিদেশ গেলেও তার একটি প্রতিবেদন মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করতে হয়। সেটি আবার মন্ত্রীকেই পড়ে শোনাতে হয়। কোনো মন্ত্রী ইচ্ছা করলে তার মন্ত্রণালয়ের সচিবকে ডেকেও সফরবৃত্তান্ত পড়ে শোনানোর অনুরোধ করতে পারেন। তবে সাধারণত মন্ত্রীরাই সফরের সারসংক্ষেপ পড়ে শোনান। মন্ত্রীরা প্রায় সব সময়ই বিশদভাবে তার বিদেশ সফরের খুঁটিনাটি প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরেন। তারা কার সঙ্গে বৈঠক করেছেন, সেসব বৈঠকে কী বলেছেন এসব বিষয়ও স্থান পায়। অনেক সময় মন্ত্রীরা সারসংক্ষেপের বাইরে গিয়েও নানা তথ্য তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফর থাকলে সব মন্ত্রীই গুরুত্ব দিয়ে শোনেন। মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের বিদেশ সফরের সারসংক্ষেপ অন্য মন্ত্রীরা গুরুত্ব দিয়ে শোনেন না। প্রধানমন্ত্রী যে অনুশাসন দিয়েছেন তা যথাযথ। তিনি বলেছেন সংক্ষেপে বিদেশ সফরের সারসংক্ষেপ তুলে ধরতে। আর সম্প্রতি যেসব বৈঠক হচ্ছে তাতে মন্ত্রীদের বিদেশ সফরের অবহিতকরণের এজেন্ডাই বেশি থাকে। এসব বিষয় শুনতে গিয়ে মূল বিষয় অনেক সময় গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে।

একজন সাবেক মন্ত্রপরিষদ সচিব জানিয়েছেন, মন্ত্রিসভায় যেসব এজেন্ডা থাকে তা বৈঠকের কয়েক দিন আগেই মন্ত্রীদের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এসব এজেন্ডা আগে পাঠিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য হচ্ছে মন্ত্রীরা যেন ভালোভাবে স্টাডি করে বৈঠকে অংশ নিতে পারেন। কিন্তু বেশিরভাগ মন্ত্রীই এসব এজেন্ডা পাঠ করেন না। অনেক মন্ত্রী নিজের মন্ত্রণালয়ের এজেন্ডাটিও ভালোভাবে রপ্ত করে আসেন না। তারা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিবের ওপর নির্ভর করেন। এ বিষয়গুলোও প্রধানমন্ত্রীর নজরে এসেছে। প্রধানমন্ত্রী একাধিকবার মন্ত্রীদের বৈঠকের বিষয়গুলো ভালোভাবে স্টাডি করে মন্ত্রিসভায় যোগ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। বিশেষ করে গত মেয়াদে তিনি এ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে কয়েকবার মন্ত্রিসভা বৈঠকে বলেছিলেন। এবারও প্রথম বৈঠকে তিনি এসব বিষয়ে মন্ত্রীদের সতর্ক করেছেন।

সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, মন্ত্রীদের বিদেশ সফরের সারসংক্ষেপ একটি নির্ধারিত ফরমেটে উপস্থাপন করা যায়। যে সফরটি গুরুত্বপূর্ণ সে সফরের সারসংক্ষেপ পাঠ করে শোনানো যেতে পারে। যেগুলো গুরুত্বহীন সেগুলো পাঠ না করলেও চলে। মন্ত্রিসভার শ্রমঘণ্টা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় সেভ করা উচিত।

গত ২৪ জুন অনুষ্ঠিত সবশেষ মন্ত্রিসভা বৈঠকে ৫ মন্ত্রীর ৯ বিদেশ সফরের এজেন্ডা ছিল। গত ২০ থেকে ৩০ মে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অনুষ্ঠিত ৭২তম বিশ^ স্বাস্থ্য সম্মেলন এবং বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার নির্বাহী বোর্ডের সভায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের অংশগ্রহণ সম্পর্কে মন্ত্রিসভাকে অবহিত করা হয়। গত ২৭ থেকে ৩১ মে কেনিয়ার নাইরোবিতে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের হ্যাবিট্যাট অ্যাসেম্বলিতে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী রেজাউল করীমের নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের অংশগ্রহণ সম্পর্কে মন্ত্রিসভাকে অবহিত করা হয়। গত ৮ ও ৯ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে অষ্টম জাতিসংঘ যুব ফোরাম এবং বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ ভবনের স্থপতি লুই কানের স্থাপত্যশিল্পের ওপর আয়োজিত ছবি প্রদর্শনীতে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. জাহিদ আহসান রাসেলের অংশগ্রহণ সম্পর্কে মন্ত্রিসভাকে অবহিত করা হয়।

এ ছাড়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনের আর্জেন্টিনা, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব এবং প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর সম্পর্কে অবহিত করা হয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্জেন্টিনা সফর করেছিলেন জাতিসংঘের সাউথ-সাউথ কো-অপারেশনের বৈঠকে অংশগ্রহণ করার জন্য। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সৌদি আরবে অনুষ্ঠিত ওআইসি সম্মেলনে অংশগ্রহণ সম্পর্কেও মন্ত্রিসভাকে জানানো হয়। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম সুইজারল্যান্ড সফর করেছিলেন রোহিঙ্গাবিষয়ক বৈঠকে অংশগ্রহণ করার জন্য।

এ ছাড়া বৈঠকে ‘বাংলাদেশ পতাকাবাহী জাহাজ (সুরক্ষা) আইন, ২০১৯’ এবং ‘বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আইন, ২০১৯’-এর খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। বৈঠকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট পদক নীতিমালা, ২০১৯’ এবং বাংলাদেশ ও স্পেনের মধ্যে চুক্তির খসড়া অনুমোদন সংক্রান্ত ইতিপূর্বে গৃহীত মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত বাতিলের প্রস্তাব অনুমোদনের খসড়ার অনুমোদন দেওয়া হয়।   

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত