আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো তার স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নির আইনজীবীদের করা দুটি আবেদন খারিজ করে দিয়েছে বরগুনার আদালত। গতকাল সোমবার সকালে চিকিৎসা এবং আদালতে ১৬৪ ধারায় দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রত্যাহারের আবেদনে স্বাক্ষর নিতে মিন্নিকে আদালতে হাজির করতে ওই দুটি আবেদন করেন তার আইনজীবী মাহবুবুল বারী আসলাম। পরে দুপুর ১২টার দিকে বরগুনার জ্যেষ্ঠ বিচারিকদুই আবেদন আদালতে খারিজ
হাকিম মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম গাজী আবেদন দুটি খারিজ করে দিয়ে বলেন, জেল কর্র্তৃপক্ষ এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এর আগে গত রবিবার একই আদালতে মিন্নির জামিনের জন্য আবেদন করা হলে বিচারক তা নাকচ করে দেন। সোমবার করা আবেদনের ব্যাপারে জানতে চাইলে আইনজীবী মাহবুবুল বারী আসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি আয়শা সিদ্দিকা মিন্নির পক্ষে তার চিকিৎসাসহ দুটি আবেদন করেছিলাম। আদালত দুটি আবেদনই নামঞ্জুর করেছেন। এর মধ্যে একটি আবেদন ছিল মিন্নির চিকিৎসা চেয়ে। অন্যটি ছিল ১৬৪ ধারার দেওয়া স্বীকারোক্তি প্রত্যাখ্যানের আবেদনে মিন্নির স্বাক্ষরের জন্য তাকে আদালতে হাজির করতে (প্রডাকশন ওয়ারেন্ট) অনুমতি চেয়ে। কিন্তু আদালত আবেদন নামঞ্জুর করেছেন।’
আইনজীবী আসলাম আরও বলেন, ‘আদালত বলেছেন, আবেদন দুটির বিষয়ে কারা কর্র্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। এ ছাড়া মিন্নির জামিনের জন্য আমরা আদেশের সইমোহর তোলার জন্য আবেদন করেছি। আজ (সোমবার) সন্ধ্যায় অথবা কাল এই আদেশের কপি আমরা পাব। যখনই পাব, তখনই আমরা জামিনের আবেদন করব।’
গত শুক্রবার বিচারক মোহাম্মাদ সিরাজুল ইসলাম গাজীর আদালতে রিফাত হত্যায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে স্বেচ্ছায় ১৬৪ ধারায় মিন্নির জবানবন্দি দেওয়ার কথা জানিয়েছিল পুলিশ। অবশ্য তার বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোরের অভিযোগ, নির্যাতন ও জোরজবরদস্তি করে তার মেয়েকে ওই জবানবন্দি দিতে বাধ্য করা হয়। আর এসব কিছুই হচ্ছে স্থানীয় সাংসদ ও আওয়ামী লীগ নেতা ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু এবং তার ছেলে বরগুনা জেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক সুনাম দেবনাথের প্রভাবে।
গত ২৬ জুন বরগুনা সরকারি কলেজের সামনের সড়কে বহু পথচারীর সামনে রিফাতকে প্রকাশ্য কুপিয়ে হত্যার সময় স্বামীকে বাঁচাতে মিন্নির প্রচেষ্টার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ঘটনাটি নিয়ে দেশব্যাপী তোলপাড় শুরু হয়। পরদিন রিফাতের বাবা দুলাল শরীফ বাদী হয়ে ১২ জনকে আসামি করে একটি মামলা করেন। ওই মামলার প্রধান সাক্ষী করা হয়েছিল মিন্নিকে। কিন্তু ১৩ জুলাই বরগুনা প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে পুত্রবধূ মিন্নির বিরুদ্ধে এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ তোলেন দুলাল শরীফ। যদিও শ্বশুরের অভিযোগের পর মিন্নি তা অস্বীকার করে পাল্টা বলেছিলেন, দুলাল শরীফ ‘ষড়যন্ত্রকারীদের প্ররোচনায়’ পড়ে তাকে জড়িয়ে ‘বানোয়াট’ কথা বলছেন। পরদিন রবিবার মিন্নিকে গ্রেপ্তারের দাবিতে বরগুনা প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন হয়। ‘বরগুনার সর্বস্তরের জনগণ’-এর ব্যানারে আয়োজিত ওই মানববন্ধনে অংশ নেন রিফাতের বাবা দুলাল শরীফ। মানববন্ধনে বরগুনা জেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক এবং স্থানীয় সাংসদ ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর ছেলে সুনাম দেবনাথ বক্তব্য দেন। রিফাত হত্যার পরপরই তার খুনিদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দানকারী হিসেবে যে দুজনের নাম আলোচনায় এসেছিল তার একজন এই সুনাম দেবনাথ। যদিও সুনাম তা অস্বীকার করে আসছেন। আর দুলাল শরীফের সংবাদ সম্মেলন এবং মিন্নিকে গ্রেপ্তারের দাবিতে ওই মানববন্ধন কর্মসূচির পরপরই রিফাত হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। এরপর ১৬ জুলাই সকালে রিফাত হত্যা মামলার এক আসামিকে শনাক্ত এবং জবানবন্দি নেওয়ার কথা বলে মিন্নিকে নেওয়া হয় বরগুনার পুলিশ লাইনসে। সেখানে দিনভর জিজ্ঞাসাবাদের পর রাত ৯টায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানোর কথা জানান পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন। পরদিন মিন্নিকে আদালতে হাজির করে পুলিশ সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন করলে বিচারক পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। পরে ১৯ জুলাই রিমান্ডের দুই দিনের মাথায় মিন্নিকে অনেকটাই তড়িঘড়ি করে আদালতে হাজির করার পর তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার কথা জানায় পুলিশ।
দায় স্বীকার করে রিশান ফরাজীর জবানবন্দি : রিফাত হত্যায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে এজাহারভুক্ত ৩ নম্বর আসামি রিশান ফরাজী। গতকাল সোমবার বিকেল সোয়া ৪টার দিকে তাকে বরগুনার জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম গাজীর আদালতে হাজির করা হয়। পরে সন্ধ্যার দিকে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয় রিশান। রিফাত হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বরগুনা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. হুমায়ুন কবির দেশ রূপান্তরকে এসব তথ্য জানিয়েছেন।
এর আগে ১৮ জুলাই সকাল ১০টার দিকে রিশান ফরাজীকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরদিন আদালতে হাজির করে তাকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। রিমান্ডের মেয়াদ শেষ হওয়ার একদিন আগেই রিশানকে আদালতে হাজির করা হয়। জবানবন্দি শেষে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন বিচারক।
রিফাত হত্যা মামলায় সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তারা সবাই হত্যায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে বলে জানিয়েছেন বরগুনার পুলিশ সুপার মো. মারুফ হোসেন। দেশজুড়ে আলোচিত এই মামলার প্রধান আসামি নয়ন বন্ড ২ জুলাই ভোরে পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়।
মিন্নির নিরাপত্তা ও মামলা প্রভাবমুক্ত রাখার দাবিতে দিনাজপুরে মানববন্ধন : মিন্নির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং রিফাত হত্যা মামলার প্রভাবমুক্ত তদন্ত ও বিচার দাবিতে দিনাজপুরে মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। হিউম্যান রাইটস ল ইয়ার্স ফোরাম ও বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ দিনাজপুর জেলা শাখার উদ্যোগে এই কর্মসূচি পালন করা হয়। গতকাল দুপুর ১২টার দিকে জেলা আইনজীবী সমিতি প্রাঙ্গণে এই মানববন্ধন হয়।
কর্মসূচিতে সভাপতিত্ব করেন জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও হিউম্যান রাইটস ল ইয়ার্স ফোরামের সভাপতি মাজহারুল ইসলাম সরকার।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, মিন্নি স্বামীকে বাঁচানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। প্রতিবাদী, সাহসী ও নির্ভীক মিন্নির নিরাপত্তা এবং রিফাত হত্যা মামলার সঠিক তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
মানববন্ধনে অন্যদের মধ্যে হিউম্যান রাইটস ল ইয়ার্স ফোরামের সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ এবং বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ দিনাজপুর জেলা শাখার সাধারণ সম্পদাক মারুফা বেগম ফেন্সিসহ শতাধিক আইনজীবী ও সাধারণ মানুষ অংশ নেয়।
