যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন দেশটির সাবেক সাংবাদিক, লন্ডনের মেয়র ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসন। বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেরেমি হান্টকে বিপুল ব্যবধানে হারিয়ে ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টির ৬৬ শতাংশ ভোট পেয়ে তিনি নির্বাচিত হয়েছেন বলে জানিয়েছে বিবিসি। আজ বুধবার আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেবেন।
বরিস জনসনের আগে যুক্তরাজ্যের কোনো প্রধানমন্ত্রী এতটা বিতর্কিত ছিলেন না। রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকে বিভিন্ন বিতর্কিত মন্তব্য করে আলোচনার শীর্ষে থাকতেন তিনি। ১৯৯৬ সালে ডেইলি টেলিগ্রাফে লেখা কলামে তিনি লেবার পার্টির নারী সদস্যদের ‘যৌন আবেদনময়ী’ বলে মন্তব্য করেন। ১৯৯৮ সালে একই পত্রিকার কলামে তিনি সমকামীদের আক্রমণ করেন।
২০১৮ সালে মুসলিম নারীদের বোরকা নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করে ব্রিটিশ রাজনীতিতে হাসির খোরাক হয়েছিলেন জনসন। ডেইলি টেলিগ্রাফে লেখা এক কলামে তিনি বলেন, ‘বোরকা ও নেকাব পরিহিত নারীদের দেখতে চিঠির বাক্সের মতো লাগে।’ বোরকা পরিহিতদের ‘ব্যাংক ডাকাতদের’ সঙ্গেও তুলনা করেন তিনি। তখন প্রধানমন্ত্রী টেরিজা মে বরিসকে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানান। মে বলেন, বরিসের মন্তব্য ‘সুস্পষ্ট অবমাননা’। তবে ক্ষমা চাওয়ার প্রস্তাব নাকচ করেন জনসন।
নারীদের বিষয়ে জনসনকে আপত্তিকর শব্দের ব্যবহার করতে দেখা যায় বিভিন্ন সময়। ২০০৫ সালে কনজারভেটিভ পার্টিকে ভোট দেওয়া নিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘টোরি পার্টিকে ভোট দিলে আপনার স্ত্রীর স্তনের আয়তন বেড়ে যাবে এবং একটি বিএমডব্লিউর মালিক হওয়ার সুযোগ বাড়বে।’
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ফার্স্ট লেডি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনকে নিয়ে তিনি বলেন, ‘তিনি (হিলারি) লেডি ম্যাকবেথের মতো পায়ে হিল পরে হাঁটেন।’ তবে শুধু রাজনৈতিক অঙ্গনের নারীদের নয়, সাধারণ নারীরাও তার বিদ্রƒপের শিকার হন। ২০১৩ সালে মালয়েশিয়া সফরে গিয়ে দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়পড়য়া নারীদের নিয়ে বলেন, ‘মালয়েশিয়ার নারীরা ভালো স্বামী পাওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যান।’
২০১৫ সালে এক বক্তৃতায় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনকে ‘নির্মম ও চিত্তাকর্ষক দৈত্য’ বলেন জনসন। ওই মন্তব্যের পর রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নিন্দা জানানো হয়েছিল।
এর আগে যুদ্ধবিধ্বস্ত লিবিয়ায় যুক্তরাজ্যের ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগ নিয়ে মন্তব্য করে ব্যাপক হাস্যরসের সৃষ্টি করেন। ব্যবসায়ীদের এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘লিবিয়ার সির্তে শহরকে আমি দুবাইয়ের মতো বানাতে পারব। তবে তাদের (লিবিয়ার প্রশাসন) শুধু লাশগুলো পরিষ্কার করতে হবে।’
বরিস জনসনকে ‘বর্ণবাদী’ বললে ভুল হবে না। কারণ তিনি তার বক্তব্যে কৃষ্ণাঙ্গদের অভিহিত করতে ‘তরমুজের মতো হাসি’, ‘পিক্কান্নিস’ (যুক্তরাজ্যে কৃষ্ণাঙ্গ শিশুদের তুচ্ছার্থে ব্যবহৃত শব্দ) জাতীয় শব্দ ব্যবহার করেন হরহামেশাই।
ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সাবেক কনজারভেটিভ সাংসদ স্ট্যানলি জনসন ও তার প্রথম স্ত্রী শার্লট ফসেটের সন্তান আলেকজান্ডার বরিস দে পিফেল জনসনের জন্ম ১৯৬৪ সালের জুনে, যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে। জনসনের নানা স্যার জেমস ফসেট ইউরোপীয় মানবাধিকার কমিশনের প্রেসিডেন্ট ছিলেন।
ব্যবস্থাপনা উপদেষ্টা হিসেবে কিছুদিন কাজ করার পর জনসনের সাংবাদিক জীবন শুরু হয়। ১৯৮৭ সালে টাইমসে প্রতিবেদক হিসেবে যোগ দেওয়ার পর একজনের উদ্ধৃতি জাল করায় চাকরি হারাতে হয় তাকে। ডেইলি টেলিগ্রাফে জনসন ইউরোপবিষয়ক সংবাদদাতা ছিলেন পাঁচ বছর। পরে ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৯ পর্যন্ত তিনি একই প্রতিষ্ঠানের সহকারী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। টেলিগ্রাফে থাকার সময়েই ১৯৯৭ সালে ক্লয়েড সাউথ এলাকা থেকে কনজারভেটিভ পার্টির প্রার্থী হিসেবে হাউজ অব কমন্স নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন জনসন। সেবার লেবার পার্টির মার্টিন জোন্সের কাছে পরাজিত হন তিনি।
×
