যুগ্ম সচিবের জন্য অপেক্ষার বলি স্কুলছাত্র তিতাস

আপডেট : ২৯ জুলাই ২০১৯, ০২:২৩ এএম

সরকারের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা আসছেন ফেরিঘাটে। তার জন্য ফেরি অপেক্ষা করছে। ফেরি ছাড়ার নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও ওই ভিআইপির জন্য ফেরি ছাড়ছে না। অথচ ফেরিতে তখন মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করছিল স্কুলছাত্র তিতাস ঘোষ।

নির্ধারিত সময়ের তিন ঘণ্টা পর ওই ভিআইপি পৌঁছালে ফেরিটি যাত্রা শুরু করে। কিন্তু মাঝনদীতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে তিতাস।

ঘটনাটি ঘটেছে গত বৃহস্পতিবার মাদারীপুরের কাঁঠালবাড়ী ফেরিঘাটে। সরকারের যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা এটুআই প্রকল্পের পরিচালক আব্দুস সবুর মন্ডল পিরোজপুর থেকে ফিরছিলেন ঢাকায়। তিনি যে ফেরিতে পদ্মা পাড়ি দিয়েছেন সেই ফেরিতেই ছিল স্কুলছাত্র তিতাস। তিতাসের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, নড়াইলের কালিয়া পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র তিতাস মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়। প্রথমে তাকে খুলনার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য বৃহস্পতিবার তাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। আইসিইউ সুবিধা সংবলিত অ্যাম্বুলেন্সটি ৫০ হাজার টাকায় ভাড়া করা হয়। রাত ৮টার দিকে কাঁঠালবাড়ি-শিমুলিয়া নৌপথের মাদারীপুরের কাঁঠালবাড়ি ১ নম্বর ভিআইপি ফেরিঘাটে পৌঁছায় অ্যাম্বুলেন্সটি। তখন কুমিল্লা নামের একটি ফেরি ঘাটে যানবাহন পারাপারের অপেক্ষায় ছিল।

এদিকে মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) ওয়াহিদুল ইসলামের বরাত দিয়ে বিআইডব্লিউটিএ কাঁঠালবাড়ি ঘাটে বার্তা দেওয়া হয়, এটুআই প্রকল্পের পরিচালক আব্দুস সবুর ম-ল পিরোজপুর থেকে ঢাকা যাবেন। তাকে পারাপারের জন্য ভিআইপি হিসেবে একটি ফেরি প্রস্তুত রাখতে হবে। 

ঘাটের ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা তার জন্য প্রস্তুত রাখা ফেরিটিতে অ্যাম্বুলেন্সটি তোলেন। এদিকে ফেরিঘাটে ওই সরকারি কর্মকর্তার পৌঁছাতে দেরি হওয়ায় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের স্টিকার সংবলিত ওই কর্মকর্তার গাড়িটি না আসা পর্যন্ত ফেরি ছাড়তে রাজি হননি ঘাট কর্তৃপক্ষ। প্রায় তিন ঘণ্টা পর নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের স্টিকার লাগানো সাদা রঙের মাইক্রোবাসটি আসার পর ফেরি ছাড়ে।

এ অবস্থায় মুমূর্ষু তিতাসকে বাঁচাতে স্বজনরা ফোন করেন জরুরি নম্বর ৯৯৯-এ। সাহায্য চান ঘাটে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদেরও। তাদের অভিযোগ, কারও অনুরোধই রাখেননি ঘাট কর্তৃপক্ষ।

স্কুলছাত্র তিতাস ঘোষের বোনের অভিযোগ, ফেরিঘাটে থাকা কর্তৃপক্ষের কাছে বারবার অনুরোধ করা হলেও ভিআইপি যাত্রী না আসা পর্যন্ত ফেরি ছাড়া হবে না বলে জানান। জীবনের দাম বেশি না ভিআইপির দাম।

তিতাস ঘোষের মা সোনামণি ঘোষ বিলাপ করে এ ঘটনার বিচার দাবি করে বলেন, ‘এই ভিআইপি এই মন্ত্রীদের দিয়ে কী হবে? সাড়ে ৩ ঘণ্টা আমার ছেলে ঘাটে আটকে ছিল। আমি এর বিচার চাই।’

আব্দুস সবুর ম-লের সঙ্গে গতকাল রবিবার যোগাযোগ করা হলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি পিরোজপুর থেকে ফিরছিলাম। ফরিদপুরের ভাঙ্গায় এসে একটি ফেরির ব্যবস্থা রাখার জন্য সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ করেছিলাম। কিন্তু সেই ফেরিতে স্কুলছাত্র আহত অবস্থায় ছিল তা আমার জানা ছিল না। এমনকি ফেরিতে ওঠার পরও কেউ আমাকে বিষয়টি জানায়নি। এ মর্মান্তিক ঘটনাটি আমাকে কষ্ট দিচ্ছে। কিন্তু আমার কিছু করার ছিল না।’

মাদারীপুরের ডিসিকে দিয়ে ফেরিটির যাত্রা বিলম্বিত করেছিলেন কি না জানতে চাইলে আব্দুস সবুর ম-ল বলেন, ‘আমি ডিসির মাধ্যমে এ ধরনের সহায়তা চাইতেই পারি। বিষয়টি অন্যায় নয়।’  

অ্যাম্বুলেন্সে থাকা চিকিৎসক ও সহকারীরা জানান, মস্তিষ্কে প্রচুর রক্তক্ষরণে মাঝনদীতে থাকা অবস্থায় ফেরিতেই তিতাস মারা যায়। তাই তাকে নিয়ে আর ঢাকার দিকে না গিয়ে শিমুলিয়া ঘাট থেকে নড়াইলে তিতাসের বাড়ির দিকে অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে তারা ফিরে আসেন।

এদিকে কাঁঠালবাড়ি-শিমুলিয়া নৌপথের ফেরি কুমিল্লার চালক সাইফুল ইসলাম জানান, রাত ১০টা ২০ মিনিটের দিকে ফেরিটি কাঁঠালবাড়ি ঘাট থেকে ছাড়ে এবং পৌনে ১২টার দিকে শিমুলিয়া ঘাটে পৌঁছায়। তবে ফেরি পৌঁছানোর আগেই অ্যাম্বুলেন্সে থাকা ছাত্রটি মারা যায়। তবে ফেরিটি বেশি দেরি করে ঘাট থেকে ছাড়েনি বলেও জানান তিনি।

বিআইডব্লিউটিসি মাদারীপুরের কাঁঠালবাড়ি ফেরিঘাটের ব্যবস্থাপক সালাম হোসেন বলেন, পদ্মায় স্রোতের কারণে ১৮টি ফেরির মধ্যে মাত্র ৮টি ফেরি চলাচল করা সম্ভব ছিল। দ্রুত পারাপারের কথা বিবেচনা করে ওই অ্যাম্বুলেন্সটিকে ভিআইপি ফেরিতে ওঠানো হয়। তবে ফেরি ছাড়তে স্বাভাবিক যে সময় লাগে তার বেশি দেরি করা হয়নি।

মাদারীপুরের ডিসি ওয়াহিদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে জানান, ঘটনাটি খুবই মর্মাান্তিক। মৃত্যুটি মেনে নেওয়ার মতো নয়। আমাকে ওই দিন দুপুরে আব্দুস সবুর ম-ল ফোন দিয়ে ফেরির কথা বলেছিলেন। আমি ঘাটের ম্যানেজারকে বলেছিলাম হেল্প করতে। ফেরি আটকে রাখার কথা বলিনি। কোনো সরকারি কর্মকর্তা হেল্প চাইলে আমরা করার চেষ্টা করি। ওই পর্যন্তই। পরে রাতে জানতে পেরেছি একজন আহত স্কুলছাত্র ফেরিটিতে ছিল।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত