দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের সহিংসতা ও সন্ত্রাসের রাজত্ব চলছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠনের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টায় পারস্পরিক রেষারেষি এবং একই সংগঠনের বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে সংঘাতের খবর প্রায়ই গণমাধ্যমে দেখা যায়। এসব নতুন কিছু নয়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে এমন অবস্থা বিরাজ করার নেতিবাচক প্রভাব দিন দিন প্রকট হয়ে উঠছে। তুচ্ছ কারণে সংঘাত-সহিংসতায় জড়িয়ে পড়া, মাস্তানি, গুন্ডামির মতো আচরণগুলো শিক্ষার্থীদের একটা বড় অংশের মধ্যেই সংক্রামকভাবে ছড়িয়ে পড়তে দেখা যাচ্ছে। অবস্থা এই পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে কেবল ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীরাই নয়, সাধারণ শিক্ষার্থীরাও সন্ত্রাসের অপসংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন। যেন এই পরিস্থিতিরই দৃষ্টান্ত দেখা গেল বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি আবাসিক হলে মোবাইল ফোন চুরির অভিযোগে এক ডাইনিং বয়কে পিটিয়ে মেরে ফেলার মর্মান্তিক ঘটনায়।
তিন শিক্ষার্থীর বেধড়ক পিটুনিতে প্রাণ হারানো আবদুল হান্নানের বাড়ি কুমিল্লার লাকসামে। ২৫ বছর বয়সী হান্নান রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলে অবস্থিত বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ আজিজ হলে ডাইনিং বয় হিসেবে কাজ করতেন। দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনে প্রকাশÑ হলের ৩১৮ নম্বর কক্ষের আবাসিক শিক্ষার্থী আতিক মোবাইল ফোন খুঁজে না পেয়ে রাত ১টার দিকে দুই সহপাঠীসহ নিচতলার ডাইনিং রুমে যান এবং ডাইনিং বয়দের ঘুম থেকে ডেকে তুলে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। একপর্যায়ে তারা ডাইনিংয়ের তিন কর্মচারীকে নিজেদের রুমে নিয়ে দরজা-জানালা বন্ধ করে বেদম মারধর করেন। হান্নান প্রাণভয়ে মোবাইল চুরির কথা স্বীকার করে বলেন, ফোনটি ডাইনিং রুমের বিছানায় রাখা আছে। হান্নান ফোনটি ফিরিয়ে দিতে ব্যর্থ হলে ওই তিন শিক্ষার্থী তাদের আবারও রুমে নিয়ে বেদম মারধর করতে থাকেন। হান্নান জ্ঞান হারিয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়লে কয়েকজন শিক্ষার্থী তাকে উদ্ধার করে তেজগাঁও শমরিতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। চিকিৎসকরা জানান, হান্নান আগেই মারা গেছেন। গুরুতর আহত ডাইনিংয়ের অন্য দুই কর্মচারী আকবর (৪৮) ও মাসুদকে (২৩) ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ঘটনার পরপর তিন শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নিহত হান্নানের ভাই বাদী হয়ে তিন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেছেন।
সম্প্রতি দেশজুড়ে ‘ছেলেধরা সন্দেহে’ নারী-পুরুষ-প্রতিবন্ধী নির্বিশেষে পিটিয়ে মানুষ মেরে ফেলার ভয়াবহ অপরাধ ঘটতে দেখা যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে পিটিয়ে এক কর্মচারীকে মেরে ফেলা এক হিসেবে তার চেয়েও ভয়ংকর। কেননা, উত্তেজিত জনতার মারধরের ঘটনায় নানা ধরনের মানুষের উপস্থিতি যেমন থাকে তেমনি অনেক ক্ষেত্রে কেউ পরিস্থিতির সুযোগও নিতে পারে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে এমন হত্যাকাণ্ড তো ঠাণ্ডা মাথায় খুন। কোনো ব্যক্তি সে যেই হোক না কেন, তার বিরুদ্ধে কোনো অপরাধ প্রমাণিত হলেও তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলার মতো নৃশংসতা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। অপরাধ প্রমাণ করা এবং শাস্তি দেওয়ার জন্য আইন-আদালত আছে, থানা-পুলিশ আছে। এমন যেকোনো হত্যাকাণ্ডই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বলে বিবেচিত হবে। কোনো নাগরিকের কাছ থেকেই হত্যাকাণ্ডের মতো বর্বর অপরাধ কাম্য নয়। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে জাতির প্রত্যাশা আরও অনেক বেশি।
আশা করা হয় উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এসে তারা তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক শিক্ষা-গবেষণার পাশাপাশি উচ্চতর নীতিনৈতিকতার পাঠ নেবেন। শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য মানুষ হিসেবে নিজেকে বিকশিত করার, সুনাগরিক হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার দীক্ষা নেবেন। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসরে মানবিকতা বিকাশের চর্চা যেন নাই হয়ে যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও সহিংসতা নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়ে পরিণত হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য কেবল শিক্ষার্থীদের জ্ঞানের পাঠ দেওয়া নয়; বরং জ্ঞানচর্চা করা, নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করা। এজন্য শ্রেণিকক্ষের মতো বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও মুক্ত পরিসর সমান জরুরি। এই মুক্ত পরিসর কেবল ভৌত অর্থে স্থান নয়; বরং সেটা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক জ্ঞানতাত্ত্বিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক পরিসর। কিন্তু দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একদিকে যেমন এই মুক্ত পরিসর ক্রমাগত সংকুচিত হয়ে পড়ছে, অন্যদিকে সহিংসতা ও সন্ত্রাসের অপসংস্কৃতির বিস্তার ঘটছে।
বিশ্ববিদ্যালয়েই হোক কিংবা রাষ্ট্রে, সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক মুক্ত পরিসর আর সহিংসতা-সন্ত্রাসের চর্চা বিপরীতধর্মী হওয়ায়, একটা বাড়লে অন্যটা কমতে থাকবে এটাই স্বাভাবিক। এ অবস্থার লাগাম টেনে ধরতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি সন্ত্রাসী ঘটনার বিচার হওয়া জরুরি। বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাইনিং বয় আবদুল হান্নান হত্যাকাণ্ডের বিচার করে দোষীদের অবশ্যই আইনানুগ সাজা দিতে হবে। একই সঙ্গে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও এমন সন্ত্রাস-সহিংসতা দমনে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। কি প্রকৃতিতে কি সমাজে কোনো স্থানই শূন্য পড়ে থাকে না। বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক চর্চার বিকাশে উৎসাহ ও প্রণোদনা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইতিবাচক মুক্ত পরিসর তৈরি করা না গেলে সেখানে সংঘাত-সহিংসতার চর্চা আরও প্রকট রূপ ধারণ করতে পারে।
