প্রতিদিনই ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে দেশের হাসপাতালগুলোতে। এর মধ্যে রাজধানীর সরকারি-বেসরকারি সব হাসপাতালেই বেডের কয়েক গুণ রোগী ভর্তি হয়েছেন। সরকারি হাসপাতালগুলোর মধ্যে মুগদা জেনারেল হাসপাতালের অবস্থা আরও ভয়াবহ। হাসপাতালটির একটি ওয়ার্ডে যেখানে ৬০ জন রোগীর চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা আছে, সেখানে এখন ভর্তি আছেন প্রায় ৪০০ রোগী। সেখানে তাদের সেবায় নার্স রয়েছেন মাত্র পাঁচজন। তাদেরও করতে হচ্ছে বাড়তি ডিউটি। হাসপাতালের ২৭ জন নার্স ও ১০ জন চিকিৎসক ইতিমধ্যে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। এরপরও হাসপাতালটির চিকিৎসক, নার্স ও কর্মচারীরা রোগীদের সেবায় অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। ঈদের সময় পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দেওয়া হবে তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছে হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ। হাসপাতালটিতে সরেজমিনে দেখা যায়, বেড সংকটের কারণে সিঁড়ি ও লিফটের পাশে মেঝেতে বিছানা পেতে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে অনেককে। হাসপাতালের আটতলায় রাখা হয়েছে ডেঙ্গু আক্রান্ত শিশুদের। কিন্তু তাদের বেশির ভাগকেই রাখা হয়েছে মেঝেতে।
এদিকে ডেঙ্গু আক্রান্তদের চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে ইতিমধ্যে ২৭ জন নার্স ও ১০ জন চিকিৎসক আক্রান্ত হয়েছেন। এ অবস্থায় মুগদা মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের দিয়েই চিকিৎসাসেবা চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে। কলেজটির প্রথম ব্যাচের ছাত্রী বিদুষী জানান, গত ৩ তারিখ থেকে তার মতো আরও ৩৬ জন ছাত্রছাত্রী প্রতিদিন ৮ ঘণ্টা করে বিশেষ ব্যবস্থায় ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে আসছেন। তিনি বলেন, যেহেতু আমাদের হাসপাতালে চিকিৎসকের সংকট রয়েছে এখন আমরাও হাসপাতালের আদেশক্রমে চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করছি।
হাসপাতালটির ওয়ান স্টপ সেন্টারে ডেঙ্গু পরীক্ষার বিশেষ ব্যবস্থা থাকলেও সেখানে রয়েছে অসহনীয় চাপ। ভোর থেকেই শুরু হয় দীর্ঘ লাইন। সিরিয়ালের অপেক্ষা করতে করতে অনেকই অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। ৪ মাসের মেয়েশিশুর পরীক্ষার জন্য সিরিয়ালে দাঁড়ানো মুগদা-মান্ডা মহল্লার বাসিন্দা বেল্লাল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সকাল ৮টার সময় মেয়েকে নিয়ে আসি হাসপাতালে, বিকেল ৫টা বাজলেও সিরিয়াল পাইনি। কেন পাননি প্রশ্ন করলে উত্তরে তিনি বলেন, এক ঘণ্টা বা আধা ঘণ্টা চিকিৎসা দিয়ে বিভিন্ন কারণে সেন্টার বন্ধ করে দিচ্ছে। রোগী, চিকিৎসক ও হাসপাতালের কর্মকর্তাদের সঙ্গে একটু একটু পর ঝামেলা হচ্ছে নানা কারণে।
গোড়ান এলাকার বাসিন্দা খাদিজা বেগম মেয়ে সুমাইয়া আক্তারকে (৪) নিয়ে গত বুধবার হাসপাতাল ভর্তি হয়েছেন। বেড না পেয়ে লিফটের পাশে বিছানা পেতেছেন। তিনি বলেন, ‘এখানে এসে দুইটা পরীক্ষা করালাম এই জন্য ৩০০ টাকা দিতে হয়েছে। একটি রিপোর্ট হাতে পেলেও অন্য আরেকটি রিপোর্ট দুদিন পর ছাড়া পাওয়া যাবে না বলে দিয়েছে।’ হাসপাতালটির প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের এখানে ৫০০ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছে। আজকেও (গতকাল) রোগীর অনেক চাপ। সেবা দিতে আমাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।’ তিনি জানান, রোগীর চাপ সামলাতে গিয়ে ইতিমধ্যে ২৭ জন নার্স ও ১০ জন চিকিৎসক ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। এত অল্প চিকিৎসক ও কর্মকর্তা দিয়ে ভালোভাবে চিকিৎসাসেবা দেওয়া অসম্ভব। আমরা অতিরিক্ত সময় ব্যয় করেও সামাল দিতে পারচ্ছি না। প্যাথলজি বিভাগের কর্মকর্তাদের অভাবে ২৪ ঘণ্টার ডেঙ্গু রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার যে বিশেষ ব্যবস্থা চালুর কথা সেটা দুপুর ২টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দিতে পারছি। তাই রোগীদের ভিড় সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।’ তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, ঈদের সময় রোগটির প্রকোপ বাড়লে সেই চাপ সামলানো তাদের জন্য প্রায় অসম্ভব হবে। সে ক্ষেত্রে ঢাকার বাইরের হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজগুলো থেকে চিকিৎসক ও নার্স আনার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন তিনি।
