নেতৃত্বে এগিয়েও প্রতিনিধিত্বে পিছিয়ে নারী

আপডেট : ০৭ আগস্ট ২০১৯, ১০:৫৮ পিএম

মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশের সমাজে যেসব অগ্রগতি খোলা চোখেই দৃশ্যমান তার একটি নিঃসন্দেহে নারীশিক্ষার অগ্রযাত্রা। ১৯৭০ সালে দেশে নারীশিক্ষার যে হার ছিল, মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী এক দশকেই তা বহুগুণ বেড়ে যায়। ১৯৯০ সাল নাগাদ মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে এবং ২০০০ সাল নাগাদ  বিশ্ববিদ্যালয় স্তরেও কাঁধে কাঁধ ঠেকিয়ে ছেলে ও মেয়ে শিক্ষার্থীরা সংখ্যায় প্রায় সমান হয়ে ওঠে।  উচ্চশিক্ষায় মেয়েদের অর্জন খুবই ভালো। আজকের বাংলাদেশে বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় পরীক্ষার্থী ও উত্তীর্ণদের সংখ্যায় ছেলে ও মেয়েরা প্রায় সমান। সরকারি ও আধা-সরকারি চাকরির প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা থেকে শুরু করে নানা চ্যালেঞ্জিং কর্মক্ষেত্রেও বিশেষ যোগ্যতা ও দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছেন নারীরা।  শিক্ষার পাশাপাশি ক্রীড়া, সংস্কৃতি, সামাজিক ও ব্যবসায়িক উদ্যোগেও অনেক এগিয়েছেন নারীরা। আর অনেকদিন ধরেই দেশের শ্রমিক চাহিদার এক বড় অংশই পূরণ করছেন নারীরা। কিন্তু সংগত কারণেই এই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, সমাজের বহু ক্ষেত্রে এগোলেও রাজনীতিতে কতটা এগোতে পেরেছেন নারীরা?

 

বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলের প্রধান, সরকারপ্রধানসহ সর্বোচ্চ পর্যায়ে নারীর ব্যাপক সাফল্য থাকা সত্ত্বেও মধ্যম ও তৃণমূল পর্যায়ে নারীরা খুবই পিছিয়ে রয়েছেন। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ‘দ্য গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট ২০১৮’-তে এই বাস্তবতার প্রতিফলন বেশ স্পষ্ট। ওই প্রতিবেদনের একটি সূচক হলো সরকারপ্রধান হিসেবে কত সময় ধরে একজন নারী রয়েছেন। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা এবং বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দীর্ঘ সময় ধরে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করায় ‘নারী সরকারপ্রধানের’ সূচকে প্রথম স্থান অর্জন করেছে বাংলাদেশ। ‘নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন’ সূচকে গতবারের চেয়ে দুই ধাপ এগিয়ে বাংলাদেশ এবার পঞ্চম হয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের উপসূচক ‘সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব’ এর সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ৮০তম এবং ‘নারী মন্ত্রীর সংখ্যা’র দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান ১২৬ তম। জাতীয় সংসদে এখন যেমন একজন নারী স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, তেমনি বিভিন্ন সময়ে বিরোধীদলীয় নেত্রী ও সংসদ উপনেতা হিসেবেও নারীরা নেতৃত্ব দিয়েছেন।

 

এখানে লক্ষণীয় যে, দেশের রাজনীতিতে যে নারীরা সর্বোচ্চ নেতৃত্বে গিয়েছেন বা দীর্ঘসময় ধরে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তাদের বেশিরভাগই রাজনীতিতে এসেছেন পারিবারিক উত্তরাধিকার থেকে। রাজনীতিতে এই নারীদের সাফল্য তাদের যোগ্যতার পরিচায়ক হলেও, তৃণমূল থেকে ধাপে ধাপে নেতৃত্বে  উঠে আসা নারীর সংখ্যা নেহায়েতই কম। এর অন্যতম বড় কারণ রাজনৈতিক দলগুলোতে তৃণমূল পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ কম থাকা এবং সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্য দিয়ে নারীদের জনপ্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ কম থাকা। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে রাজনীতিতে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দুটি গুরুত্বপূর্ণ পথে এগোনোর চেষ্টা করা হয়েছে বাংলাদেশে। একটি সংরক্ষিত নারী আসনে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জাতীয় সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর চেষ্টা, আরেকটি গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোতে নারী নেতৃত্ব বিকাশের চেষ্টা। বলা বাহুল্য, দুই ক্ষেত্রেই অগ্রগতি এখনো আশাব্যঞ্জক নয়। সংবিধানে বিভিন্ন সংশোধনীর মাধ্যমে সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা পর্যায়ক্রমে ৭, ১০, ১৫, ৩০, ৪৫ থেকে বাড়িয়ে ৫০টি করা হয়েছে। ২০১৮ সালে সংবিধানের ৬৫ অনুচ্ছেদ সংশোধনের মাধ্যমে জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচনের বিধান আরও ২৫ বছর বহাল রাখা হয়।  অন্যদিকে, সরাসরি নির্বাচনেও নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। কিন্তু নারী নেতৃত্বের বিকাশে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিই অবহেলিত রয়ে গেছে। সেটি হলো গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের নির্দেশনা অনুসারে সব রাজনৈতিক দলে নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর প্রচেষ্টা।  

 

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২ সংশোধন করে ২০০৮ সালে বিধান করা হয় ২০২০-এর মধ্যে নিবন্ধিত সব রাজনৈতিক দলের প্রতিটি স্তরের কমিটিতে এক-তৃতীয়াংশ বা ৩৩ শতাংশ নারী সদস্য থাকতে হবে।  এক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সবচেয়ে এগিয়ে থাকলেও তারাও লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারছে না। দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের সাংগঠনিক কমিটি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, তৃণমূলের তুলনায় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে নারীর অংশগ্রহণ বেশি। দলটির ২০টি কমিটির ওপর জরিপ করে দেখা গেছে, তৃণমূলে ১ ও ২ শতাংশের বেশি নারী নেতৃত্ব নেই। তবে, এখন কেন্দ্রীয় কমিটিতে সভাপতিসহ ১৫ জন নারী রয়েছেন, যা শতকরা হিসাবে ১৮ দশমিক ৫২ শতাংশ। উল্লেখ্য, বিএনপি, জাতীয় পার্টি এমনকি বামপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোও এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের চেয়ে অনেক বেশি পিছিয়ে রয়েছে। এখন পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের এ বিধান মেনে চলা দলগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক করেনি। ফলে দলগুলোও এ বিষয়ে গা করছে না। কিন্তু নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হলে দলগুলোতে নারীর এই প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা জরুরি। নইলে নেতৃত্বে এগিয়ে থেকেও প্রতিনিধিত্বে পিছিয়েই থাকবেন নারীরা, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।  

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত