চামড়া সিন্ডিকেট সক্রিয় সরকারের নিষ্ক্রিয়তায়

আপডেট : ১৬ আগস্ট ২০১৯, ০৪:১১ এএম

৭০ বছর আগে ট্যানারি শিল্পের যাত্রাকালে এদেশের চামড়া খাতের পুরো নিয়ন্ত্রণ ছিল পশ্চিম পাকিস্তানিদের হাতে। অর্থনৈতিকভাবে বাঙালিদের ওই শোষণকালেও কখনো কোরবানির চামড়ার দর এবারের মতো নগণ্য ছিল না বলে জানালেন ৩২ বছর ধরে ট্যানারি ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত ইকবাল হোসাইন। টাইলেক্স এন্টারপ্রাইজের মালিক ইকবাল হোসেন স্মৃতিচারণা করে বললেন,

পাকিস্তান আমলে চামড়ার দাম এত না কমার বড় কারণ ছিল লবণজাত চামড়া রপ্তানি করা যেত। এবার চামড়ার যে দর, এত কম দামে পাকিস্তান আমলেও বিক্রি করতে হয়নি। গত কয়েক বছর ধরে চামড়ার মারাত্মক দরপতনের জন্য সরকারকেও দোষারোপ করলেন তিনি।

ট্যানারি ব্যবসায়ীদের হিসাবে এক লাখ টাকা দামের গরুর চামড়ার আয়তন প্রায় ২৫ থেকে ২৮ বর্গফুট। সরকার নির্ধারিত প্রতি দরের সর্বনিম্ন দর ৪০ টাকা বর্গফুট হিসাবে এর দাম হয় দুই হাজার টাকা। এবার লাখ টাকার কোরবানির গরুর চামড়া বিক্রি করতে হয়েছে ২০০-৩০০ টাকায়ও। কোথাও কোথাও দর এরও কম। কোনো কোনো এলাকায় চামড়ার কোনো ক্রেতাই পাওয়া যায়নি। যেসব ফড়িয়া মাঠ থেকে চামড়া কিনেছেন, কেনা দামের চেয়ে কম দামেও তাদের অনেকে বিক্রি করতে পারেননি আড়তদারদের কাছে। ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে পাওনা টাকা না পাওয়ায় চামড়া কিনতে না পারার অজুহাত দিচ্ছেন তারা। আর গতবারের চামড়া এখনো মজুদ থাকা, ব্যাংক থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণে ঋণ না পাওয়া ও আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার দর কমে যাওয়ার অজুহাত তুলে চামড়া থেকে দূরে সরে যাচ্ছিলেন ট্যানারি মালিকরা। চামড়া নিয়ে ট্যানারি  মালিক ও আড়তদাররা যে এমন করবেন, তার ইঙ্গিত ঈদের আগেই পেয়েছিল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। চামড়ার দাম নির্ধারণী বৈঠকেই তারা চামড়া কেনার মতো টাকার সংকটসহ গতবারের চামড়া মজুদ থাকার কথা বলছিল। গত কয়েক বছর ধরে প্রতিবারই দাম নির্ধারণের পর তার চেয়ে কম দরে চামড়া কিনে পার পেয়ে যান ট্যানারি মালিকরা। সে কারণেই ঈদের আগে বাণিজ্য সচিব মো. মফিজুল ইসলাম প্রয়োজনে চামড়া রপ্তানির সুযোগ দেওয়ার কথা বলামাত্র নির্ধারিত দরে চামড়া কিনতে রাজি হয়ে যান তারা। গতবারও নির্ধারিত দরের অনেক কমে চামড়া বিক্রিতে বাধ্য করেছেন তারা। এবারও একইভাবে চেষ্টা ছিল তাদের। সেজন্যই গত কয়েক দিন আড়তদার ও ট্যানারি মালিকরা চামড়া কেনা থেকে হাত গুটিয়ে রাখেন। রাগে-ক্ষোভে সুনামগঞ্জ ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন স্থানে অনেকে পশুর চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলেন। বিক্রি করতে না পেরে কেউ কেউ চামড়া ফেলে দেন। এ পরিস্থিতির জন্য ট্যানারি মালিকদের কারসাজিকে দায়ী করেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। তবে মন্ত্রণালয় রপ্তানির ঘোষণা দিয়ে কঠোর হওয়ার ইঙ্গিত দিলে চাপের মুখে ঈদের আট দিন পর থেকে চামড়া কেনার ঘোষণা দিয়েছেন ট্যানারি মালিকরা।

তৈরি পোশাকের পর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানির এ খাতটির এ অবস্থার কারণ অনুসন্ধানে জানা গেছে, চামড়া খাতের কোনো মা-বাপ নেই, খাতটি দেখভালের জন্য নেই কোনো মন্ত্রণালয়, দপ্তর কিংবা বোর্ড। অথচ ক্ষুদ্রতম খাত রেশম উন্নয়নে পৃথক বোর্ড আছে, তুলা উন্নয়নেও আছে। ফলে খাতটির উন্নয়ন দেখভালের দায়িত্ব যেমন সরকারের কোনো সংস্থার হাতে নেই, দীর্ঘদিনের খেয়াল-খুশিতে এ খাতে গড়ে ওঠা ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট ভাঙারও কোনো উদ্যোগ নেই। এর খেসারত গুনতে হচ্ছে কোরবানির চামড়ার হকদার এতিম-দুখীদের, সংকোচিত হচ্ছে রপ্তানি সম্ভাবনা। প্রতিবছর ঈদুল আজহার দিন কয়েক আগে কোরবানির পশুর চামড়ার দর নির্ধারণ ও অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে রপ্তানির বিপরীতে ১০ শতাংশ নগদ সহায়তার ব্যবস্থা করা ছাড়া এ শিল্পে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কার্যত কোনো কাজ নেই। ট্যানারি শিল্প শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন হলেও ট্যানারি পল্লী স্থাপনে প্রকল্প নেওয়া ছাড়া এ মন্ত্রণালয়ও খাতটির জন্য কিছু করেনি। বছরের পর বছর ধরে চামড়া খাত নিয়ন্ত্রণে সরকারের কোনো উদ্যোগ না থাকায় এ খাতের ব্যবসায়ীরা নিজেদের মনমতোই চামড়া কেনাবেচা করছেন।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. মফিজুল ইসলাম গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ট্যানারি মালিকরা ঈদের আগে আমাদের কথা দিয়েছিলেন যে, সরকার নির্ধারিত দরে তারা চামড়া কিনবেন। মাঠ পর্যায় থেকে আমাদের কাছে যে তথ্য এসেছে, তাতে তারা সে কথা রাখেননি। ব্যাংকঋণ না পাওয়াসহ তারা নানা অজুহাত দেখাচ্ছেন। তবে মন্ত্রণালয় কঠোর অবস্থানে রয়েছে, চামড়া নিয়ে কোনো সিন্ডিকেট হতে দেব না। কোনো সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে কি না, তা বের করতে গোয়েন্দারা কাজ করছেন, মন্ত্রণালয়ও বিষয়টি দেখছে।

ট্যানারি মালিকদের সিন্ডিকেটের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. সাখাওয়াত উল্লাহ গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, চামড়া কেনাবেচার সঙ্গে অনেক মানুষ সম্পৃক্ত। এখানে কীভাবে তারা সিন্ডিকেট করবে, তা আমি বুঝতে পারি না। এ ধরনের সিন্ডিকেটের কথা আমরা প্রতিবছর কোরবানির সময় শুনে থাকি, বাস্তবে যার কোনো ভিত্তি নেই।

খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় থাকাকালে একবার চামড়া শিল্পের উন্নয়নের কথা ঘোষণা করেন। তখন তিনি বলেন, ক্রাস্ট লেদার ও চামড়াজাত পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়ানো হবে। এজন্য কাঁচা চামড়া ও ওয়েট ব্লু (লোম ছাড়ানো চামড়া) রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়া হবে। ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর ক্রাস্ট লেদার ও চামড়াজাত পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানিতে কোনো উদ্যোগ নেওয়া ছাড়াই শুধু জিয়াউর রহমানের ঘোষণার বাস্তবায়ন করতে গিয়ে কাঁচা চামড়া রপ্তানি নিষিদ্ধ করে দেয়। তখন থেকেই চামড়া খাত পুরোপুরি ট্যানারি মালিকদের তালুবন্দি হয়ে পড়ে।

গত বছর চামড়ার দর নির্ধারণী বৈঠকের আগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা আন্তর্জাতিক বাজারদর বিশ্লেষণ করে দর বাড়ানোর সুপারিশসহ কার্যপত্র তৈরি করেন। ট্যানারি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করে এসে তখনকার বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ আগের বছরের দামই বহাল রাখেন। কিন্তু ট্যানারি মালিকরা ওই দামের চেয়ে অনেক কম দামে চামড়া কেনেন। গতবারও অনেকে চামড়া ফেলে দেন। এ বিষয়ে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে তখনকার বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, এ জন্যই দাম বাড়িয়ে নির্ধারণ করিনি। দাম বাড়ালে আরও অনেকেই চামড়া বিক্রি করতে পারতেন না।

এবারও দাম নির্ধারণের আগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশন আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার দর বিশ্লেষণ করে প্রতি বর্গফুটের দর ৪৫ থেকে ৭৫ টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ট্যারিফ কমিশনের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে সর্বনিম্ন মানের চামড়ার দর বিবেচনা করলে বাংলাদেশের কাঁচা চামড়ার দাম বর্গফুটে ৪০ ও ভালোমানের চামড়া ৭৫ টাকা দরে কিনলেও ট্যানারি মালিকরা রপ্তানি করে লাভবান হতে পারতেন। সে বিশ্লেষণ করেই এই দাম সুপারিশ করেছি আমরা। আর বাংলাদেশের পশুর চামড়া বিশ্বে এক নম্বর হলেও ব্যবসায়ীদের কারসাজির কারণে সর্বনিম্ন মানের চামড়ার দরও দেশের মানুষ পেল না।

ট্যানারি ব্যবসায়ী ইকবাল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, তিনি ঈদে ১০ হাজার পিস চামড়া এরমধ্যে কিনেছেন। বাজারদরের চেয়ে পিসপ্রতি ১৫০-২০০ টাকা বেশি দিয়ে কিনেছেন তিনি। প্রতি বর্গফুট চামড়া প্রক্রিয়াজাত করতে প্রায় ৪০ টাকা খরচ হয় জানিয়ে তিনি বলেন, আমি একটু ভালো দামে রপ্তানি করতে পারি। তাই কিছুটা বেশি দামে কিনলেও সামান্য মুনাফার আশা করছি।

মান ভালো হওয়ায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে রপ্তানি উন্মুক্ত করার ঘোষণা দেওয়ার পর ভারতের ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশ থেকে চামড়া আমদানির জন্য যোগাযোগ শুরু করছেন জানিয়ে তিনি বলেন, পাশের দেশের একজন ব্যবসায়ী আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তিনি আমার কাছ থেকে চামড়া নিতে চান। আমি তাকে বলেছি, সরকার মাত্র ঘোষণা দিয়েছে। এখনো গেজেট জারি হয়নি। তা ছাড়া দরদামেরও ব্যাপার আছে। এখনই রপ্তানি বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না।

বাংলাদেশের কাঁচা চামড়ার ইউরোপসহ বিশ্বজুড়ে কদর থাকলেও চামড়াজাত পণ্যের বেলায় উল্টো ভাব ক্রেতাদের। কারণ, সাভারে যে ট্যানারি পল্লী করা হয়েছে, তা আন্তর্জাতিক মানের নয়। ট্যানারি পল্লীতে কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগারের (সিইটিপি) আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন নেই। ২০০৩ সালে প্রকল্প নিয়ে গত ১৬ বছরে প্রকল্পের আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত না করেই হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সাভারে স্থানান্তরের কারণে এ শিল্পের উৎপাদন ও রপ্তানি দুটোই কমেছে। সিইটিপির সার্টিফিকেশন না থাকায় ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রসহ ধনী দেশগুলোর ক্রেতারা বাংলাদেশি প্রক্রিয়াজাত চামড়ার কোনো পণ্য নিতে আগ্রহী নয়। এ কারণে এপেক্স, বে, ওরিয়নসহ যেসব বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশে জুতাসহ চামড়াজাত বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি করে, তারা অন্য দেশ থেকে চামড়া আমদানি করে তা দিয়ে পণ্য তৈরির পর রপ্তানি করছে। ফলে ২০১৪ সাল থেকে বাংলাদেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি কমছে। ২০১৭ সালে চামড়াকে সরকার ‘প্রোডাক্ট অব দ্য ইয়ার’ ঘোষণা করলেও রপ্তানি প্রবৃদ্ধির নেতিবাচক ধারাকে ঘোরানো সম্ভব হয়নি।

এ বিষয়ে শিল্প সচিব মো. আবদুল হালিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, সিইটিপি পুরোদমে চালু না হওয়ায় কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। এ বিষয়ে আমাদের অতীত কোনো অভিজ্ঞতা না থাকায় প্রথম দিকে বেশি জটিলতা হয়েছে। ট্যানারির বর্জ্য পরিশোধন যন্ত্র আমদানি হয়েছে, সেগুলো শিগগির সাভাবে পৌঁছাবে। অনুসন্ধান করে দেখতে হবে চামড়ার দাম এবার কেন পাওয়া গেল না। এবার যা হলো, তা যেন আগামীতে না হয় সে বিষয়ে আমরা সতর্ক থাকব। বিশেষ করে দামের বিষয়ে আরও পদক্ষেপ নিশ্চয়ই নেওয়া হবে, যেন এই ঘটনা আর দ্বিতীয়বার না ঘটে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত